ডলফিন রক্ষায় প্রশাসনের ৯ পদক্ষেপ

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) লাল তালিকায় থাকা অতি বিপন্ন প্রজাতির ডলফিন রক্ষায় অবশেষে নড়েচড়ে বসছে জেলা প্রশাসন। হালদা নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে নৌ থানা স্থাপনের নতুন প্রস্তাব নিয়ে এগোচ্ছে তারা। ডলফিন হত্যার ঘটনায় প্রথমবারের মতো দায়ের করা হয়েছে মামলা। জনসচেতনতা বাড়াতে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে হালদাপাড়ের আশপাশে থাকা সব জনপ্রতিনিধিকে। বাড়ানো হবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নজরদারিও। ডলফিন রক্ষায় এমন নয় অঙ্গীকার উল্লেখ করে উচ্চ আদালতে একটি প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন। এই প্রতিবেদনে অতীতে প্রশাসন কী ভূমিকা পালন করেছে উল্লেখ আছে সেটিরও। ডলফিন রক্ষায় আদালতে এমন প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম।

হালদা দেশের একমাত্র নদী, যেখানে কার্প জাতীয় মা মাছ প্রতি বছর একটি নির্ধারিত সময়ে এসে ডিম ছাড়ে। আবার বিপন্ন প্রজাতির ডলফিন সর্বোচ্চ সংখ্যক আছে এই নদীতে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই নদীতে একের পর এক ডলফিন হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে গত মাসে আদালত কঠোর সমালোচনা করে স্থানীয় প্রশাসনের। ডলফিন রক্ষায় গৃহীত পদক্ষেপের কথাও প্রশাসনকে তিন দিনের মধ্যে জানাতে বলেন আদালত। এটির পরিপ্রেক্ষিতেই নয় পদক্ষেপের কথা লিখিতভাবে আদালতকে জানাল স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন।

জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন বলেন, 'ডলফিন বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী। তাই এটি রক্ষায় কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন আদালত। আমরা সেই নির্দেশনা মেনে আদালতে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেছি। আবার ডলফিনসহ হালদার জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নতুন কিছু অ্যাকশন প্ল্যানও চূড়ান্ত করেছি। ডলফিন হত্যার ঘটনায় এবার প্রথমবারের মতো মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে তাদের আইনের আওতায়ও আনতে বলেছি পুলিশ প্রশাসনকে। আর স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনকে বলেছি জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম আরও জোরদার করতে।' প্রসঙ্গত, ছুটির ফাঁকেই হালদা নদীর সবচেয়ে বড় ডলফিনটিকে চিরদিনের ছুটি দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। গত ২২ মে তারা সাত ফুট এক ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের এই ডলফিনকে জালে আটকে হত্যা করে। এর ১৫ দিন আগে ৮ মে আরেকটি ডলফিনকে তারা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল। ১৫ দিনের ব্যবধানে এভাবে দুটি ডলফিন হত্যার হয়নি আগে কখনোই। তবে গত আড়াই বছরে হালদা নদীতে বিভিন্নভাবে প্রাণ গেছে ২৫ ডলফিনের।

নদী গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, 'ডলফিন প্রকৃতির খুব উপকারি প্রাণী। এরা কারও কোনো ক্ষতি করে না। তবু শুধু হালদা নদীতেই গত আড়াই বছরে ২৫টি ডলফিন প্রাণ হারিয়েছে।' তিনি জানান, জরিপের মাধ্যমে ২০১৮ সালে হালদা নদীতে ডলফিনের সংখ্যা ও দৈর্ঘ্য চূড়ান্ত করে হালদা রিভার রিচার্স ল্যাবরেটরি। তখনকার হিসাবে হালদায় ডলফিন ছিল ১৭০টি। এখন বেঁচে আছে আর ১৪৫টি। এজন্য আদালত বিপন্ন প্রজাতির এই ডলফিন রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসনকে।

হালদা নদীর জীববৈচিত্র্য নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে কাজ করছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরি। এর আগে তারা হালদায় এত ডলফিন মারা যাওয়ার কারণ উদ্‌ঘাটন করতে সাতটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে ডলফিনের পোস্টমর্টেম করে। এখন নদীর নিচে ইকোসাউন্ডার রেখে তারা নতুন করে জরিপ করছে ডলফিনের। আগে নদীকে আটটি জোনে ভাগ করে শারীরিক উপস্থিতির মাধ্যমে জরিপ করেছিল এই প্রতিষ্ঠান। এবার ইকোসাউন্ডারের পাশাপাশি ডলফিনের আবাসস্থলকে ২৫টি জোনে ভাগ করেছে তারা। ছয় মাস আগে শুরু হওয়া এই জরিপ এখনও চলছে। এটি সম্পন্ন হলে হালদায় বিপন্ন ডলফিনের সর্বশেষ সংখ্যা জানাতে পারবেন তারা।

হালদা নদীর একপাড়ে রাউজান। আরেক পাড়ে হাটহাজারী উপজেলা। এই নদী রক্ষায় তাই যৌথভাবে কাজ করছে দুই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানা প্রশাসন। তবে সম্প্রতি যে দুটি ডলফিন প্রাণ হারিয়েছে তা পাওয়া গেছে রাউজান অংশে। তাই আদালতে লিখিতভাবে জবাব দিতে হয়েছে রাউজান থানার নির্বাহী কর্মকর্তা জোনায়েদ কবীর সোহাগকে। আদালতের কাছে পাঠানো জবাবে তিনি নয়টি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। জানতে চাইলে জোনায়েদ কবীর সোহাগ বলেন, 'হালদা নদীকে রক্ষা করতে হলে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা আরও বাড়ানো হবে। নৌ থানা স্থাপন করতে পুলিশ সুপারসহ সংশ্নিষ্টদের আমরা পত্র দিয়েছি। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৪৮টি অভিযানে গত এক বছরে এক লাখ ৫২ হাজার মিটার অবৈধ জাল, পাঁচটি ডেজার ও সাতটি ইঞ্জিনচালিত নৌযান জব্দ করে ধ্বংস করেছি।' অন্যদিকে হাটহাজারীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, 'হালদা নদীকে দূষণমুক্ত করতে গত দেড় বছরে ১০৯টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছি। এক লাখ ১৫ হাজার ঘনফুট বালু, দুই লাখ ২১ হাজার মিটার ঘেরাজাল ও ৯টি ড্রেজার জব্দ করেছি। সামনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম আরও জোরদার করব আমরা।'



© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com