বাঙালির আবহমান শক্তি

অনন্য ও অতুলনীয় উৎসব

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

যতীন সরকার

নাস্তিক সেও পায় বিধাতার বর,

ধার্মিকতার করে না আড়ম্বর।

শ্রদ্ধা করিয়া জ্বালে বুদ্ধির আলো,

শাস্ত্র মানে না, মানে মানুষের ভালো।

-রবীন্দ্রনাথ

পরম আস্তিক ও ভাববাদী কবি রবীন্দ্রনাথ নাস্তিকতার মহিমা-কীর্তনের উদ্দেশ্যে, কিংবা ধর্মনিন্দা ও শাস্ত্র-বিরোধিতার লক্ষ্যে নিশ্চয়ই এ-পঙ্‌ক্তিগুলো রচনা করেননি। তবে নাস্তিকতা, ধার্মিকতা ও শাস্ত্র-অনুসারিতা বিষয়ক চিন্তায় যে-স্বাতন্ত্র্য তিনি সারাজীবন ধারণ করেছেন, সেই স্বাতন্ত্র্যই এখানে একান্ত তীক্ষষ্টতার সঙ্গে অভিব্যক্তি পেয়েছে।

সর্বপ্রকার মোহগ্রস্ততার তিনি ছিলেন বিরোধী। যে-কোনো বিষয়ে বাহ্যিক আড়ম্বরকে তিনি ঘৃণা করতেন। কোনো এক অতিবর্তী ঈশ্বরের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে তার কাছে এটা-ওটার জন্য প্রার্থনা জানানোটাই তার কাছে আস্তিকতা বা ধার্মিকতা বলে বিবেচিত হতো না, কিংবা এর বিপরীত বিশ্বাস পোষণকারী বা আচরণকারীকেই তিনি নাস্তিক বলে চিহ্নিত করতেন না। তার সমস্ত চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মানুষ। সেই মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিকে যার দৃষ্টি নেই, সে যতই ঈশ্বরবিশ্বাসী বা আনুষ্ঠানিক ধর্মানুসারী হোক, তাকে আস্তিক বা ধার্মিক বলে মানতে রবীন্দ্রনাথ কখনও রাজি ছিলেন না। শাস্ত্র সম্পর্কেও তার একই দৃষ্টিভঙ্গি। মানুষের জীবনের সুশাসনের জন্যই শাস্ত্রের প্রয়োজন; মানুষই শাস্ত্র তৈরি করে; শাস্ত্র কোনো মানুষ তৈরি করে না। অথচ প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। ওই শাস্ত্র-ব্যবসায়ীরা অনেক অবিশ্বাস্য বিষয়ও শাস্ত্রের নামে মানুষকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করে। রবীন্দ্রনাথ এই বাধ্যতাকে সারাজীবনই অমান্য করে এসেছেন। তার নির্দি্বধ অভিমত :'যাহা বিশ্বাস্য তাহাই শাস্ত্র, যাহা শাস্ত্র তাহাই বিশ্বাস্য নহে।চ্ বুদ্ধিদীপ্ত শ্রদ্ধা সহকারেই শাস্ত্রের সকল কথা বিচার্য; শাস্ত্র মানববুদ্ধির অধীন, মানববুদ্ধি কখনও শাস্ত্রের অধীনতা স্বীকার করতে পারে না।'

অথচ কট্টর শাস্ত্রানুসারীরা যে-ধর্মতন্ত্র মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়, সে-ধর্মতন্ত্র মানববুদ্ধির স্বাধীনতা একটুও স্বীকার করে না, বরং বুদ্ধিকে শৃঙ্খলিত করাই তার মূল লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য-সাধনে নিরত হয়ে মানুষের অগ্রগতিকে তারা নানাভাবে ব্যাহত করে। প্রকৃত ধর্মের বদলে তারা বিস্তার ঘটায় ধর্মমোহের। ধর্মমোহকে রবীন্দ্রনাথ কোনোদিন প্রশ্রয় দেননি। স্পষ্ট ভাষায় তিনি জানিয়েছেন, 'ধর্মমোহের চেয়ে নাস্তিকতা অনেক ভালো।' কারণ তিনি তো দেখেছেন-

ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে

অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।

এবং এই ধর্মমোহগ্রস্ত মানুষেরা-

বিধর্ম বলি মারে পরধর্মেরে

নিজ ধর্মের অপমান করি ফেরে,

পিতার নামেতে হানে তার সন্তানে,

আচার লইয়া বিচার নাহিকো জানে,

পূজাগৃহে তোলে রক্তমাখানো ধ্বজা-

দেবতার নামে এ যে শয়তান ভজা।

এই 'শয়তান ভজা'র কাজটি ওরা করে উৎসবের নামেও। উৎসবকে উপলক্ষ করেও ওরা যে 'মারে আর মরে'- এমনটি তো আমরা অনেক দেখেছি। দুর্গাপূজা কিংবা দোলযাত্রা, ঈদুল ফিতর কিংবা ঈদুল আজহা- এসব পবিত্র উৎসব নিশ্চয়ই অনেক উচ্চ আধ্যাত্মিক ভাবনার ধারক। এগুলোর কোনোটাই নিশ্চয় মারা আর মরার জন্য নয়। অথচ মোহগ্রস্ত ও মোহবিস্তারকারী তথাকথিত ধর্ম-অনুসারী মানুষগুলোর হাতে পড়ে এই পবিত্র উৎসবগুলোও চরম অপবিত্রতার ধারক হয়ে ওঠে; ধার্মিকতা পর্যবসিত হয় সাম্প্রদায়িকতায়। দুর্গাপূজা উৎসবের শেষ দিন 'বিজয়া'য় দুর্গাপ্রতিমা কিংবা দোলযাত্রায় ভিন্ন ধর্মানুসারী অনিচ্ছুক মানুষের গায়ে রং ছিটিয়ে দেওয়া, এবং তারই ফলে হিন্দু-মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগার ঘটনা তো এই কিছুদিন আগেও ঘটেছে। ঈদ উৎসব উপলক্ষে হিন্দু মন্দিরের সামনে গরু কোরবানি করেও অনুরূপ ঘটনাই ঘটানো হয়েছে। এ রকম অবাঞ্ছিত কর্মকাণ্ডের ফলে উৎসব আর উৎসব থাকেনি; উপদ্রবে পরিণত হয়ে যায়।

উপদ্রবের হাত থেকে বাঁচার জন্যই উৎসব সম্পর্কীয় ধারণাকে স্পষ্ট করে নেওয়া প্রয়োজন। প্রকৃত উৎসব একাকিত্ব থেকে, সংকীর্ণতা থেকে, সাম্প্রদায়িকতা থেকে মানুষের উত্তরণ ঘটায়, এবং এ রকম উত্তরণ ঘটিয়েই উৎসবের দিনগুলো বছরের অন্য দিনের চেয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের ধারক হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, 'প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র দীন একাকী- কিন্তু উৎসবের দিন মানুষ বৃহৎ; সেদিন সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহৎ; সে দিন সে সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া মহৎ।'

শুধু এইটুকুই নয়। উৎসব-দিনের প্রকৃত তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে রবীন্দ্রনাথ আরও লিখেছেন, '...উৎসবের দিন শুধুমাত্র ভাবরস সম্ভোগের দিন নহে, শুধুমাত্র মাধুর্যের মধ্যে নিমগ্ন হইবার দিন নহে ... বৃহৎ সম্মিলনের মধ্যে শক্তি উপলব্ধির দিন, শক্তিসংগ্রহের দিন।'

সম্প্রদায়গত ধর্মতন্ত্র-সংশ্নিষ্ট কোনো দিনই-যে 'সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র' হওয়ার কিংবা 'সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব' করার মতো মহৎ উৎসবের দিন বলে গণ্য হতে পারে না- এ কথা রবীন্দ্রনাথ খুব ভালো করেই জানতেন। তা জানতেন বলেই বাঙালির উৎসবের তিনি সন্ধান করেছেন ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালিত্বের মর্মস্থলে। বাঙালি সমাজের মানুষেরা বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বাঙালিত্বকে তারা অধিষ্ঠিত রেখেছে সমস্ত প্রকার ধর্মসাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে, সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ প্রকৃতি-চেতনা ও পরিপার্শ্ব-ভাবনা বিশেষভাবে রূপ পেয়েছে ঋতু-পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে। কারণ ঋতু-পরিবর্তনের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে সংযুক্ত তাদের জীবন ও জীবিকা। ঋতু-পরিবর্তনের সঙ্গে তাল রেখেই তাদের জীবন-আচরণেও পরিবর্তন ঘটাতে হয়। পরিবর্তন-ঘটার দিনটিই হয় তাদের ঋতু-উৎসবের। এই ঋতু-উৎসবের সূচনা রূপেই ঘটা করে পালিত হয় নববর্ষ বা বর্ষবরণের উৎসব। শুধু বর্ষবরণ নয়, বর্ষবিদায়ও। চৈত্রসংক্রান্তির বর্ষবিদায়ের মধ্য দিয়েই সূচিত হয় পয়লা বৈশাখের বর্ষবরণ। বাঙালি সমাজ আবহমান কাল ধরে লৌকিক রীতিতেই বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের উৎসব করে আসছে। এ-উৎসবের রীতি পদ্ধতিতে সাম্প্রদায়িক ধর্মতন্ত্রের কোনো ছোঁয়া লাগেনি।

এ-বিষয়টিরই স্পষ্ট প্রতিফলন পড়ে রবীন্দ্র-চৈতন্যে। বাংলার ষড়ঋতু শুধু তার সাহিত্য সৃষ্টিরই বিষয়ীভূত হয়নি, প্রতিটি ঋতুকেই তিনি উৎসবের ভেতর দিয়ে বরণ করে নিয়েছেন। সে-সব ঋতু-উৎসবে বিধৃত হয়েছে বাঙালির লৌকিক চেতনা-সম্ভূত প্রকৃতি-দর্শনেরই রবীন্দ্রায়িত রূপকল্প। সে-রূপকল্প যেমন রবীন্দ্রনাথের বর্ষামঙ্গল, শারদোৎসব বা বসন্তবরণের মধ্যে দৃশ্যমান, তেমনই দৃশ্যমান পুরাতন বছরের বিদায় ও নতুন বছরের আবাহন-সূচক উৎসবেও। স্মরণাতীত কাল থেকে উদযাপিত নববর্ষ উৎসবের নবায়ন ঘটিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। নবায়িত এই নববর্ষ উৎসবই একালের বাঙালির ধর্মতন্ত্র-নিরপেক্ষ সর্বজনীন উৎসব। বিশেষ করে শহর-বন্দরের শিক্ষিত বাঙালি প্রতি বছর পয়লা বৈশাখে নববর্ষ উৎসবে সম্মিলিত হয়ে বাঙালিত্বের বোধে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। এটি যথার্থ উৎসব এ-কারণে যে, এ-দিনে ক্ষুদ্র পরিহার করে মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করে সকলে সম্মিলিত হয়। এ-সম্মিলনে কোনো ধর্মতন্ত্র তার শাস্ত্রীয় শাসনের রক্তচক্ষু প্রদর্শন করে না; ধর্মের বেশে মোহ এসে কাউকে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরে না। বিশ্বাসের অন্ধকার থেকে বের হয়ে মুক্তবুদ্ধির আলোতে যারা পথ চলে, শাস্ত্র মানুক বা না-মানুক, 'মানে মানুষের ভালো'- এমন সব মানুষেরই উৎসব চৈত্রসংক্রান্তির বর্ষবিদায় ও পয়লা বৈশাখের বর্ষবরণ।

আমরা অনুভব করি যে :বাংলাদেশের ক্ষুদ্র-বৃহৎ সকল জাতিসত্তার সংহতি-সাধক আমাদের নববর্ষ উৎসব। এই উৎসব উদযাপনের মধ্য দিয়ে এক সময় আমরা ধর্মতন্ত্রের মোহবিস্তারকারী পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলাম। সেই সংগ্রামে জয়লাভ করে যে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা করেছি, সেই বাংলাদেশকে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্ররূপে গড়ে তুলতে, এবং এদেশের বুকে ধর্মতন্ত্রী পাকিস্তানবাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে প্রতিহত করতেও আমাদের নববর্ষ উৎসবের সহায়তা গ্রহণের আবশ্যকতা একান্ত অপরিহার্য। এটি অপরিহার্য দেশের সকল জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে 'সাংস্কৃতিক ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন' রচনা করার জন্যও। আমাদের নববর্ষ সত্যি সত্যিই অনন্য ও অতুলনীয় এক উৎসব।

লেখক

শিক্ষাবিদ

প্রাবন্ধিক

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com