‘ওয়ান ল্যাপটপ ওয়ান স্টুডেন্ট’ কর্মসূচি স্বাগত

২১ জুলাই ২০২০ | আপডেট: ২১ জুলাই ২০২০

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার

জুলাই মাস থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইনে ক্লাস চলছে পুরোদমে। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বৃহৎ অংশ হচ্ছে গ্রামাঞ্চলের মেধাবী শিক্ষার্থী এবং সেখানে অনেকেরই নেই কোন ল্যাপটপ কিংবা স্মার্ট ডিভাইস, নেই দ্রুতগতির ইন্টারনেট। এমতাবস্থায় সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাওয়ার জন্য একজন শিক্ষার্থীর জন্য একটি ল্যাপটপ কর্মসূচি চালুর কথা ভাবছে সরকার। উল্লেখ্য, `গ্রাম হবে শহর’ এই কর্মসূচির আওতায় গ্রাম এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবস্থা চালু থাকলেও তা অনলাইন ক্লাস করার মত পর্যাপ্ত গতি পাওয়া দুষ্কর। তাই ঘরে বসেই সাশ্রয়ী মূল্যে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সুবিধা যাতে পেতে পারে, সেজন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়।

বলা বাহুল্য, ২০১৮ সালের ২৮ অগাস্ট, প্রত্যন্ত গ্রামে ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছে দিতে ইডিসি (স্ট্যাবলিশিং ডিজিটাল কানেকটিভিটি) প্রকল্প নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় চীনের সাথে। `ওয়ান স্টুডেন্ট ওয়ান ল্যাপটপ’ প্রকল্প বাস্তবায়নে সেই ইডিসি চুক্তি এবার হাতে নেওয়া হচ্ছেl পরিকল্পনা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ৪০ লাখের বেশি শিক্ষার্থীকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। নিঃসন্দেহে এটি একটি খুবই প্রশংসনীয় এবং ইতিবাচক সিদ্ধান্ত যা জাতির কল্যাণে অনেক সুফল বয়ে আনবে ভবিষ্যতে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪ কোটি তরুণকে আইসিটির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যাবে- যারা হবে ভবিষ্যত বাংলাদেশ গড়ার সৈনিক।

ল্যাপটপ বিতরণের কর্মসূচি বিচ্ছিন্নভাবে দেশে আগেও লক্ষ করা গেছেl ২০০৫ সালের কথাl দেশে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করে এমন তিনটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বব্যাংক ১শ’ টি কম্পিউটার ও ল্যাপটপ অনুদান হিসেবে হস্তান্তর করেন। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে আন্ডারপ্রিভি লাইলজ চিল্ড্রেন এডুকেশন প্রোগ্রাম (ইউসিইপি), গেন্ডারিয়া কিশলয় কচি-কাঁচার মেলা এবং কপারস কৃষ্টি হাইস্কুল। ২০১৫ সালের ১৮ মে,  জাতিসংঘের সাউথ সাউথ এডুকেশন ফাউন্ডেশন থেকে ৫০টি ল্যাপটপ অনুদান হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেন। এর আগে ৩ মে, ২০১৫ সালে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ‘ওয়ান স্টুডেন্ট ওয়ান ল্যাপটপ’ প্রকল্পের আওতায় এক্সিম ব্যাংকের সহায়তায় বিনামূল্যে ৫শ’ ল্যাপটপ বিতরণ করা হয়।  তন্মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২শ’ জন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ২শ’ জন এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১শ’ জন শিক্ষার্থীকে এই ল্যাপটপ দেওয়া হয়। একই বছর (২০১৫ সাল) এক্সিম ব্যাংকের সহযোগিতায় ‘ওয়ান ল্যাপটপ ওয়ান ড্রিম’ প্রকল্পের আওতায় দেশের ৬৪ জেলার ৮৫ জন শিশু ও কিশোর সাংবাদিককে ল্যাপটপ প্রদান করেন। কিশোর সাংবাদিকদের লেখনির প্রতি উৎসাহিত করতেই ছিল এই মহতী উদ্যোগ।

২০১৮ সালের নভেম্বরে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ‘লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং’ প্রকল্প ও সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ও ভাষা প্রশিক্ষণ ল্যাব স্থাপন প্রকল্পের আওতায় দেশের ১৩শ’ প্রশিক্ষণার্থীর হাতে একটি করে ল্যাপটপ তুলে দেন। একই সময়ে এক্সিম ব্যাংকের সহযোগিতায় ‘ওয়ান স্টুডেন্ট, ওয়ান ল্যাপটপ, ওয়ান ড্রিম’ কর্মসূচির আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত মেধাবী দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে ল্যাপটপ বিতরণ করেন। গত ১০ মার্চ ২০২০, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী এক শিক্ষার্থীকে ল্যাপটপ কেনার জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছেন সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) পঙ্কজ বড়ুয়া। এ মাসের প্রথম সপ্তাহে (জুলাই ২০২০) রোটারি ক্লাব অব ঢাকা কারওয়ান বাজার ও রোটারি ক্লাব অব পদ্মা রাজশাহীর উদ্যোগে আটজন দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীকে অনলাইনে লেখাপড়া করার জন্য একটি ল্যাপটপ ও সাতটি স্মার্টফোন দিয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে ৪৫ জন শিক্ষার্থীকে এ সেবার আওতায় আনা হবে। জনসংখ্যার বিবেচনায় এ ধরনের উদ্যোগ ক্ষুদ্র হলেও দারিদ্র বিমোচন এবং ডিজিটাল ডিভাইড দূরীকরণে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছেl

২০০৫ সালে তিউনিসে জাতিসংঘ তথ্য সম্মেলনে উন্নয়নশীল বিশ্বের (আফ্রিকা এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকা) দরিদ্র শিশুদের জন্য ১শ’ ডলারের ল্যাপটপ কম্পিউটার বিতরনের ঘোষণা করেছিলেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির প্রতিষ্ঠাতা এবং ‘ওয়ান ল্যাপটপ পার চাইল্ড’ (ওএলপিসি) নামে একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার প্রফেসর নিকোলাস নেগ্রোপন্টে। পরবর্তীতে ল্যাপটপের উচ্চমূল্য এবং দরিদ্র দেশ সমুহে বিদ্যুতের সমস্যার কথা চিন্তা করে ইউনিসেফ ওই প্রকল্প হাতে নেয় এবং ২০০৭ এর মাঝামাঝি এটি পুরোদমে উৎপাদন শুরু করেl সেই সময় ১শ’ ডলারের ল্যাপটপের খবর প্রচার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এক কোটি অগ্রিম অর্ডার আসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে। বিশ্বব্যাপী প্রশংসা আর সুনাম যেন প্রকল্পটির উদ্দ্যোগী অধ্যাপক নেগ্রোপন্টেকে পৌঁছে দেয় আকাশচুম্বী সাফল্যে। কয়েক মাসের মধ্যেই লিবিয়া, থাইল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, নাইজেরিয়া, চীন, মিশর প্রায় ৭০ লক্ষাধিক ল্যাপটপ কেনে। শুধু মিশরই ১২ লক্ষ ল্যাপটপ ক্রয় করে তাদের শিশুদেরকে বিতরণ করেন। কিন্তু খুব স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ওই ল্যাপটপের দাম ১শ’ ডলার থেকে বেড়ে ১৮৮ ডলারে পৌঁছে যায় এবং বিশ্বব্যাপী এর সাফল্য আস্তে আস্তে ভাটা পড়ে। এসব নিয়ে আমার একটি লেখা ২০০৭ সালের ২৮ জানুয়ারি ‘দৈনিক সমকালে’ প্রকাশিত হয়েছিল।

মহামারি করোনার তাণ্ডবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন তাদের প্রিয় ক্যাম্পাস, বন্ধু-বান্ধব, আড্ডা, গল্প, ঝগড়া, তর্ক-বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা এবং সর্বোপরি ক্লাস, পরীক্ষা ও পড়ালেখা থেকে বিচ্ছিন্ন গত চার মাস যাবৎ- তখন বিনামূল্যে ইন্টারনেট এবং প্রতিজনে একটি করে ল্যাপটপ পাওয়ার অনুভূতি এবং কৃতজ্ঞতা কিভাবে প্রকাশ করা যায় তা জানা নেইl উন্নত এবং অতি উন্নত দেশের সরকার এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় এমনটি ভাবছে কিনা তাও জানা নেই। এ দেশের শিক্ষার্থীরা যখন ছাত্রাবাসে একজনের আসনে ৩-৪ জন, কমন রুম, ডাইনিং রুম ইত্যাদি যখন শিক্ষার্থীদের বাসস্থান তথা গণরুমে পরিণত হয়, পরীক্ষা শেষে যখন চাকরির কোন নিশ্চয়তা থাকে না– তখন ‘ওয়ান স্টুডেন্ট ওয়ান ল্যাপটপ, ওয়ান ড্রিম’ অর্থাৎ প্রতিটি শিক্ষার্থী একটি করে ল্যাপটপ পাবে এমন খুশির খবরে শিক্ষার্থীতো বটেই, শিক্ষক, অভিভাবকসহ সকল মহলে আনন্দের বন্যা বইবে তাতে কোন সন্দেহ নেইl প্রশংসিত হবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, মন্ত্রণালয় এবং সরকারl বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এই উদ্যোগ ‘মডেল’ হিসেবে বিবেচিত হবে বলে বিশ্বাস করি।

লেখক: অধ্যাপক ও পরিচালক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় 

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)