ফিরে আসুক বর্ষার প্রাচুর্য

২৮ জুলাই ২০২০ | আপডেট: ২৮ জুলাই ২০২০

আশরাফুল ইসলাম

কদম-কামিনীর সৌরভে মাতিয়ে তোলা প্রকৃতির কথা ভাবলেই অবচেতনে ভেসে উঠে মেঘ-মেদূর বর্ষার স্মৃতিময় রূপ। এমন দিনে গোয়ালবন্দি গরু-ছাগলের মুখে আহার যোগাতে কৃষাণ-কৃষাণীর কপালে চিন্তার ভাঁজ কিংবা বৃষ্টিভেজা প্রাণিকূলের জবুথবু অবস্থা। নারকেল কুচি আর চাল-কাঁঠাল বিচির ভাজা জামার পুটলিতে নিয়ে মহাভোজন এমন কতোই না রোমাঞ্চকর শৈশবস্মৃতি আজ ভিড় করে। শৈশবের যাপিত সেই গ্রামীণ জীবনের কথা ইট-পাথরের শহরে বসে যখন রোমন্থন করি তখন উদগ্র এক হাহাকার যেন ক্রমেই ব্যাকুল করে তুলে। এই ভেবে ব্যাকুল হই যে তিন দশক আগেও প্রকৃতির যে ঐশ্বর্য আমরা দেখেছি তা কোথায় হারিয়ে গেল? করোনাকালের এবারকার বর্ষা যে বিশেষ বৈচিত্র্য নিয়ে হাজির হয়েছে তা অনেক ভাবনারও উদ্রেক করেছে বৈকি! সেই বিবরণ তুলে ধরবার আগে ফিরে যাব আরও তিন দশক পূর্বে।

শৈশবের বর্ষার স্মৃতি কতোই মধুর! বনাঞ্চলবেষ্টিত ভাওয়ালের কাওরাইদ। কবি গোবিন্দ দাসের ভাষায়, ‘কি তার মোহন রূপ, লাবণ্যের শতস্তুপ।/রহিয়াছে টেকে টেকে হয় অনুমান।/উজ্জ্বল কিরণময়, গ্রহতারা সমুদয়/কনক কিরীট তার শিরে পরিধান/ভাওয়াল আমার অস্থিমজ্জা,/ভাওয়াল আমার প্রাণ।’ (ভাওয়াল)  

বলছিলাম কয়েক দশক আগেকার বর্ষার কথা। তখনকার বর্ষা কিঞ্চিত দুর্ভোগের অনুষঙ্গ হয়েই শুধু হাজির হতো না; অথৈ পানির সঙ্গে সেই বর্ষা বিপুল প্রাচুর্যও বয়ে আনতো। সড়ক পরিবহণ ব্যবস্থা বলতে তখনও তেমন কিছু গড়ে উঠেনি কাওরাইদে। মাঝেসাঝে সশব্দে কোনো মোটরযানের আগমন ঘটলে শিশুরা ঈদের চাঁদ দেখার মতো আগ্রহ নিয়ে ছুটে যেতো। মোটরযানে ধোঁয়া নাকে শুকে যেন বিরাট সৌভাগ্যের অংশীদার ভাবতো তারা! তখন বর্ষায় নৌপথই অপরিহার্য অবলম্বন অধিবাসীদের। তবে পণ্য বিনিময় প্রথার তখন বেশ চল। ভাটি অঞ্চলের কুমোররা তখন নৌকা বোঝাই মাটির হাড়িপাতিল আর মিষ্টি আলু নিয়ে হাজির হতো ভাওয়ালের কাওরাইদ অঞ্চলে। এই কুমোররা দিনভর এ-গ্রাম ও-গ্রাম ঘুরে বেড়াতো। তারা কাঁঠালের বিনিময়ে দিয়ে যেতো মিষ্টি আলু কিংবা মাটির হাড়ি। আমাদের গাঁয়ের হাট বলদীঘাটে তখন বহিরাগত ‘বণিকদের’ হরদম বিচরণ। মাটিকাটা তীরঘেঁষে বলদীঘাট বাজারের চারপাশে শ’য়ে শ’য়ে বিভিন্ন আকারের কাঠের নৌকা। এসব নৌকায় কতগুলোতে ইঞ্জিন বসেছে আর বাকীগুলো তখনো ইঞ্জিনবিহীন। অনেক নৌকায় সেই ‘বণিকদের’ পরিবারসুদ্ধ চলে আসতেন। নৌকাতেই চলতো রান্না-আহার-নিদ্রা সবকিছু। হাট বার শনি আর মঙ্গলেই নয়-পুরো বর্ষা মৌসুম জুড়েই এদের এই সরব উপস্থিতি আমাদের হাটকে রীতিমতো এক ‘বন্দরের’ মর্যাদাই দিয়েছিল! 

তবে সব ছাপিয়ে বর্ষার যে প্রাচুর্য এই জনপদকে বিশেষত্ব দিয়েছিল তা হচ্ছে-সুস্বাদু মাছের অঢেল প্রাপ্তি। শীতলক্ষ্যার যে সুশীতল প্রবাহ বরমী আর কাওরাইদের বুক চিড়ে সুতী-মাটিকাটা নাম ধারণ করে ভালুকাপ্রান্তে খিরো নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে এই অঞ্চলকে চিরসবুজ করে রেখেছে, সেই গাঙ্গেয় অববাহিকা কাওরাইদ ও সংলগ্ন অঞ্চলের অজস্র খালবিলেও জলজ প্রাণবৈচিত্র্য আর অঢেল মৎস্যসম্পদে ভরিয়ে রেখেছে বহুকাল। প্লাইস্টোসিন যুগের টেক-টিলাময় জনপদে এসব মায়াময়ী স্রোতস্বিনী স্রষ্টার অপার আশীর্বাদ হয়েই হয়তো আমাদের পরিপুষ্ট করে যাচ্ছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।

শৈশবে কোনো এক প্রত্যুষে মা’য়ের ডাকে হন্তদন্ত হয়ে উঠানে এসে যেই জেনেছি-বিলে জেলেরা বেড়জাল ফেলেছে; লাফিয়ে ছুটে গেছি বিলের ধারে। যাওয়ার সময় মা শরিফুন্নাহার হাতে ধরিয়ে দিতেন দুই টাকার একটি নতুন নোট আর মাঝারি সাইজের সিলভারের বাটি। জেলেরা বিলজুড়ে জাল ফেলে টেনে টেনে যখনই তীরে বেড়াতেন আমরা ভিড় জমাতাম সেখানে। ২ টাকার সেই নোট নিয়ে বাটি ভরে মাছ দিয়ে দিতেন জেলেরা। সদ্য ধরা মাছগুলো বাটিতে লাফাতে থাকতো; তাই নিয়ে পরম খুশিতে বাড়িতে ফিরতাম। বড় গামলায় ঢেলে মা যখন মাছগুলো কাটতেন ঠাঁই বসে তা দেখতাম। কম করে হলেও ২৫-৩০ প্রজাতির মাছ থাকতো তাতে। সুস্বাদু শিং-মাগুর-কৈ কিংবা রূপবান ঘোড়া মাছ-কী নেই তাতে! অকৃত্রিম সেই আনন্দের অনুভূতি বোধহয় এখনকার প্রজন্ম হারাতেই বসেছে! 

স্মৃতির পাতা উল্টে ফিরে আসি করোনাকালের বর্ষার দিনে। দু’দিন আগে অনুজ জাহিদ মুন্না মেসেঞ্জারে কিছু ছবি পাঠিয়ে জানাচ্ছিল বর্ষা এসে গেছে। পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে সে-ও মাছ ধরতে নেমেছিল বিলে। কিছু মাছও ধরেছে-তারই স্থিরচিত্র পাঠিয়ে দারুণ উল্লসিত সে। কারণ ‘বহুদিন পর’ বাড়ির পাশে বিলে এভাবে মাছ ধরা গেল! সত্যিই তো খোদ গ্রামে জন্মে যদি বর্ষার বিলে উৎসব করে মাছ ধরার আনন্দ উদযাপন না করা যায় তবে গ্রামীণ ঐতিহ্য বলে কী থাকে? কাওরাইদের বিল-নদীবেষ্টিত এই জনপদে জাহিদের মতো তরুণরা তাদের পূর্বসূরিদের মতো মাছ ধরার আনন্দ থেকে বঞ্চিত অন্তত দেড় দশক ধরে। করোনাকালের বর্ষা তবে কী প্রকৃতিতে কিছুটা আশীর্বাদ হয়েই ধরা দিলো? মানবসভ্যতার রোষে নিষ্পেষিত অকৃপণ প্রকৃতি কী তবে করোনাকালের স্থবিরতায় তাকে কিছুটা পুনরুদ্ধারে সক্ষম হলো? অধুনালুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন শাসিত বিধ্বস্ত চেরনোবিলের ঘুরে দাঁড়ানোর উদাহরণই কী তাহলে আমাদের সামনে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠলো! সুযোগ পেলে প্রকৃতি নিজেই তাকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম-প্রকৃতি বিজ্ঞানীদের এই মূল্যায়নই কী তবে বাস্তব হয়ে উঠলো? সুতী-মাটিকাটা বিধৌত কাওরাইদ ও সংলগ্ন শ্যামল জনপদে বিগত দেড়-দুই দশক ধরে বিষাক্ত তরল শিল্পবর্জ্যরে আগ্রাসনে যে বিপন্নদশা তৈরি হয়েছে, করোনাকালে কয়েক মাসে দূষণের তীব্রতা হ্রাসে প্রকৃতি তাকে কতকটা পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয়েছে-তা আমরা বলতেই পারি। এই দাবির সমর্থন যুগিয়েছে গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনও। কক্সবাজার সমদ্রতটে কচ্ছপের ডিম ফুটানো, গোলাপি ডলফিনের লাফালাফি কিংবা হালদার প্রাণবৈচিত্র্য ফেরার সাম্প্রতিক দৃশ্যকে প্রকৃতি বিজ্ঞানীরা এমন মূল্যায়নেই অভিষিক্ত করছেন। কেবল বাংলাদেশেই নয় বিশ্বের নানাপ্রান্তে এমন সুখকর খবরে আমাদের মনে এই প্রতীতি জন্মেছে যে, আমরা বিষাক্ত না করলে প্রকৃতি তার আদি ও অকৃত্রিম রূপে-প্রাচুর্যে নিজেকে ফেরাতে পারে। 

দৃষ্টিপাত করবো রাজধানীর অদূরে গাজীপুরে শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ ও আশপাশের জনপদের দিকে। আগেই উল্লেখ করেছি মায়ের মতো পরম মমতায় সুতী, মাটিকাটা ও খিরো এখানকার প্রকৃতিকে এমনভাবে প্রাণময় করে রেখছিল যুগ যুগ ধরে; সেই ধারাবাহিকতায় কুঠারাঘাত করে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দুই পাশে গড়ে উঠা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো। বিপুল কর্মস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করলেও শিল্প কারখানাগুলো তাদের বিষাক্ত তরল বর্জ্য অপসারণে বিদ্যমান আইনের প্রতি নূন্যতম শ্রদ্ধা প্রদর্শন করছেন না। পরিবেশ-প্রতিবেশ ব্যবস্থার প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন এসব উদ্যোক্তাগণ তাদের বিষের নহর সরাসরি খাল-বিল ও নদীতে অবমুক্ত করে পুরো অঞ্চলে দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে যে ভয়ংকর বিপন্নতা তৈরি করছেন তা বহুমাত্রিক সংকটের সৃষ্টি করেছে। মুক্তজলাশয়ে দূষণের এই তীব্রতা এ অঞ্চলের জনস্বাস্থ্য, কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা তথা সামগ্রিকভাবে এখানকার বাসযোগ্যতাকেই রীতিমতো হুমকির মুখে ফেলেছে। ফলশ্রুতিতে এসব অববাহিকার জলজ প্রাণবৈচিত্র্য ও বিপুল মৎস্যসম্পদ এখন বিপন্নপ্রায়। হরহামেশায় নদীগুলো লাফিয়ে উঠা শুশুকের সৌন্দর্য বহুদিন দেখেননি এখানকার অধিবাসীরা। শ্রীপুর ও ভালুকা শিল্পাঞ্চলের অব্যাহত দূষণের ভয়াবহতা গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়ে আসছে, রুটিন মাফিক সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো অভিযানও চালিয়েছে-করেছে জরিমানা। তবে সাময়িক বন্ধ রেখে ফের দূষণের এই আগ্রাসন চালাতে প্রতিষ্ঠানগুলো অবিবেচকের মতো সক্রিয় থাকছে। গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে আমরা জানতে পারছি, অসাধু উদ্যোক্তাগণের এই আগ্রাসনে গোপনে সহযোগিতা দিচ্ছেন স্থানীয় কতিপয় জনপ্রতিনিধিসহ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও। আমরা এমন নীতিহীন আঁতাতে স্তম্ভিত ও ব্যথিত। যে আগ্রাসন একটি জনপদের বাসযোগ্যতাকেই চ্যালেঞ্জ করছে সেই অপচেষ্টার সঙ্গে হাত মেলানোর নিন্দা জানাবার ভাষা আমাদের জানা নেই। তবে করোনাভাইরাসে মানবজাতি আজ যে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সেখান থেকে আমাদের শিক্ষা নিতেই হবে। এই বিশ্বচরাচর কেবল মানবসম্প্রদায়ের জন্যই সৃষ্টি হয়নি। মানাবাধিকারের সঙ্গে প্রাণি অধিকার সর্বোপরি প্রকৃতির সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকারের বিষয়েও আজ হাজার বার ভাববার সময় এসেছে। দূষণে বিপন্নপ্রায় কাওরাইদের প্রকৃতি যেমন করে তাকে পুনরুদ্ধারে আশা জাগাচ্ছে আমরা মনেপ্রাণে চাই তা অব্যাহত থাকুক। ভরপুর প্রাণবৈচিত্র্যের যে গ্রামীণ জনপদে যুগে যুগে আমাদের বেড়ে উঠা প্রাচুর্যের সেই জনপদে বেড়ে উঠুক পরবর্তী প্রজন্মও। সবরকমের দূষণের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক জনপ্রতিরোধের এখনি উপযুক্ত সময়। এই বর্ষায় মাছ ধরতে পেরে উৎফুল্ল জাহিদের মতো তরুণরাই এই প্রতিরোধের সন্মুখযোদ্ধা হোক। প্রকৃতির প্রাচুর্য ফেরাতে সমস্বরে বিঘোষিত হোক; ‘নদীকে বিপন্ন করে বিপন্ন করে নয় সম্বৃদ্ধির জয়যাত্রা।’ 

লেখক: সভাপতি, সুতী সুরক্ষা পরিষদ

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)