সমাজ

'বেগম' রোকেয়া নিয়ে আক্ষেপ ও উদ্যোগ

৩০ জুন ২০২০ | আপডেট: ৩০ জুন ২০২০

শাহ নিসতার জাহান

অনুমান করছি, লেখাটির শিরোনাম নিয়েই অনেকের আপত্তি থাকবে। রোকেয়ার নামের সামনে 'বেগম' ব্যবহার করেছি বলে। কারণ উপমহাদেশে তিনি এ-নামেই পরিচিত। তার নামে 'বেগম' থাকা উচিত কিনা, সে বিতর্ক অনেক পরের। বিভিন্নজনকে চিঠি লিখতে গিয়ে তিনি কখনও কখনও মিসেস আর, এস, হোসেন লিখেছেন। সেক্ষেত্রে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন কিংবা ছোট করে বেগম রোকেয়া হয়তো বলা যেতে পারে। অবশ্য তিনি কখনও কখনও শুধুই 'আর এস হোসেন' লিখতেন। পরিবারের দেওয়া নাম রোকেয়া খাতুন। আর রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন কিংবা বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন তার বহুল প্রচলিত ও পরিচিত নাম। দুটি নামেই তার আপত্তি ছিল বলে মনে হয় না।

বেগম রোকেয়াকে নিয়ে আমাদের দেশের গবেষকদের খুব উৎসাহ কখনও দেখা যায়নি। এজন্যই সম্ভবত নারী দিবস উপলক্ষে তার দু-একটি ছবি ঢাকার রাস্তার দু-একটি মোড়ে দেখা যায়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বেগম রোকেয়া বিষয়ে উচ্চবাচ্য নেই। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাকে নিয়ে গভীর পড়াশোনা ও গবেষণা হওয়া উচিত ছিল। বিশেষত জেন্ডার স্ট্যাডিজ, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, বাংলা ইত্যাদি বিভাগের জন্য তার জীবন, সংগ্রাম, কর্ম হতে পারত অনন্য সম্পদ। কিন্তু তা হয়নি। এখন সাধারণত প্রাথমিক শ্রেণিগুলোর পাঠ্যবইয়ে তাকে যেভাবে তুলে ধরা হয়, তা চর্বিত-চর্বণ, ভাসা-ভাসা। অথচ উপমহাদেশের মানুষের নজর খুলে দেওয়ার জন্য মানুষটি তার জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন।

বেগম রোকেয়ার বাড়িতে বাংলা চর্চার উপায় ছিল না। উর্দু, ফারসিকেই প্রাধান্য দেওয়া হতো। অফিসে তার প্রতিদিনকার কাজকর্মও হতো উর্দুতে, চারদিকের মানুষগুলোর ভাষাও উর্দু (মতিচুর, দ্বিতীয় খণ্ড, উৎসর্গ পত্র ; ১৯০৪)। এই প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি লিখেছেন বাংলায়। ইংরেজিতেও লিখেছেন। এ রকম স্পর্ধা তখন কি আর কেউ দেখিয়েছিলেন? অন্তত তার মতো করে, বাংলাকে ভালোবেসে, বাংলার মানুষের সামাজিক সীমাবদ্ধতা ও জটিলতা নিয়ে বাংলার মানুষ ও বিশ্ববাসীকে সজাগ করতে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় লিখেছেন। 'ভদ্রলোকরা' তখন সমাজে যে অচলায়তন তৈরি করেছিলেন, তাকে ভেঙে দেওয়ার জন্য রোকেয়াই তো এগিয়ে এসেছিলেন। বিশেষত মেয়েদের দুর্দশা নিয়ে সোচ্চার তার যুগে তার মতো আমরা কাউকে পাইনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বোন স্বর্ণকুমারীকে নিয়ে এক আলোচনায় শিবনারায়ণ রায় আমাদের জানান, নারীকে নিয়ে রোকেয়ার মতো বিপ্লবী স্বর্ণকুমারী ছিলেন না (বাংলার রেনেসাঁস, নারী জাগরণ ও স্বর্ণকুমারী, দেশ, আগস্ট ৮, ১৯৯৮)।

রোকেয়াকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও আমরা হীনম্মন্যতার পরিচয় দিই। মুসলিম নারী, বিশেষত বাঙালি মুসলিম নারী শিক্ষায় তার অবদান বা এই জাতীয় কথাবার্তা দিয়ে তাকে পরিচয় করিয়ে দিই সবার সামনে। তার অবদানকে 'নারী শিক্ষা'র সঙ্গে জুড়ে দেওয়া যেত, তাতে বরং তার প্রতি কিছুটা সুবিচার হতো। কিন্তু আসলেই কি তিনি কেবল নারী শিক্ষায় এগিয়ে এসেছিলেন? আর কাউকেই কি তিনি শিক্ষিত করেননি? যে-সমাজে একটি মেয়ের পড়াশোনা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে নিরুৎসাহিত করা হতো, এমনকি ভাবা হতো নিন্দনীয়, সে-সমাজটাকেই তো বেগম রোকেয়া বদলে দিয়েছিলেন। চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন সমাজপতিদের প্রচলিত অচলায়তন।

বস্তুত বেগম রোকেয়া শিক্ষিত করেছেন গোটা সমাজকে। তার সে-শিক্ষা নারী-পুরুষ সবার জন্য সমান প্রযোজ্য ছিল। বিষয়টি আমরা বেমালুম ভুলে যাই। তার সংগ্রাম, শিক্ষা এবং অবদানকে খাটো করে দেখি। খুঁজে দেখি না মূল ঘটনা কিংবা আসল পরিবর্তন। তার অবদান কোনোক্রমেই 'মুসলিম নারী জাগরণ' কিংবা কেবলই 'নারী শিক্ষা' বা জাগরণে নয়। তার অবদান সমাজ বদলের আন্দোলনে; সমাজ বদলে দেওয়ার শিক্ষায়।

আমাদের দুর্ভাগ্য, বেগম রোকেয়াকে নিয়ে তেমন কোনো লেখা বা গবেষণা আমরা পাইনি। তার দুর্ভাগ্য, তিনি বাংলাদেশে জন্মেছিলেন, যেখানে গবেষণার নামে প্রায়ই ধানাই-পানাই হয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই বিশেষ কোনো স্বার্থ ছাড়া কেউ গবেষণা করেন না এবং করেননি। তার জীবন সংগ্রাম, তার অবদান (সামাজিক ও সাহিত্যিক) ইত্যাদি বিষয়ে কোনো গবেষণাই হয়নি বাংলাদেশে।

হ্যাঁ, রোকেয়ার নামে ১৯৬৪ সালের নভেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি হল এবং ২০০৯ সালে রংপুরে একটি বিশ্ববিদ্যালয়- এই হলো তার প্রতি আমাদের সম্মান। রংপুরে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন না হলে, এ-নামটি কোথাও আসত কি? মনে হয় না! ভাগ্য ভালো যে রংপুরে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি হয়েছে এবং বেগম রোকেয়ার ওপর মোটামুটি আমাদের দায়িত্ব শেষ করে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারছি।

জাতীয় জাদুঘরে বেগম রোকেয়ার সম্মানে একটি কর্নার করার কথা ছিল। বুদ্ধিজীবীদের নানা প্রজাতির রাজনৈতিক বুদ্ধিবৃত্তির শক্তিতে এই উদ্যোগ এত কঠোরভাবে বন্ধ করা গেল, যা কেবল বাংলাদেশেই সম্ভব। এ-উদ্যোগ ভবিষ্যতে মাথা তুলে দাঁড়াবে তেমন সম্ভাবনাও দেখছি না। মুশকিল হলো, বেগম রোকেয়ার হয়ে কেউ শক্ত কণ্ঠে বলবেন, সেই মানুষ নেই। ফলে, বেগম রোকেয়া-সংশ্নিষ্ট বহু মূল্যবান দলিল নিয়ে আমারা নয়ছয় করতেও ছাড়িনি।

বেগম রোকেয়ার পূর্ণাঙ্গ রচনা 'রোকেয়া রচনাবলী' ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত হয়। বাংলা একাডেমি প্রকাশক, কবি আবদুল কাদির সম্পাদনা করেছিলেন। তারও আগে রোকেয়ার চাচাতো বোনের মেয়ে মোশফেকা মাহমুদ প্রকাশ করেছিলেন বেগম রোকেয়ার চিঠিপত্র, ১৯৬৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। মূল্যবান এই দলিলের মূল কপি আজ যে কোথায় আল্লাহ মালুম! মোশফেকা মাহমুদের শাশুড়ি সামসুন্নাহার মাহমুদ 'রোকেয়া জীবনী' প্রকাশ করেন ১৯৫৭ সালের অক্টোবর মাসে। এর পরে বিভিন্নজনের লেখায় রোকেয়া সম্পর্কে যা পাওয়া যায়, তার প্রায় সবই সামসুন্নাহার মাহমুদের লেখা থেকে নেওয়া। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নতুন কিছুই সংযোজন নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একাধিকবার মুখস্ত কবিতার মতো কিছু বুলি আওড়ানো- যা সকলেই জ্ঞাত, পূর্ব বর্ণিত বাহুল্য শব্দমালা। যাকে ইংরেজিতে 'নয়েজ' বললে বুঝতে সহজ হয়। আমাদের সবার জন্য দুর্ভাগ্য এটি।

লেখাটি শেষ করতে চাই পাঠককে একটি অনুরোধ জানিয়ে। সামসুন্নাহার মাহমুদ, মোশফেকা মাহমুদ এবং বেগম রোকেয়ার কোনো নথি কোনো পাঠকের কাছে আছে কি? কিংবা কেউ কি তার কোনো নথির সন্ধান দিতে পারেন? এই ই-মেইলে : ধহহড়থফযধৎধ@ুধযড়ড়.পড়স। খুব উপকৃত হবো!

শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)