বিজ্ঞানীদের চোখে রাশিয়া ও চীনা ভ্যাকসিন

০৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ | আপডেট: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২০

ড. বিশ্বজিৎ সুর চৌধুরী

ড. বিশ্বজিৎ সুর চৌধুরী

রাশিয়া এবং চীনের তৈরি কভিড-১৯ ভ্যাকসিনে বিশেষ ধরনের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। সাধারণ সর্দি জ্বরের ভাইরাসের ওপর ভিত্তি করে এই ভ্যাকসিন তৈরি হয়েছে, যা এই ভ্যাকসিনের কার্যকারিতাকে খর্ব করবে বলেই মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। চীনে কানসিনো বায়োলজিকস, তাদের ভ্যাকসিন সৈনিকদের ওপর প্রয়োগের অনুমতি পেয়েছে, যা হচ্ছে পরিবর্তিত আকৃতির এডিনোভাইরাস টাইপ ৫ বা এডি৫। এই কোম্পানিটি বৃহৎ পরিসরে ট্রায়াল শেষ করার আগেই বিভিন্ন দেশে ব্যবহারের অনুমতি পাওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে গত সপ্তাহে রিপোর্ট করেছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

মস্কোর গামালেয়া ইনস্টিটিউটের তৈরি করোনা ভ্যাকসিন, যেটা রাশিয়া আগস্টের প্রথম দিকে অনুমোদন দিয়েছে পর্যাপ্ত পরীক্ষা ছাড়াই। এই ভ্যাকসিনটি এডি৫ এবং আরেকটি অপেক্ষাকৃত কম প্রচলিত এডিনোভাইরাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আনা দারবিন বলেন, 'এডি৫ নিয়ে আমি চিন্তিত কারণ অনেক মানুষের এটার জন্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমি নিশ্চিত না তাদের কি চিন্তাভাবনা .... তবে, সম্ভবত এই ভ্যাকসিনের ৭০% কার্যকারিতাও থাকবেন। এটার ৪০% কার্যকারিতা থাকতে পারে, যা নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালোর মতোই, যতক্ষণ পর্যন্ত না অন্য কোনো কিছু আসে।'

এই প্যানডামিক, যা পৃথিবীতে ৮৪৫,০০০ জন মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, তার পরিসমাপ্তি ঘটাতে ভ্যাকসিন অত্যাবশ্যকীয়। গামালেয়া দাবি করছে, তাদের ভ্যাকসিনে দুটি ভাইরাসের বিষয়টা এডি৫-এর রোগ প্রতিরোধ-সংক্রান্ত শঙ্কা দূর করবে। দুটি কোম্পানিরই বেশ কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে এডি৫-এর ওপর ভিত্তি করে ইবোলা ভ্যাকসিন তৈরি এবং তা অনুমোদনের। কানসিনো এবং গামালেয়া কেউই ভ্যাকসিনের ব্যাপারে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। কয়েক যুগ ধরে গবেষকদের বিভিন্ন সংক্রমণজনিত রোগের জন্য এডি৫ নির্ভর ভ্যাকসিন ব্যবহারের অভিজ্ঞতা হয়েছে। কিন্তু কোনোটাই এখন ব্যাপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। এই প্রক্রিয়ায় তারা ক্ষতি করতে পারে না, এমন ভাইরাসগুলো ব্যবহার করে, টার্গেট ভাইরাসের জিন বহন করার জন্য, যাকে ভেক্টর বলা হয়। এ ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসটা মানুষের দেহে বহন করে নিয়ে যাবে এই ভেক্টর এডি৫ ভাইরাস, সেখানে করোনার বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করার জন্য।

কিন্তু অনেক মানুষেরই এডি৫-এর বিপরীতে অ্যান্টিবডি আছে। ফলে, যা দাঁড়াতে পারে তা হচ্ছে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেক্টরকে আক্রমণ করতে পারে, করোনার বিপরীতে অ্যান্টিবডি তৈরি করার পরিবর্তে, যা এই ভ্যাকসিনকে কম কার্যকরী করে তুলবে। অনেক বিজ্ঞানী পরিবর্তিত এডিনোভাইরাস পছন্দ করেছেন ভেক্টর হিসেবে। অপফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং এস্ত্রাজেনেকা তাদের করোনা ভ্যাকসিন তৈরি করছে একটা শিম্পাঞ্জি এডিনোভাইরাসের ওপর ভিত্তি করে, যাতে করে এডি৫-এর ব্যাপারটা এড়িয়ে চলা যায়। জনসন অ্যান্ড জনসন ব্যবহার করছে এডি২৬, যা তুলনামূলভাবে অনেক অপ্রচলিত একটা স্ট্রেন। কানাডার ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করছেন ড. ঝোউ জিং। তার মতে, কানসিনোর ভ্যাকসিনের তুলনায় অক্স

ফোর্ডের ভ্যাকসিন অনেক সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। ড. জিং আরও শঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, উচ্চ মাত্রার এডি৫ ভেক্টর ভ্যাকসিন শরীরে জ্বরের কারণ হতে পারে। ড. হিল্ডিগুন্ড এরটল ফিলাডেলফিয়ার উইস্টার ইনস্টিটিউট ভ্যাকসিন সেন্টারের ডিরেক্টর। তার মতে, যাদের দেহে এডি৫ ভেক্টর ভাইরাসের বিপরীতে অ্যান্টিবডি নেই, তাদের দেহে ভালো কাজ করবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, প্রচুর মানুষের এই অ্যান্টিবডিটা রয়েছে।

চীনে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৪০% মানুষের দেহে এডি৫ আগে থেকেই ঢুকে যাওয়াতে তাদের এর বিপরীতে অ্যান্টিবডি রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা তো বলছেন, আফ্রিকাতে ৮০% মানুষের দেহে এই অ্যান্টিবডি রয়েছে।

গামালেয়ার ভ্যাকসিন দুটি ডোজে শরীরে দেওয়া হবে। প্রথমটি এডি২৬, যা জনসন অ্যান্ড জনসনের মতোই। কিন্তু দ্বিতীয়টি এডি৫ নির্ভর ভ্যাকসিন। আলেকজান্ডার গিন্সবার্গ, যিনি গামালেয়ার ডিরেক্টর। তার মতে, তাদের ভ্যাকসিন ভাইরাসের দুই ধরনের ভেক্টর ব্যবহার করাতে রোগ প্রতিরোধ-সংক্রান্ত যে অভিযোগ উঠেছে তা ধোপে টিকবে না।

অনেক বিশেষজ্ঞ তাদের সন্দেহের কথা জানিয়েছেন রাশিয়ার ভ্যাকসিনের ব্যাপারে। কারণ, বৃহৎ আকারের পরীক্ষা ছাড়াই সামনে অক্টোবর থেকে যারা অতিরিক্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে তাদের এই ভ্যাকসিন দেওয়ার ব্যাপারে সরকার ঘোষণা দিয়েছে। ডা. ডান বারৌচ হার্ভার্ড ভ্যাকসিন গবেষক। যিনি জনসন অ্যান্ড জনসনের কভিড-১৯ ভ্যাকসিনের নকশা করতে সাহায্য করেছিলেন। তার মতে, ভ্যাকসিনের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা দুটোই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রায়ই বলে থাকেন, বৃহৎ পরিসরে পরীক্ষা সব সময় কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না।

পাদটীকা : লেখক জাপান টাইমসের একটা রিপোর্ট থেকে এই লেখাটি বাংলায় ভাবানুবাদ করার চেষ্টা করেছেন মাত্র। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রতিফলন নেই এই লেখাতে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান             

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)