বিশেষ লেখা

শুল্ক-কর প্রস্তাবে জনপ্রত্যাশার প্রতিফলন হয়নি

১২ জুন ২০২০ | আপডেট: ১২ জুন ২০২০

মো. ফরিদউদ্দিন

বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রশংসার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছিল। আর্থিক খাতের সংকট, ব্যক্তি খাতের স্বল্প বিনিয়োগ, কর-জিডিপির নিম্নহার, ব্যবসার ব্যয়- ইত্যাদির ক্ষেত্র ব্যতীত রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয়, কৃষি, শিল্পসহ সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যান্য সূচক ভালোই করছিল। উন্নয়নের নতুুন ধাপে যাওয়ার সমূহ প্রস্তুতিও চলছিল। এরই মধ্যে চলতি বছরের শুরু থেকে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এতে অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেরও জনস্বাস্থ্যসহ সার্বিক অর্থনৈতিক চিত্র হঠাৎ ওলটপালট হয়ে যায়। ভাইরাসের কারণে জনমনে আতঙ্ক, বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা, লকডাউন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির-বন্ধ হওয়া, আমদানি-রপ্তানি তথা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইনে স্থবিরতা, বেকারত্ব, দারিদ্র্য ইত্যাদি দেখা দেয়। এতে অর্থনীতির সব হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়।

উপরোক্ত প্রেক্ষাপটেই আসন্ন ২০২০-২০২১ অর্থবছরের বাজেট ভাবনা, পরিকল্পনা শুরু হয়। আশা ছিল পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাজেটের মূল লক্ষ্য হবে হঠাৎ থমকে যাওয়া, ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে আগের স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসা, কর্মসৃজন, চাহিদা ও আর্থিক তারল্য সৃষ্টি করা ইত্যাদি। সেলক্ষ্যে ভাইরাসসৃষ্ট সংকট থেকে দেশ ও অর্থনীতিকে উদ্ধারের লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে বেশকিছু আর্থিক ও খাদ্য সহায়তামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে গৃহীত এসব পদক্ষেপ সর্বমহলে প্রশংসিতও হয়েছে। কিন্তু শুল্ক ও কর বিষয়ে জাতীয় সংসদে ঘোষিত ২০২০-২১ বাজেটে সাধারণ মানুষের উল্লিখিত প্রত্যাশা তেমন প্রতিফলন হয়েছে বলে মনে হয় না। তাছাড়া এ খাতগুলোতে বিগত বছরের মতোই যে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তাও বাস্তবসম্মত হয়েছে বলে মনে হয় না।

করোনাভাইরাসে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশ অর্থনীতির স্থবিরতা, বেকারত্ব, প্রান্তিক মানুষের খাদ্য সংকট, অধিকাংশ মানুষের আয় হ্রাস- ইত্যাদি সমস্যা ব্যাপকভাবে দেখা দেওয়ায় বাজেটে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উৎপাদন, সাপ্লাই চেইন, পরিবহন, কর্মসৃজন, আয় বৃদ্ধি ইত্যাদি প্রকৃতির ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার জন্য বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয়েছিল। এসব প্রত্যাশিত পদক্ষেপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলোকে করোনার পূর্বের উৎপাদন ও সরবরাহ পর্যায়ে নিয়ে আসা। সে লক্ষ্যে ৫০ হাজার কোটি টাকার আর্থিক প্রণোদনাও ঘোষণা করা হয়েছিল। এর সঙ্গে ক্রমাগত কর্মহীন হওয়া, আয় হ্রাস পাওয়া বা আয় না থাকা মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে যাতে পণ্য পাওয়া যায় সে লক্ষ্যে শিল্পের কাঁচামালের শুল্ককর হ্রাস বা যৌক্তিকীকরণ করা হবে বলে আশা ছিল।

প্রস্তাবিত বাজেটে আমদানি শুল্ক ও কর, স্থানীয় ভ্যাট, আয়কর, করপোরেট কর সম্পর্কে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা বিগত বছরগুলোর মতো স্বাভাবিক প্রকৃতির। পরিবর্তিত সময় ও পরিস্থিতি উপযোগী বলে মনে হয় না। প্রত্যাশা ছিল, ব্যতিক্রমী সময় হিসেবে স্থানীয় শিল্পকে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি প্রতিরক্ষণ সুবিধা দেওয়ার। প্রত্যাশিত এ প্রতিরক্ষণের হার নূ্যনতম ৩০-৪০ শতাংশ হওয়া উচিত। এ বছরও তা দেওয়া হয়নি। কাঁচামালের শুল্ক ও কর হ্রাস বা তৈরি পণ্যে শুল্ক যৌক্তিকভাবে বৃদ্ধির মাধ্যমে তা করা যেত। এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে আশা করা যায়। প্রান্তিক, ক্রমাগত দারিদ্র্যে পর্যবসিত জনগোষ্ঠী, কর্ম ও আয়হারা বা নিম্ন আয়ের মানুষের স্বার্থে আমদানীয় অত্যাবশ্যকীয় ভোগ্যপণ্য যেমন ভোজ্যতেলের শুল্ক ও কর হ্রাস করা হলে ভালো হতো। বাজেটে এ সংক্রান্ত কোনো ঘোষণা দেখা যায়নি।

মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বিষয়ে প্রত্যাশা ছিল- ২০১২ সালের মূল্য সংযোজন কর আইনে ২০১৯ সালের অর্থ আইনের মাধ্যমে আদর্শ মূল্য সংযোজন কর ব্যবস্থার পরিপন্থি যেসব সংশোধনী এনে মূল আইনটিকে একটি সেলস ট্যাক্স আইনে পরিণত করা হয়েছিল- এ বছর তা সংশোধন করা হবে। তার সঙ্গে এ বছরের ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি বিবেচনা করে ভ্যাট হার হ্রাস বা যৌক্তিকীকরণ করা হবে। উদ্দেশ্য হবে- ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে উৎপাদন কাজে প্রণোদনা ও অনুপ্রেরনা দেওয়া যাতে কর্মসংস্থান ও কার্যকর চাহিদা বৃদ্ধি পায়। আরও প্রত্যাশা ছিল, শিল্প খাতে আরোপিত ও আন্তর্জাতিক উত্তমচর্চা বর্হিভূত ৫ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহার, মাল্টিপল করহার হ্রাস, ভ্যাটযোগ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে রক্ষার্থে ১৫ শতাংশের ভ্যাট হার হ্রাস, এসএমই প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে করসীমা বৃদ্ধি, টার্নওভার করহার ব্যাপক হ্রাস, ৫ শতাংশে আরোপিত ট্রেড-ব্যবসায়ী ভ্যাট হ্রাস যৌক্তিকীকরণ করা ভ্যাটের পদ্ধতিগত জটিলতা নিরসন। ঘোষিত বাজেটে এসব বিষয়ে আশানুরূপ কিছু করা হয়েছে বলে দেখা যায় না।

করোনার কারণে যৌক্তিক সময় হওয়া সত্ত্বেও উল্লিখিত বিভিন্ন কর বিষয়ে বর্ণিত প্রত্যাশা অনুযায়ী পদক্ষেপ না নেওয়ার একমাত্র কারণ হতে পারে রাজস্ব আয় হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা। বিগত আড়াই দশকের বিশ্ব অভিজ্ঞতা বলে, শুল্ক ও করহার কমালে রাজস্ব আয় কমে না বরং বাড়ে। কারণ করের বোঝা যত কম হবে তা ততো ভোক্তা ও ব্যবসায়ীবান্ধব হবে। এতে পরিপালন হারও বৃদ্ধি পাবে। পক্ষান্তরে করহার বেশি হলে ব্যবসায়ীরা তা ফাঁকি দেবেন বা এড়িয়ে যাবেন। বাংলাদেশে আমদানি, স্থানীয় পর্যায়ে ও আয়কর এবং করপোরেট করে শুল্ক ও করহার বেশি বলেই অভিজ্ঞ মহলের এমনকি সাধারণ মানুষেরও অভিমত। এ কারণে এখানে কর ফাঁকি ও বেশি যা জিডিপির প্রায় ৭-৮ শতাংশ। এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

প্রস্তাবিত বাজেটে এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা প্রাক্কলন করা ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান বাস্তবতায় চলতি ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হবে বড়জোর ২ লাখ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আদায় কম হওয়ায় বাজেট ঘাটতি বেড়েছে। আর তা পূরণের জন্য সরকারকে ঋণ করতে হবে বেশি। প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, চাহিদা, সরবরাহ, আয় ইত্যাদি নিরীখে এ বছর ভালো যাবে না বলেই সব মহলের অভিমত। বিশ্বব্যাংকও সে রকমই বলছে। এ অবস্থায় প্রস্তাবিত ২০২০-২০২১ অর্থবছরে নিম্নমুখী অর্থনৈতিক পরিবেশে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা কতটা যথাযথ তা সহজেই অনুমান করা যায়। তবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কর ফাঁকির যে চিত্র তা কর ব্যবস্থাপনার আওতায় কার্যকরভাবে আনা সম্ভব হলে উল্লেখিত উচ্চ লক্ষ্যমাত্রার সিংহভাগ পূরণ করা সম্ভব হবে। সার্বিক চিত্র থেকে বলা যায়, ২০২০-২০২১ অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক ও কর বিষয়ে জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে বাজেট আরও কল্যাণকর হবে বলে আশা করা যায়।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)