চার শিল্পীর অভিজ্ঞতায় রবির শান্তিনিকেতন

০৮ মে ২০২০

বিনোদন প্রতিবেদক

রবি ঠাকুর যেখানে সৃষ্টি সুখের উলল্গাসে মেতে উঠেছিলেন, সেই শান্তিনিকেতনে গড়ে তুলেছিলেন এক বিদ্যাপীঠ। গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার এই বিদ্যাপীঠে আনাগোনা অগণিত শিক্ষার্থীর। যার ছায়াতলে থেকে রবীন্দ্রচর্চার মধ্য দিয়ে স্বনামে প্রতিষ্ঠিত। তেমনই চার শিল্পী কথা বলেছেন কবিগুরুর বিদ্যাপীঠ নিয়ে। 

প্রাচীন আর্য আশ্রমের আদর্শে প্রাকৃতিক পরিবেশে উন্মক্ত আকাশের নিচে হবে শিক্ষাদান- এই ভাবনা থেকে রবি ঠাকুর শান্তিনিকেতনে স্থাপন করেছিলেন পাঠভবন নামের বিদ্যালয়। সময়ের পালাবদলে সেই বিদ্যাপীঠ হয়ে উঠেছে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। যার ছায়াতলে অঙ্কুর থেকে মহিরুহে পরিণত হয়েছেন ইন্দিরা গান্ধী, আবদুল গণি খান, সত্যজিৎ রায়, অমর্ত্য সেনের মতো বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বরা। এদেশের খ্যাতিমান বেশ কিছু শিল্পীর একসময় পদচারণা ছিল শান্তিনিকেতনে। কেউ শিক্ষার জন্য আবার কেউ রবিঠাকুরের অনন্য কীর্তি দেখতে বহুবার ছুটে গেছেন শান্তিনিকেতনে। তাদের মধ্য একজন বরেণ্য রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সাদী মহম্মদ। বুয়েটে পড়াশোনাকালীন ছুটে গিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে। সত্তর দশকের সেই দিনগুলো আজও তার স্মৃতিতে অম্লান। শোনালেন সেইসব দিনের কথা। বললেন, 'নতুন ঠিকানা, অচেনা সব মুখ, অজানা প্রান্তর। তবু যেন আছে কিসের এক টান। হয়তো সে কারণেই কদমতলা হোস্টেলের পাশাপাশি শান্তিনিকেতনের অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে সময় লাগেনি। ওরা ছিল ক্ল্যাসিকালে দক্ষ- আমি ছিলাম আনাড়ি। তবু সহপাঠীরা আমাকে অত্যন্ত আপন করে নিয়েছিল, ক্ল্যাসিকাল রপ্ত করতে বন্ধুর হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। মনে আছে, মোহর'দির [কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়] সঙ্গে সংগীত ভবনে প্রথম পরিচয়ের দিনটি। কবিগুরুর এই ছাত্রীকে শিক্ষক হিসেবে পাওয়া ছিল ভীষণ আনন্দের। পরিচয়রে পর বর্ষামঙ্গলের গানের মহড়ার দিয়ে শুরু হয়েছিল শান্তিনিকেতন পাঠ। কণিকা বন্দোপাধ্যায়ের পাশাপাশি নীলিমা সেন, সুধীশ বন্দ্যোপাধ্যায়, আশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুভিনা রায়, শান্তিদেব ঘোষসহ অনেক গুণীতে পেয়েছিলাম শুরু হিসেবে। যাদের সঙ্গে মধুর সম্পর্কস্থাপন আর শিক্ষা আদান-প্রদানের মধ্যে দিয়ে কেটে গেছে ছয় বছর। সবুজের মাঝে মিশে গিয়ে কণ্ঠে তুলে নিতাম সুর। এছাড়াও ফুল দিয়ে ঋতু চেনা, পূর্ণিমা রাতে চন্দ্রস্ট্নান, নকশী রেঞ্চে বসে আড্ডা এবং আর কত ঘটনার মধ্যে দিয়ে যে কেটে শান্তিনিকেতনের দিনগুলো- তা বলে শেষ করা যাবে না।

সাদী মহম্মদের পাশাপাশি একই সময়ে শান্তিনিকেতনের পথে পথে হেঁটেছেন দেশের খ্যাতিমান আরেক কণ্ঠশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। কথা শুরু করলেন পাঁচ বান্ধবীর বৃষ্টিভেজা দিনের কথা দিয়ে। বললেন, 'দু-পাশে ধানক্ষেত, মাঝে রাস্তা, সে রাস্তা দিয়েই যাচ্ছিলাম আমরা। হঠাৎ বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নামল বৃষ্টি। জনমানবহীন সেই বৃষ্টিভেজা পথে শুধু আমরা পাঁচজন। মুহূর্তেই বদলে গিয়েছিল অনুভূতি। মনে হয়েছিল, কোনো বিদ্যাপীঠে নয়, আমরা যেন পর্যটকের মতো সবুজে ঢাকা কোনো অচিন প্রান্তরে ভ্রমণ করছি। এমন অনুভূতির কারণ একাটই- প্রকৃতির সঙ্গে এই শান্তিনিকেতনের বিদ্যাপীঠের দারুণ এক মেলবন্ধন আছে। যেজন্য অন্যান্য বিদ্যাপীঠের সঙ্গে বিশ্বভারতীকে কোনো ভাবেই মেলনা যায় না। কারণ রবীন্দ্রনাথ নিজেই চেয়েছিলেন প্রকৃতির সান্নিধ্যে রেখে আশ্রমের আদর্শে শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে দিতে। মানুষকে প্রকৃতির আরও কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার এমন প্রয়াস আগে কোথাও চোখে পড়েনি। শান্তিনিকেতন এমন নিরিবিলি একটা স্থান, যেখানে গান এমনিতেই চলে আসে। ঘন সবুজ গাছপালায় ঢাকা চারপাশ। মাঝেমধ্যে দু-একটা ভবন- যেন সবকিছু কত সাজানো গোছানো। এমন পরিবেশে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, শান্তিদেব ঘোষ, নীলিমা সেন, আশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো শিক্ষকের সান্নিধ্যে থেকে নিজেকে শিল্পী হিসেবে গড়ে তোলার মুহূর্তগুলো কখনও ভুলে যাওয়ার নয়। একরকম সাধনার মধ্য দিয়ে দিনগুলো বছরগুলো কখন যে ফুরিয়ে গেছে, বুঝতেই পারিনি।

বিশ্বভারতীর শিক্ষার্থী না হলেও শান্তিনিকেতনের প্রতি অন্যরকম এক ভালোলাগা আছে নন্দিত কণ্ঠশিল্পী শামা রহমানের। একাধিকবার গিয়েও শান্তিনিকেতনের অমোঘ আকর্ষণ আজও এড়াতে পারেননি। তিনি বলেন, 'রবীন্দ্রপ্রেম যার হৃদয়ে, কবিগুরুর দর্শন যারা মেনে চলে, তারা শান্তিনিকতনের কিছু সময় কাটালেও তা স্মৃতির মণিকোঠায় স্থান পাবে। এটা উপলব্দি করেছি বলেই সুযোগ পেলে ছুটে যাই সেখানে। মুগ্ধ হয়ে দেখি, বিশ্বকবির বিদ্যাপীঠকে। যেখান তিনি প্রচলিত ধারার বাইরে মানুষকে শিক্ষিত করতে চেয়েছেন। যেখানে রবিঠাকুর এসে থাকতেন সেই কোনার্ক, পুনশ্চ, উদয়ন, শ্যামলী, উত্তরায়ন, উদীচি ভবনগুলো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে। কবির ব্যক্তিগত ব্যবহার সামগ্রী, পেইন্টিং এবং তার বইগুলোর বিভিন্ন সংস্করণের সংগ্রহ দেখেও মুগ্ধতা কাটে না। ছাতিমতলার কথাও কখনও ভুলে যাওয়ার নয়। বসন্ত উৎসব, বর্ষামঙ্গল, পৌষমেলা, মাঘমেলায় গিয়ে সঙ্গীতের মাঝে ডুব দেওয়ার বাসনা তাই আজও ফুরিয়ে যায়নি।'

শান্তিনিকেতন নিয়ে অদিতি মহসিনও দারুণ কিছু দৃশ্য চোখের সামনে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, 'মেঠোপথ, চারপাশ সবুজ বানানীতে ঘেরা, কোলাহলমুক্ত এমন এক পরিবেশ দেখে যে কেউ মুগ্ধ হবে। আমিও হয়েছিলাম। তখন সেখানে কোনো গাড়ি-ঘোড়া চলত না। হেঁটে নয়তো সাইকেলে সবাই যাতায়াত করত। বিশ্বাভারতীর ছাত্রী হয়ে উঠেছিলাম 'আনন্দসদন' হলে। এরপর রবীন্দ্রচর্চার মধ্য দিয়ে শান্তিনিকেতনের প্রতিটি মুহূর্ত ছবির মতো হৃদয়ে গেঁথে রেখেছি। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, নীলিমা সেনের কাছে শিক্ষা নেওয়ার ক্ষণগুলো আজও স্মৃতিপটে আঁকা আছে। সংগীতচর্চা ছাড়াও সোনাঝুড়ির বনে ঘুরে বেড়ানো, কোপাই নদীতে ঝাাঁপাঝাঁপি, বন্ধুদের সঙ্গে খুনসুটি, দল বেঁধে মহড়া নয়তো সিনেমা দেখতে যাওয়া- এমন আরও কত কী যে করেছি, তা বলে শেষ করা যাবে না।'

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)