রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া সিগারেট বাণিজ্য থামছে না

২৫ জুন ২০২০ | আপডেট: ২৫ জুন ২০২০

সমকাল প্রতিবেদক

রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া সিগারেটের প্রসার ঠেকানোই যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া সিগারেট কারখানায় একের পর এক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে অভিযানগুলোর কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। অভিযানের পর কিছুদিন বন্ধ থাকে কারখানা, তারপর আবার চালু হয়। এর পেছনে কারণটাই বা কী?

একাধিক সূত্র অনুযায়ী, সিগারেটের শিল্পের মোট ৮ থেকে ১০ শতাংশই রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া সিগারেটের কারণে সরকার গত অর্থবছরে এক হাজার থেকে দেড় হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারায়। এ অবস্থা চলতে থাকলে বৃহৎ রাজস্ব প্রদানকারী এই খাত মুখ থুবড়ে পড়বে। সরকার হারাবে রাজস্ব এবং জনস্বাস্থ্য পড়বে হুমকির মুখে। ঠিক কী কারণে অভিযান ভেস্তে যাচ্ছে অনুসন্ধান তা উঠে এসেছে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চিত্র : কুষ্টিয়ায় অবস্থিত ভারগন টোব্যাকোতে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অভিযান চালানো হয়। দুটি অভিযান থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের অবৈধ স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল ও সিগারেট উদ্ধার করা হয়। কিন্তু এত বড় অভিযানের পরও থেমে থাকেনি তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া। অনুসন্ধানে দেখা যায়, চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটি ট্যাক্স স্ট্যাম্প এবং ব্যান্ডরোল উত্তোলন করেছে সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (এসপিসিবিএল) থেকে। তার মানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ ট্যাক্স স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল পাওয়া সত্ত্বেও তাদের বড় কোনো শাস্তি না দিয়েই কি আবার কারখানা চালুর অনুমতি দেওয়া হলো? কুষ্টিয়া যশোর কাস্টমস এক্সাইজ এবং ভ্যাট কমিশনারেটের আওতাধীন। এ ব্যাপারে যশোরের কমিশনার জাকির হোসেনকে ফোন দেওয়া হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। প্রশ্ন হচ্ছে, ভারগন টোব্যাকো রাজস্ব জমা দেয় যেই যশোর কমিশনারেটের কাছে সেই যশোর কমিশনারেট কীভাবে তাদের বড় ধরনের শাস্তি না দিয়ে কারখানা চালুর অনুমতি দিলেন?

উত্তরাঞ্চলের চিত্র : নাটোরের বড়াইগ্রামে অবস্থিত সামির টোব্যাকো কারখানায় গত বছর অভিযান চালায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। প্রায় ৯ কোটি টাকার অবৈধ মালপত্র জব্দ করা হলেও ওই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। নিয়মমতো অভিযানের পর এনবিআরের উচিত ছিল ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগে মামলা করা। কিন্তু সিআইডির এত বড় অভিযানের পরও রাজশাহী কাস্টমস এক্সাইজ এবং ভ্যাট কমিশনারেট থেকে কোনো ধরনের তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি। এ ব্যাপারে নাটোরের রাজস্ব কর্মকর্তাকে ফোন করা হলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি। ২০১৯ সালের এপ্রিল মাস থেকে সামির টোব্যাকো কোষাগারে রাজস্ব জমা দিয়ে আসছে। অথচ মজার ব্যাপার হলো, প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু করে পরবর্তী ১৭ মাস কোনো ট্যাক্স স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল সংগ্রহই করেনি। প্রশ্ন হচ্ছে, যে ট্যাক্স স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোলের মাধ্যমে রাজস্ব জমা দেওয়া হয় সেই ট্যাক্স স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোলই যদি সংগ্রহ না করে তারা, তাহলে কীভাবে রাজস্ব জমা দেয়? তাই প্রশ্ন থেকেই যায়- রাজস্ব কর্মকর্তারা কি এ ব্যাপারে কিছু জানেন না!

ঢাকার আশপাশের চিত্র : সরেজমিনে দেখা যায়, নরসিংদীতে অবস্থিত মেঘনা টোব্যাকোতে একাধিকবার অভিযান চালানো সত্ত্বেও থেমে নেই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম। আশপাশের বাজার সয়লাব তাদের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেটে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত ১৪ মাস ধরে ট্যাক্স স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল সংগ্রহ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। অথচ রাজস্ব ঠিকই জমা দিয়ে যাচ্ছে। এনবিআরের আইন বলে প্রতি মাসের ট্যাক্স স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল সংগ্রহ করতে হলে সংশ্নিষ্ট কমিশনারেট থেকে অনুমোদন নিতে হয়। তাদের কমিশনারেট কি তাহলে এসব কিছুই দেখছে না। কত ট্যাক্স স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল নিল আর কত রাজস্ব জমা দিল, তার একটা সমন্বয় করা উচিত।

গত বছর ডিসেম্বরে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে হেরিটেজ টোব্যাকো নামে একটি কারখানায় অভিযান চালায় র‌্যাব। অভিযানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নকল এক লাখ ৪০ হাজার শলাকা সিগারেট ও ছয় লাখ ৭৫ হাজার টাকার নকল ব্যান্ডরোল জব্দ করা হয়। অথচ থামানো যায়নি কারখানাটির চাকা। ডিসেম্বরে অভিযান হলেও এনবিআরে জমা পড়ছে হেরিটেজ টোব্যাকোর রাজস্ব। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিয়মিত রাজস্ব দিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। অথচ ওই ১৪ মাসে প্রতিষ্ঠানটি স্ট্যাম্প সংগ্রহ করেছে মাত্র দু'বার!

কারখানাগুলোর প্রতিটিই তাদের কমিশনারেটদের কাছে রাজস্ব জমা দিচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে- এই কমিশনারেটরা কি কখনও তাদের ব্যাপারে কোনো রাজস্ব ফাঁকির অনুসন্ধান করেছে। কখনও কি তারা সমন্বয় করেছে কত ট্যাক্স স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল উত্তোলনের বিনিময়ে কত রাজস্ব জমা পড়েছে? অথচ আইন অনুযায়ী এনবিআরেরই খবর রাখার কথা সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজস্ব জমা দেওয়ার চিত্র। দোকান ঘুরলে দেখা যায়, নানা রকম সিগারেটের ব্র্যান্ডে সয়লাব হয়ে আছে বাজার। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিক কত টাকার রাজস্ব দিচ্ছে এবং কত ফাঁকি দিচ্ছে তার কোনো হিসাব নেই।

অভিযান হলেও আবার অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলো অবৈধভাবেই উৎপাদন শুরু করে। এ বিষয়ে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) পরিচালক (অপারেশন) কর্নেল সাফিউল্লাহ বুলবুল সমকালকে বলেন, অবৈধ সিগারেটের বিরুদ্ধে কোনো তথ্য পাওয়া গেলেই অভিযান চালায় র‌্যাব। গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে অবৈধ সিগারেট কেনাবেচায় যারা জড়িত তাদের শনাক্ত করা হচ্ছে। রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে সিগারেট বিক্রি হলে তা দেশের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)