‘আজ মা নেই, কিন্তু আছে মায়ের ছায়া’

২৩ জুলাই ২০২০ | আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২০

হামিন আহমেদ

মা বেঁচে নেই ৬ বছর। ২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদটি হারিয়েছি আমি। আমরা খুব অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়েছি। কিন্তু বাবার অনুপস্থিতি মা কখনও বুঝতে দেননি আমাদের তিন ভাইকে। সবসময়ই আগলে রাখার চেষ্টা করতেন। তিনি কখনোই নিজের মতামত চাপিয়ে দেননি। স্বাধীনভাবে যেটা ইচ্ছা সেটা করেছি। চলতে চলতে এ ব্যাপারে মায়ের উদারতা টের পেয়েছি। শেষ দিন পর্যন্ত মা আমাদের ভালো কাজগুলোকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।

আমার মা ফিরোজা বেগম ৬৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে সংগীত সাধনায় সক্রিয় ছিলেন। যারাই তার কাছে গেছেন, তার ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়েছেন। মার যেমন কণ্ঠ ছিল, মানুষ হিসেবেও ছিলেন অনুকরণীয়। মা গানের ক্যারিয়ারে যেমন সফল ছিলেন, তেমনি ছিলেন সংসারেও। আমরা কখনও মায়ের অবহেলা পাইনি। আমি দেখেছি, গান গেয়ে স্টুডিও থেকে ঘরে ফিরেই মা রান্নাঘরে ঢুকে পড়তেন। অনেক ভালো রান্না করতে পারতেন তিনি। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। সারাজীবন তিনি আমাদের বাচ্চাই মনে করতেন। বাইরে কোথাও যখন যেতাম, বলতেন, এটা করবি না, ওটা করবি না।

ভাইবোনদের কাছে প্রিয়পাত্র ছিলেন তিনি। আমাদের মধ্যে যা কিছু ভালো তা মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছি। আতিথেয়তায় মা ছিলেন অতুলনীয়। যখন আমার দুই ভাই মিলে ব্যান্ড শুরু করি, তখন বাসাতেই চর্চা হতো। দলের অন্য বন্ধুরা বাসায় আসতেন। মা আমাদের সবাইকে একসঙ্গে চা-নাশতা খাওয়াতেন।

বাবা কমল দাশগুপ্ত ও মা ফিরোজা বেগম

আমাদের তিন ভাইয়ের মধ্যে শাফিন [শাফিন আহমেদ] খুব ভাগ্যবান, কলকাতায় কলামন্দিরে মায়ের সঙ্গে একই মঞ্চে গান করেছে সে। 'সুরের ছায়া, চাঁদের দেশে' এ গানটি মা উর্দুতে গাইলেন, আর শাফিন শোনায় বাংলায়। আমি মায়ের সঙ্গে গান না গাইলেও তার সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার এক অনুষ্ঠানে বাজিয়েছি। মাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল সেখানে। মায়ের কাছ থেকে আমি নজরুলসংগীত শিখেছি। অনেকেই হয়তো জানেন না, আমার শৈশব-কৈশোরের দীর্ঘ সময় নজরুলসংগীত সাধনায় কেটেছে।

ছোটবেলা থেকে মা-বাবাকে গান করতে দেখে গানের নেশা পেয়ে বসেছিল আমাকেও। স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে আমি 'গ্রাম ছাড়া ওই রাঙামাটির পথ' করেছি। মা আমাকে গানটি তুলে দিয়েছিলেন। নজরুলসংগীত চর্চা, গানের জগতে ক্যারিয়ার আর পরিবার- সবই সমান তালে এগিয়ে নিয়েছেন মা।

বছর ঘুরে আবারও এলো মায়ের জন্মদিন। তিনি বেঁচে থাকলে আগামী ২৮ জুলাই ৯৪ বছরে পা রাখতেন। আর বাবা কমল দাশগুপ্তর জন্মদিনও একই দিনে। যেজন্য এই দিনটি আমাদের জন্য অন্যরকম একদিন। মায়ের জন্মদিন সবসময় ঘটা করেই পালন হতো। মামা-খালারা বড় করে জন্মদিন পালন করতেন। এ বিশেষ দিনে মা দেশ ও দেশের বাইরের প্রচুর ফোন পেতেন। সারাদিনই ব্যস্ত সময় কাটাতেন। মায়ের গানের শিক্ষার্থীরা আসতেন। তারা গান করত। খাওয়া-দাওয়া, বিশাল হইহুল্লোড় হতো। আমি তখন অনেক ছোট, একবার কলকাতায় মা-বাবার জন্মদিন উপযাপন হয়েছিল। ওই অনুষ্ঠানে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, নির্মলা মিত্র, প্রণব রায়,সব্যসাচী, শ্যামল মিত্রসহ অনেক গুণী মানুষ হাজির হয়েছিলেন। মায়ের নিরন্তন সাধনা আমাদের সংগীত জীবনকে আলোকিত করেছে। মায়ের ছায়ায় আমরা বেড়ে উঠেছি। আজ মা নেই, কিন্তু আছে মায়ের ছায়া।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)