সঞ্চয় ভাঙার আগে যেসব ভাবনা জরুরি

০৯ জুলাই ২০২০ | আপডেট: ০৯ জুলাই ২০২০

জাহিরুল ইসলাম

এটা অনেকেরই জানা, এক সময় মানুষ সঞ্চয়ের জন্য মাটির ব্যাংক, টিনের কৌটা কিংবা এ জাতীয় বস্তু ব্যবহার করলেও বিশেষত মধ্যবিত্ত পরিবারে এখন এ চর্চায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। সে স্থান দখল করেছে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।

এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় শাখায় ডিপোজিট পেনশন স্কিম (ডিপিএস) নেই, এমন মধ্যবিত্ত পরিবার পাওয়া ভার। জনসাধারণকে আর্থিক খাতে অন্তর্ভুক্ত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানা উদ্যোগ চলমান। এ কারণে নিম্ন আয়ের মানুষও এখন অভ্যস্ত হচ্ছেন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সঞ্চয়ে। ডিপিএসের পাশাপাশি অনেকের আগ্রহ লক্ষ্য করা যায় মেয়াদি আমানতে। মোটামুটি অঙ্কের টাকা মেয়াদি আমানত হিসেবে রেখে নির্দিষ্ট সময় পর মুনাফা উত্তোলন করে সংসারের আর্থিক চাহিদা মেটানোর উদাহরণ এখন মেলে অহরহ।

আর প্রতিষ্ঠানগুলোও মানুষকে এ কাজে উৎসাহ জুগিয়ে থাকে অনেকেটা নিজেদের প্রয়োজনেই। কারণ, এটা তাদের কাছে রক্তের মতো। এর প্রবাহ স্বাভাবিক না থাকলে আর্থিক খাতের যে কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা দুরূহ হয়ে পড়ে। এজন্য প্রতিষ্ঠানগুলো জনসাধারণকে সঞ্চয়ে উৎসাহ জুগিয়ে নতুন ও দীর্ঘ মেয়াদি আমানত আহরণের লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট থাকে।

করোনা মহামারি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ায় চাকুরিচ্যুত হয়ে কিংবা বেতন কমে যাওয়ার কারণে এখন সঞ্চয় ভাঙতে শুরু করেছেন অনেকে। দেশের ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় দেখা যাচ্ছে সঞ্চয় নগদায়নের দীর্ঘ লাইন। এ নিয়ে প্রতিবেদন বেশ কিছুদিন ধরেই প্রকাশ হচ্ছে সংবাদমাধ্যমে। এপ্রিল ও মে মাসে ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্থবির থাকায় বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কিছুটা কমে এসেছে। এ কারণে সঞ্চয় নগদায়নের প্রভাব তারল্যে সেভাবে টের পাওয়া যায়নি। তবে ব্যবসার পরিস্থিতি স্বাভাবিক এবং ঋণ চাহিদা বেড়ে ওঠার সঙ্গে এ সংকট যে ক্রমেই স্পষ্ট হবে, তা সহজেই অনুমেয়। মানুষ সাধারণত সঞ্চয় করে ভবিষ্যতের সংকট মোকাবেলার জন্য। প্রয়োজনে তারা সঞ্চয় ভাঙবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমান সময়ে যারা সঞ্চয় ভাঙছেন, সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার আগে তাদের কিছু বিষয় ভাবা দরকার।

মনে রাখা প্রয়োজন, বিশেষত মধ্যবিত্ত পরিবারে সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ থেকে টাকা বাঁচিয়ে মোটামুটি অঙ্কের অর্থ সঞ্চয় করতে সময় লাগে অনেক। বাস্তবতা হলো, মধ্যবিত্ত পরিবারের কোনো সদস্যের ডিপোজিট পেনশন স্কিম কিংবা মেয়াদি আমানতের পেছনে থাকে নানা গল্প। সেটা ত্যাগের এবং ধৈর্য্যের। আর আমানতের মেয়াদ পূর্তি ঘিরে যে কিছু স্বপ্ন থাকে, তা বলাই বাহুল্য। এমন কষ্টে সঞ্চিত কোনো স্কিম বা মেয়াদি আমানত নগদায়নের আগে এ প্রশ্ন নিজেকে অবশ্যই করা দরকার যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সঞ্চয় ভাঙার পরিবর্তে বিকল্প কোনো অপশন আছে কী? কোনো সুযোগ কি আছে যেটা কাজে লাগিয়ে সঞ্চয় না ভেঙেই এ সময়ের আর্থিক চাহিদা মেটানো সম্ভব? যদি থাকে তাহলে, সঞ্চয় না ভেঙে বিকল্প বেছে নেওয়াই মঙ্গল। এও মনে রাখা দরকার, সঞ্চয় ভেঙে ফেলা যত সহজ, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন সঞ্চয়ের মাধ্যমে আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা খুবই কঠিন।

দেখা যাচ্ছে, তরল টাকার দরকার আরও পড়ে থাকলেও নিতান্তই আতঙ্কিত হয়ে সঞ্চয় ভাঙছেন অনেকে। এজন্য সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার আগে বিবেচনা করা প্রয়োজন, সঞ্চয় নগদায়ন কি এখনই করা জরুরি? উল্লেখ্য, ডিপিএস কিং মেয়াদি আমানত হিসাব মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে নগদায়ন করা হলে প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত মুনাফা দেয় না। কিছু ক্ষেত্রে দিলেও তা দেওয়া হয়ে থাকে সঞ্চয়ী হিসাবের হারে। বেশ কিছু দিন ধরেই দেশের আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো সঞ্চয়ী হিসাবে মুনাফা দিচ্ছে মূল্যস্ফীতির গড় হারের নিচে। এতে আমানতকারীর হিসাবে কিছু টাকা যোগ হলেও মূল্যস্ফীতি ও টাকার ক্রয় ক্ষমতা বিবেচনায় কিন্তু আমানতকারীর কোনো লাভ হয় না।

এও দেখা যাচ্ছে, প্রয়োজন না থাকলেও ডিপিএস বা মেয়াদি আমানত ভেঙে সঞ্চয়ের পুরোটাকাই নগদ উত্তোলন করছেন অনেকে। বলা বাহুল্য, তরল টাকা মানুষের হাতে সাধারণত থাকে না। এর একটি অংশ প্রয়োজনীয় কাজে খরচ হলেও অন্য অংশে ব্যয় হয় অপ্রয়োজনে। দীর্ঘ দিনের ত্যাগ ও প্রচেষ্টায় জমানো টাকা এই সংকটকালে অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। এজন্য কোনো কারণে সঞ্চয় নগদায়ন করা প্রয়োজন হলেও যে পরিমাণ টাকা নগদ প্রয়োজন, উত্তোলন করা উচিত সেটুকুই।

এখন মেয়াদি আমানত বা ডিপিএস নগদায়নের আগে এ প্রশ্ন নিজেকে অবশ্যই করা দরকার, এ টাকা দিয়ে আপনি কী করবেন? মৌলিক কোনো চাহিদা পূরণ করবেন নাকি অন্য কিছু? খাবার, কাপড়, চিকিৎসা, বাসস্থান কিংবা শিক্ষার মতো জরুরি চাহিদা মেটানোর জন্যে হলে, কোনো কথা নেই। কিন্তু এর বাইরে অন্য কিছু হলে এ জিজ্ঞাসা নিজেকে পুনরায় করা দরকার যে, পণ্যটি কি এখনই কেনা জরুরি? যদি অতটা জরুরি না হয়, তাহলে তা কেনার জন্য সঞ্চয় না ভাঙাই ভালো। কারণ, করোনা মহামারী এবং এ কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, সেটা কেউ নিশ্চিত বলতে পারছে না। পরিস্থিতি যদি আরও খারাপ হয়, তাহলে সে সময় কিন্তু নগদ টাকার প্রয়োজন আরও বাড়বে। এজন্য বর্তমান কেনাকাটার আগে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তাগুলো বিবেচনায় রাখা জরুরি।

এপ্রিল মাস থেকে সব ধরণের ঋণে মুনাফার হার নয় শতাংশ কার্যকর করার সিদ্ধান্ত দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সব প্রতিষ্ঠান এ সিদ্ধান্ত পুরোপুরি কার্যকর করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। যেসব প্রতিষ্ঠান সিদ্ধান্ত্মটি কার্যকর করেছে, তারা আমানতের বিপরীতে মুনাফার হারও স্বভাবতই কমিয়ে দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে, বর্তমান প্রতিষ্ঠানে প্রত্যাশিত মুনাফা না পাওয়ায় আমানত উত্তোলন করে অন্য প্রতিষ্ঠানে নেওয়ার উদাহরণ ক্রমে বাড়ছে। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, এমন সিদ্ধান্ত কি সুবিবেচিত? 

কারণ, যেসব প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট রেটিং মান কম, তারা সঞ্চয় আকর্ষণের জন্য অপেক্ষাকৃত বেশি মুনাফা দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার, করোনা মহামারীর কারণে বিভিন্ন খাতের ব্যবসা স্থবির হয়ে পড়েছে। ঋণের টাকা ফেরত দিতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। বিনিয়োগ খেলাপি হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোরও ঝুঁকি বেড়েছে। চাহিদামতো সময়ে আমানতকারীর অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা সব প্রতিষ্ঠানের সমান নয়। খেলাপি ঋণ বাড়লে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বাস্থ্য খারাপ হয় এবং সামগ্রিকভাবে তার ঝুঁকিও বেড়ে ওঠে। এজন্য উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, সঞ্চয় নগদায়ন করে যে প্রতিষ্ঠানে রাখবেন, তার ক্রেডিট রেটিং আগের প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ভালো কিনা। যদি না হয়, তাহলে মুনাফার হার অপেক্ষাকৃত কম হলেও বর্তমান প্রতিষ্ঠানে সঞ্চয় রাখাই মঙ্গল। বাড়তি মুনাফার আশায় পুরো পুঁজিকে ঝুঁকিতে ফেলা সুবিবেচনার পরিচায়ক নয়। ডিপিএস কিংবা মেয়াদি আমানত হিসাবের মেয়াদ পূর্তির পরও চাহিদামতো সময়ে টাকা ফেরত দিতে না পারার উদাহরণ দেশে বিরল নয়। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হওয়ার কারণে ভবিষ্যতে এমন উদহারণ বাড়লেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

এখন সঞ্চয় ভেঙে স্থাবর সম্পদ কেনার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে অনেকের মধ্যে। মন্দার সময় সম্পদ পাওয়া যায় অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে।বাস্তবতা হলো, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি শতথ হয়ে যাওয়ার কারণে এ সময়ে সম্পদের রিটার্নও কমে যায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি, সঞ্চয় ভেঙে যে সম্পদ কেনা হচ্ছে তা থেকে মুনাফা পাওয়ার জন্য কত সময় অপেক্ষা করতে হবে? যে মুনাফা পাওয়া যাবে তা কি বর্তমানের চেয়ে বেশি? মুনাফা পাওয়ার জন্য যদি দীর্ঘ অপেক্ষার প্রয়োজন পড়ে এবং সম্ভাব্য মুনাফার হার বর্তমানের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি না হয়, সেক্ষেত্রও সিদ্ধান্ত নিতে হবে ভেবে চিন্তে। কারণ, সম্পদ কেনাই হয় সেখান থেকে মুনাফা পাওয়ার জন্য। প্রত্যাশিত মুনাফা পাওয়া না গেলে এবং সংকটকালে তা কাজে না লাগানোর ব্যাপারে অনিশ্চয়তা থাকলে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সঞ্চয় না ভাঙাই উত্তম।

মনে রাখা দরকার, সঞ্চয় কমে গেলে ব্যক্তির সামর্থ হ্রাস পায়। অর্থনৈতিক সংকটকালে মানুষের মনে বিরাজ করে নানামুখী দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ। এ অবস্থায় শুধু অর্থনৈতিক নয়, জীবনের অন্যান্য সমস্যাগুলো জটিল থেকে জটিলতর হতে থাকে। অনেকে বলছেন, করোনা-পরবর্তী যে অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে, সেটা মূলত শুরু হবে মানুষের সঞ্চয় শেষ হওয়ার পর। এ অবস্থায় সঞ্চয় না ভেঙে আসন্ন সংকটকে নিজেদের জীবনে যত বিলম্বিত করা যায় ততই মঙ্গল।

লেখক ব্যাংক কর্মকর্তা

zahirul.du@gmail.com

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)