ভার্চুয়াল আদালত গতিশীল করতে নানা উদ্যোগ

করোনাকালে বিচার বিভাগ -(৫)

২৯ জুলাই ২০২০ | আপডেট: ২৯ জুলাই ২০২০

আবু সালেহ রনি

করোনা পরিস্থিতিতে শুরু হওয়া ভার্চুয়াল আদালতের পাশাপাশি নিয়মিত আদালতে বিচার কাজ শুরু করা যায় কি-না, তার সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখছে সরকার ও সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। ঈদুল আজহার ছুটির পর হাইকোর্ট বিভাগে ভার্চুয়াল দ্বৈত বেঞ্চ এবং অধস্তন ভার্চুয়াল আদালতে সব ধরনের মামলার শুনানি শুরু করার উদ্যোগও রয়েছে। এতে সার্বিক কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনডিপি) ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রজেক্ট। এ ছাড়া আইন মন্ত্রণালয় থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে বিচারের বিষয়ে সংশ্নিষ্ট সাক্ষ্য আইন সংশোধনের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের বিচার বিভাগকে আধুনিকায়ন করতেও গ্রহণ করা হয়েছে ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প।

এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, সরকার দীর্ঘদিন ধরে ই-জুডিশিয়ারি চালুর উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছিল। কিন্তু মার্চ মাসে করোনা প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে প্রধান বিচারপতি আদালত বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। বিচার কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বিচারপ্রার্থীরা অত্যন্ত কষ্টে দিনযাপন করেছেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে কারাগারগুলোও ধারণ ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। তখন পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে আদেশ দেন, ভার্চুয়াল কোর্ট নিয়ে আমাদের যে পরিকল্পনা তা সীমিত পরিসরে হলেও চালু করতে। এরই ধারাবাহিকতায় 'আদালত কর্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ ২০২০' জারির মাধ্যমে ভার্চুয়াল আদালত চালু হয়েছে। এখন শুরু হচ্ছে ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ। তার মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কম্পিউটারাইজড প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়া আরও সহজ, স্বচ্ছ এবং গতিশীল হবে।

বিচার সংশ্নিষ্টরা বলছেন, সবগুলো উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে নিয়মিত আদালতের পাশাপাশি ভার্চুয়াল আদালতেও বাদী-বিবাদীর সম্মতিতে বিচার কাজ অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে। করোনা পরিস্থিতি আরও দীর্ঘ হলে ভার্চুয়াল আদালতের পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে হলেও নিয়মিত আদালতে বিচার কাজ শুরু করা প্রয়োজন।

করোনা দুর্যোগে গত ২৫ মার্চ থেকে দেশের সব আদালতে নিয়মিত বিচার কাজ বন্ধের ঘোষণা দেয় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। এ পরিপ্রেক্ষিতে ৯ মে 'আদালত কর্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ' জারি করে ভার্চুয়াল মাধ্যমে আদালতের কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগ নেয় সরকার। এ বিষয়ে যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার দেওয়া হয় প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনকে। অধ্যাদেশ জারির পরদিনই সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে দেওয়া হয় বিশেষ নির্দেশনা। ফলে ১১ মে থেকে ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনার পথ উন্মুক্ত হয়। যদিও হঠাৎ করে কার্যক্রম শুরু হওয়ায় এর অবকাঠামোগত সীমবদ্ধতা অনেক। রয়েছে সাক্ষ্য আইনসহ বিচার সংশ্নিষ্ট আইনে আদালতে বাদী-বিবাদী, সাক্ষীসহ সংশ্নিষ্ট পক্ষের আইনজীবীদের শারীরিক উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা। যে কারণে ভার্চুয়াল আদালতকে শুধু জামিন ও জরুরি বিষয়দি শুনানির এখতিয়ার দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।

জানা গেছে, চলতি সপ্তাহ থেকে ডিজিটাল কিউ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের আওতায় সুপ্রিম কোর্টে প্রথমবারের মতো ফাইলিং ও এফিডেভিট গ্রহণের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে সংশ্নিষ্টদের একটি স্লিপ দেওয়া হয়। সেই স্লিপের মাধ্যমে সহজেই অনলাইন-অফলাইনে মামলার গতিপ্রকৃতি নির্ণয় করা যাচ্ছে। ভার্চুয়াল আদালতে ডিজিটাল জালিয়াতি রোধে অনলাইনে কোর্ট ফিসহ অন্যান্য ফি গ্রহণেরও চিন্তা-ভাবনা চলছে। বুয়েটের কারিগরি সহায়তায় সুপ্রিম কোর্টে নতুন ডাটা সেন্টার স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এটি হলে উচ্চ ও অধস্তন আদালতের মামলা-সংক্রান্ত রায়সহ সব কিছু ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা যাবে। এ ছাড়া সফটওয়্যার ডেভেলপের মাধ্যমে মামলার বিবরণী সংরক্ষণেরও চিন্তা-ভাবনা চলছে। করোনাকালে পেন্ডিং রায়গুলো লেখা এবং গত চার মাসে শুনানির জন্য ধার্য ছিল এমন সব মামলায় শুনানির তারিখ নির্ধারণেরও উপায় খোঁজা হচ্ছে। এদিকে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে আদালতের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সহায়তা দিতেও সুপ্রিম কোর্ট থেকে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে।

উচ্চ আদালতের একাধিক বিচারপতি সমকালকে জানান, হাইকোর্ট বিভাগে দ্বৈত ভার্চুয়াল বেঞ্চ এবং ভার্চুয়াল মাধ্যমে অধস্তন আদালতের বিচার কাজ শুরু করার বিষয় নিয়ে ফুলকোর্ট সভায় আলোচনা হয়েছে। ঈদের ছুটির পর ভার্চুয়াল ও নিয়মিত আদালতে বিচার কাজ চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

আশা দেখাচ্ছে ভার্চুয়াল আপিল বিভাগ :করোনাকালে প্রায় দুই মাস বন্ধ থাকার পর গত ১৩ জুলাই ভার্চুয়াল মাধ্যমে আপিল বিভাগেও বিচার কাজ শুরু হয়েছে। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতি শুনানি গ্রহণ করেন। এ পর্যন্ত সাত কার্যদিবসে আপিল বিভাগে ২০০টি আবেদনের শুনানি গ্রহণ করা হয়েছে। যার মধ্যে ১০টি পূর্ণ আপিল নিষ্পত্তি করা হয়। এ ছাড়া ১৬৮টি সিভিল লিভ টু আপিলের নিষ্পত্তি এবং ২২টি মামলার আংশিক শুনানি হয়েছে। তবে বর্তমানে অবকাশকালীন ছুটির কারণে আপিল বিভাগে বিচার কাজ বন্ধ রয়েছে।

ভার্চুয়াল আদালত প্রসঙ্গে ১৩ জুলাই প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন শুনানিতে বলেন, 'ভার্চুয়াল কোর্ট স্বাভাবিক কোর্টের বিকল্প নয়। পরিস্থিতির উন্নয়ন হলে স্বাভাবিক কোর্টের কার্যক্রমে ফিরে যাওয়া হবে।' সুপ্রিম কোর্ট সংশ্নিষ্টরা বলছেন, ভার্চুয়াল আপিল বিভাগে বিচার কাজ শুরুর পর এর সুবিধা-অসুবিধাগুলো প্রধান বিচারপতিও চিহ্নিত করেছেন। সমাধান খোঁজা হচ্ছে। এর আলোকে শিগগিরই হাইকোর্টেও দ্বৈত বেঞ্চ চালু করা হবে। উল্লেখ্য, হাইকোর্টে বর্তমানে জামিনসহ কয়েকটি বিষয় নিষ্পত্তির জন্য ১২টি একক বেঞ্চ দায়িত্ব পালন করছে। তবে সাংবিধান ও মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত রিট এবং সিভিলসহ অন্যান্য বিষয়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য দ্বৈত বেঞ্চের (দুই বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত) প্রয়োজন রয়েছে।

আশাবাদী সরকারসহ সংশ্নিষ্টরা :ভার্চুয়াল আদালতে জামিন শুনানি ছাড়া মামলার বিচার কাজ করতে হলে তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত সাক্ষ্য আইন সংশোধন প্রয়োজন। গত ২৮ জুন এ-সংক্রান্ত আইনের একটি খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে আইন কমিশন। এ ব্যাপারে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক বলেন, "আদালতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে 'ডিজিটাল এভিডেন্স অ্যাক্ট'-এর একটি খসড়া তৈরির পর মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয় পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এটি যদি সরকার পাস করে, আইন করে ফেলে, তাহলে সেটা আরও ডায়নামিক হবে, আরও ভালো হবে।" ভার্চুয়াল আদালতে বিচার কাজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'বোধ হয় এই উদ্যোগটা আরও আগে নিলে আরও ভালো হতো।'

রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মাহবুবে আলম বলেন, 'করোনার এই সময়ে ভার্চুয়াল আদালত খুবই দরকার ছিল। এর মাধ্যমে কিছুটা হলেও বিচারপ্রার্থীদের জামিন দেওয়ার সুযোগ হয়েছে।' সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এএম আমিন উদ্দিন বলেন, 'ভার্চুয়াল আদালতকে আরও গতিশীল করতে হবে। এটি যত গতিশীল হবে বিচার বিভাগ ততই সমৃদ্ধ হবে।'

পাঁচ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ল :করোনা পরিস্থিতিতে দেশের অন্যান্য বড় প্রকল্পের মতো বিচার কাজ সহজীকরণ ও মামলাজট কমানোর লক্ষ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের চলমান পাঁচটি প্রকল্পেও দেখা দিয়েছে ধীরগতি। এরই মধ্যে প্রতিটি প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ এক বছর করে বাড়ানো হয়েছে। প্রকল্পগুলো হচ্ছে- ৬৪ জেলা সদরে বহুতল বিশিষ্ট চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন নির্মাণ, বিচারকদের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য অস্ট্রেলিয়ায় প্রশিক্ষণ প্রকল্প, হাইকোর্ট ভবনের পেছনে নতুন করে ১২ তলা ভবন নির্মাণ, বার কাউন্সিল ভবন নির্মাণ এবং আইন মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত জেলা ও উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার ভবন নির্মাণ প্রকল্প। (শেষ)



© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)