আগস্ট থেকে সরকারি পাটকল বন্ধ

সেপ্টেম্বরে এক চেকে সব পাওনা পাবেন শ্রমিকরা

২৯ জুন ২০২০

আবু হেনা মুহিব

আগামী সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই সব পাওনা পাবেন পাটকল শ্রমিকরা। এক চেকেই তাদের সমুদয় অর্থ পরিশোধ করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। এই করোনাকালে বিদায়ী শ্রমিকদের যাতে অর্থকষ্ট না হয় সে বিবেচনা থেকে সব অর্থ এক চেকেই পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

কর্মকর্তারা এ নির্দেশনা অনুযায়ীই প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে একটি কমিটি গঠন করা হচ্ছে। পাটকল অধ্যুষিত এলাকার জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গঠন করা হবে এই কমিটি। নেতৃত্ব দেবেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মুন্নজান সুফিয়ান।

১ আগস্টে বন্ধ হচ্ছে সরকারি সব পাটকল। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে (পিপিপি) ছয় মাসের মধ্যেই অবশ্য সব পাটকল আবার উৎপাদনে ফিরে আসবে। এদিকে করোনার এই সংকটকালে মানবিক কারণে পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা। বন্ধের সিদ্ধান্তে সরকার অটল থাকলে বৃহত্তর আন্দোলনের কথা চিন্তা করছেন তারা। গতকাল রোববার ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা অঞ্চলের পাটকল এলাকায় সমাবেশও করেছেন শ্রমিকরা।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মুন্নজান সুফিয়ান। এ সময় শ্রমিকদের বিষয়ে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শ্রমিকদের যাতে কোনো অসুবিধা না হয় সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন তিনি। যেভাবেই হোক আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে স্থায়ী-অস্থায়ী সব শ্রমিকের পেনশন ও বকেয়াসহ সব অর্থ এক চেকের মাধ্যমেই পরিশোধের নির্দেশনা দেন তিনি।

এর আগে আগামী তিন বছরের মধ্যে কয়েক কিস্তিতে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ছিল প্রথম বছর ৪০ শতাংশ এবং পরবর্তী দুই বছর ৩০ শতাংশ হারে পাওনা পরিশোধ করে শ্রমিকদের বিদায় দেওয়ার। এ জন্য প্রয়োজন হবে চার হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা। সরকারি ২৫ পাটকলে বর্তমানে ২৬ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী আছেন। প্রতি মাসে বেতন পরিশোধে খরচ হয় ১২০ কোটি টাকা।

গত ৪৮ বছরে মাত্র চার বছর মুনাফার মুখ দেখেছে সরকারি পাটকলগুলো। বাকি ৪৪ বছরই লোকসান গুনতে হয়েছে। সরকারি পাটকলগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিজেএমসি থেকে পাওয়া তথ্য মতে, এ বাবদ ক্ষতি গুনতে হয়েছে ১০ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। শুধু ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দুই হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা। পেনশনসহ শ্রমিকদের বকেয়ার পরিমাণ এক হাজার ৩০ কোটি টাকা। পাট কেনা, পরিষেবা, ব্যাংক ঋণ এবং সরকারের কাছে ঋণ মিলিয়ে দেনার পরিমাণ এক হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা।

ক্রমাগত ক্ষতির কারণেই বন্ধের সিদ্ধান্ত : ক্রমাগত লোকসানের কারণেই সরকারি পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী। গতকাল এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছেন, বিজেএমসির ক্রমবর্ধমান লোকসানের কারণে শ্রমিকদের গোল্ডেন হ্যান্ডশেক প্রক্রিয়ায় অবসায়নের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। গত ১০ বছরে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে সরকারকে। এই লোকসানের বোঝা আর বয়ে বেড়ানো সম্ভব নয়। কারণ এই টাকা সাধারণ জনগণের।

লোকসানের কারণ প্রসঙ্গে গোলাম দস্তগীর গাজী বলেন, সরকারি পাটকলে মজুরি ব্যয় বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। মজুরি কমিশন ২০১৫ বাস্তবায়নের পর মজুরি নিয়ে এ অবস্থা দাঁড়িয়েছে। সরকারি পাটকলে ইউনিট প্রতি উৎপাদন খরচে মজুরির অংশ ৬৩ শতাংশ। এ কারণে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয় সরকারি পাটকল। মন্ত্রী বলেন, পিপিপির মাধ্যমে আগামী ৪ থেকে ৬ মাসের মধ্যে নতুন করে পাটকলগুলো উৎপাদনে নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সে অনুযায়ী নতুন ব্যবস্থাপনায় দেশি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিকায়ন করা হবে পাটকলগুলো। এতে পুরোনো শ্রমিকরাই অগ্রাধিকার পাবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী উৎপাদনে ফিরলে শ্রমিকের চাহিদা অন্তত তিনগুণ বাড়বে।

পুরোনো সমস্যাকে করোনার এই সংকটকালে সমাধানের চেষ্টা কেন? এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, গত ছয় মাস ধরেই এই প্রক্রিয়া চলছে। করোনার এই সংকটে হাতে অর্থ এলে শ্রমিকদের বরং সুবিধাই হবে। আদমজী পাটকল বন্ধের সমালোচনা করে এখন সব পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো? এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে গোলাম দস্তগীর বলেন, আদমজী বন্ধ করে দিয়ে সেখানে পাটকল করা হয়নি। পক্ষান্তরে এখন সব পাটকলেই নতুন ব্যবস্থাপনায় পাটপণ্য উৎপাদনের শর্ত থাকছে। অর্থাৎ পাটশিল্প বন্ধ হচ্ছে না। বরং আরও বেগবান হবে।

পাট সচিব লোকমান হোসেন মিয়াসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন। খুলনা থেকে র‌্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অনলাইন ব্রিফিংয়ে যুক্ত ছিলেন।

সরকার সিদ্ধান্ত না পাল্টালে আন্দোলন : গতকাল শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের নেতারা। ঐতিহ্যবাহী পাটশিল্পকে একচেটিয়াভাবে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়ে ধ্বংস না করার জন্য অনুরোধ জানান তারা। প্রতিমন্ত্রী শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন। তবে কোনো আশার কথা শোনাননি। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আজ মঙ্গলবার কয়েকজন শ্রমিক নেতার সঙ্গে এ বিষয়ে আবারও বৈঠকে বসবেন তিনি। শ্রমিকদের জন্য সরকারের এই সিদ্ধান্ত যে লাভজনক, তাদের তা বোঝানোর চেষ্টা করা হবে।

এ প্রসঙ্গে শ্রমিক নেতা শহিদুল্লাহ চৌধুরী গতকাল সমকালকে বলেন, তারা প্রতিমন্ত্রীর কাছে দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন। কীভাবে পাটশিল্পের লাভজনক বিকাশ সম্ভব, সে বিষয়ে আরও ছয় মাস আগেই একটি সংস্কার পরিকল্পনা দিয়েছেন তারা। সে পরিকল্পনার আলোকে বিষয়টি আবার চিন্তা করার অনুরোধ জানিয়েছেন তারা। তবে সরকার শেষ পর্যন্ত নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকলে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেওয়া ছাড়া আর কোন পথ খোলা থাকবে না বলে জানান তিনি।













© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)