ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদন

লকডাউনে দাম বেড়েছে সব নিত্যপণ্যের

প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০ । ০০:২০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মিরাজ শামস

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকা, উপজেলা ও জেলা সরকারিভাবে লকডাউন করা হয়েছে। এ ছাড়া সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। এর প্রভাবে গত এক মাসে স্থানীয় বাজারে অত্যাবশ্যকীয় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে মসুর ডাল, আদা, দেশি রসুন ও পেঁয়াজের মূল্য অস্বাভাবিক বেড়েছে। আমদানি মূল্যের কারণে স্থানীয় বাজারে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এমন পর্যালোচনা রয়েছে। এ অবস্থায় কমিশন লকডাউন সীমিত করে কৃষকদের নষ্ট হয়ে যাওয়া শাক-সবজিসহ নিত্যপণ্যের সরবরাহ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। তবে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে তা করতে হবে।

গত শনিবার অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের মূল্য, সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতির ওপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে এ প্রতিবেদন দিয়েছে ট্যারিফ কমিশন। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার মূল্য ও সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় চাষিরা যেসব পণ্য বাজারজাত করে সেসব বাজারে কৃষকদের আসতে বাধা দেওয়ার কারণে একদিকে যেমন উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারছে না, অন্যদিকে বাজারে দেশে উৎপাদিত পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। পণ্য নষ্ট হওয়ায় কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, নিত্যপণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে অতি মুনাফা রোধে বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে। কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী জেলাগুলোর বাজারে সাধারণ চাষিদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে সীমিত আকারে লকডাউন রাখা যেতে পারে, যাতে দেশের পাইকারি বাজারে পণ্য সরবরাহ বৃদ্ধি পায়। এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন প্রযোজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। নিত্যপণ্য পরিবহনে সব স্বাস্থ্যবিধি

মেনে সড়ক পরিবহন করপোরেশনের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করে সরবরাহ বাড়ানো যেতে পারে। বন্দরগুলোতে যানজটের কারণে আমদানি করা নিত্যপণ্য ছাড় যেন বাধার মুখে না পড়ে, তার জন্য বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে। অত্যাবশ্যকীয় পণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সীমিত আকারে পণ্য উৎপাদন কারখানা ও সেবা চালু রাখার নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক মাসে মসুর ডালের দাম মানভেদে ১৩ থেকে ২৮ শতাংশ বেড়েছে। দেশি পেঁয়াজ ৩০ শতাংশ, দেশি রসুন ৬৪ শতাংশ, দেশি ও আমদানি আদা ৯০ থেকে ৯৬ শতাংশ ও খেজুরের মূল্য ২২ শতাংশ বেড়েছে। করোনাভাইরাসের প্রভাবে দেশে লকডাউন ঘোষণা করায় সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের বাণিজ্যিক ব্যবহার শূণ্যের কোঠায় নেমে আসায় এসব পণ্যের চাহিদাও কমেছে। তা ছাড়া দেশে এখন কিছু পণ্যের উৎপাদন মৌসুম সম্প্রতি শেষ হয়েছে। অন্য সময়ের তুলনায় আমদানি কম হলেও সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা কম।

মতামত জানতে চাইলে গবেষণা সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সমকালকে বলেন, লকডাউন হওয়ার পর থেকে পণ্য পরিবহন স্বাভাবিক নেই। যদিও স্বরাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চেষ্টা করছে স্বাভাবিক রাখতে। এর পরও মূলত সেই অর্থে স্বাভাবিক নেই। পরিবহন ছাড়াও পণ্য সরবরাহ চেইনের সঙ্গে সম্পৃক্তরা এখন সক্রিয় নন। এতে কৃষকরা ক্রেতা পাচ্ছে না। আবার আড়তগুলো পণ্য কিনে দ্বিধায় থাকে বিক্রি হবে কিনা। এসব কারণে শহরে পণ্যের দাম বাড়ছে, আবার কৃষকরা দাম পাচ্ছে না। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে পরিবহনের পাশাপাশি সরবরাহ ঠিক রাখতে যারা মধ্যম পর্যায়ে বিনিয়োগ করেন তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। বাজার স্বাভাবিক রাখতে এজেন্ট, পাইকার ও আড়তদারদের সক্রিয় করা প্রয়োজন। তাদের জন্য সহজ শর্তে কম সুদে ঋণ সুবিধা দেওয়া দরকার, যাতে তারা বাজারে সক্রিয় হয়। এ পরিস্থিতিতে মুনাফার সুযোগ থাকলেও এবার বাজারে সরবরাহ ঘাটতি বড় সমস্যা। এ জন্য কৃষক পর্যায়ে উৎপাদিত পণ্য ও আমদানি পণ্য বন্দর থেকে বাজারে সরবরাহ বাড়াতে জরুরি পদক্ষেপ দরকার।

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, খোলাবাজারে সরকার পণ্য বিক্রি বাড়ালেও তা আলাদাভাবে আমদানি করে সরবরাহ করছে না। স্থানীয় বাজার থেকে নিয়েই কম দামে বিক্রি করছে। এতে পাইকারি বাজারে স্বাভাবিকের চেয়ে চাহিদা আরও বেড়ে যাচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে সরবরাহ বাড়ানো প্রয়োজন। আগামী দিনে পরিস্থিতি মোকাবিলায় উৎপাদন স্বাভাবিক হলেও মজুদ বাড়ানো দরকার। একই সঙ্গে আমদানি বাড়িয়ে মজুদ বাড়াতে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত তিন মাসে সব নিত্যপণ্যের আমদানি মূল্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল, মসুর ডাল, ছোলা, রসুন, আদা ও খেজুরের আমদানি মূল্য আংশিক বেড়েছে। অন্য পণ্যের এলসি নিষ্পত্তি মূল্য স্থিতিশীল ও কম রয়েছে। তাই আমদানি মূল্যের কারণে স্থানীয় বাজারে অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণ নেই। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য কেনার ক্ষেত্রে কোনো দেশ লকডাউন ঘোষণা দেয়নি। ফলে আমদানি ও রপ্তানি অব্যাহত আছে। যেসব দেশ থেকে বাংলাদেশ অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আমদানি করে সেসব দেশে করোনাভাইরাস মহামারি পর্যায়ে যায়নি।









© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com