করোনা : নতুন স্বাভাবিকতায় করণীয়

দরকার সব আঙুল মুষ্টিবদ্ধ করা

বিশেষজ্ঞ মত

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডা. মুশতাক হোসেন

দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশে কভিড-১৯ মহামারির যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, সেখানে একেক দেশের পরিস্থিতি একেক রকম। ভারতে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি থামছেই না। পাকিস্তানে মহামারির নিম্নগতি দেখা যায়। নেপালে ও শ্রীলঙ্কায় ওঠানামা করছে। আর বাংলাদেশে ধীরগতিতে উঠে জুন মাস থেকে প্রায় একই উচ্চতায় আছে। জুলাই মাসে উচ্চতা একটু কম দেখা গিয়েছিল। আগস্ট মাস থেকে আবার ধীরে ধীরে গ্রাফটির উচ্চতা বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে এসে খানিকটা নিম্নগতি দেখা যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে কোনো কোনো গবেষক তথাকথিত 'পিক' বা সংক্রমণের শীর্ষবিন্দু খুঁজছেন। সে রকম 'আদর্শ' কোনো শীর্ষবিন্দু না পাওয়ায় সরকারকে দুষছেন এ বলে যে, সরকার সঠিক তথ্য গোপন করে 'পিক'টাও গোপন করে রেখেছে! তারা এ বাস্তবতা মানতে চাইছেন না যে, বাংলাদেশে সে রকম 'পিক' দেখা যায়নি, যেমনটি চীনের উহান, ইতালির লোম্বার্ডি বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক মহানগরীতে দেখা গিয়েছিল। কারণ, এখনও বাংলাদেশের কোনো জনপদে ওইসব দেশের মতো ঘনীভূত মহামারি বিস্টেম্ফারিত হয়নি। বাংলাদেশে কভিড-১৯ মহামারি ধীরগতিসম্পন্ন 'তুষের আগুন জ্বলার মতো'। শুধু বাংলাদেশ নয়, হঠাৎ মহামারি বিস্টেম্ফারিত হওয়া চীন-ইউরোপ-আমেরিকার ১০-১৫টি দেশ ছাড়া পৃথিবীর সব দেশেই একই অবস্থা। কোনো কোনো দেশ, যেমন- ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি দেশ প্রথম দিকে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করে প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনলেও সেসব দেশে এখন আবার সংক্রমণ বাড়ছে।

বিশ্বব্যাপী যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তাতে এটা পরিস্কার যে, আপনাআপনি কভিড-১৯ মহামারি মিলিয়ে যাবে না। যেসব দেশে মহামারি নিয়ন্ত্রণ করা গেছে, তারা আপ্রাণ চেষ্টা করেই সেটা থামিয়েছিল। পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের কথা আগেই বলেছি, যেসব দেশে মহামারি অতটা তীব্র ছিল না। কিন্তু তীব্রতা ও গভীরতা উভয় মাপেই যেখানে মহামারি ব্যাপকতা ছড়িয়েছিল, সেসব দেশ যেমন- চীন, ইতালি, জার্মানি, স্পেন, যুক্তরাজ্য সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মহামারির গতি থামিয়েছে। তবে মহামারির ধাবমান ঘোড়াকে এখনও বশে আনতে পারেনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইরানসহ কয়েকটি দেশ।

বাংলাদেশে মহামারির মাত্রা পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকার তুলনায় কিছুটা কম হলেও একে দীর্ঘস্থায়ী করতে দেওয়ার ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। মহামারিকে নিম্নগামী করতে হবে, বর্তমান ধীরগতিতে প্রবহমান মহামারি সংক্রমণ ও মাঝারি আকারের মৃত্যুসংখ্যা নিয়ে আত্মতৃপ্তি বোধ করলে বিপদের ঝুঁকি বাড়বে। বরঞ্চ এটাকে প্রস্তুতির দুর্বলতা কাটানোর সুযোগ হিসেবে নিয়ে কর্তব্যগুলো সারতে হবে। কারণ, মহামারি নিয়ন্ত্রণে না এলে অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের কাজ চালানো যাবে না। যার প্রভাব দেশের সকল ক্ষেত্রেই পড়বে।

প্রথমত. আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে হঠাৎ করে বাংলাদেশের কোনো ঘনবসতি এলাকাতে বা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মাঝে মহামারির বিস্টেম্ফারণটা যেন না ঘটে। এসব স্থানে রোগ নজরদারি করতে হবে সার্বক্ষণিকভাবে। এখানকার বাসিন্দাদের পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সহায়তা দেওয়া অব্যাহত রাখতে হবে।

দ্বিতীয়ত. যতজন রোগী ল্যাবরেটরি পরীক্ষা দ্বারা শনাক্ত হচ্ছেন, তাদের প্রত্যেককে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের দ্বারা দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী দ্বারা মেডিকেল তত্ত্বাবধান করা এবং রোগীদের আইসোলেশন নিশ্চিত করতে হবে। লক্ষণ দেখা দেওয়ার দু'দিন আগে থেকে সংক্রমণ শনাক্ত হওয়া পর্যন্ত তাদের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে কোয়ারেন্টাইন করতে হবে। আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইন দুটোই অন্যান্য সুস্থ মানুষ হতে পৃথক্‌করণকে বোঝায়। আইসোলেশনে থাকেন সংক্রমিত মানুষ, যিনি চিকিৎসাধীন থাকেন। কোয়ারেন্টাইনে থাকেন সুস্থ মানুষ অন্য সুস্থ মানুষদের থেকে আলাদা হয়ে, কারণ তিনি যেহেতু কভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এসেছেন, তিনি ১৪ দিনের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন বা নাও হতে পারেন। অসুস্থ হলে যেন তাকে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা দেওয়া যায় এবং তার কাছ থেকে অন্য কেউ যেন সংক্রমিত হতে না পারে, সে জন্যই কোয়ারেন্টাইন করা হয়।

তৃতীয়ত. মহামারির মাত্রাকে নামিয়ে আনার জন্য প্রতিটি নাগরিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন। হাঁচি-কাশি দেওয়ার সময় নাক-মুখ ঢেকে তা করতে হবে। টিস্যু দিয়ে নাক-মুখ ঢাকলে তা ঢাকনাযুক্ত ময়লা ফেলার পাত্রে ফেলতে হবে। রুমাল বা জামা-কাপড় দিয়ে ঢাকলে তা প্রথম সুযোগেই ধুয়ে ফেলতে হবে। ঘরের বাইরে বের হলে মাস্ক পরতে হবে। তিন পাল্লার কাপড়ের তৈরি মাস্ক ব্যবহার করলেই চলবে। মেডিকেল মাস্ক স্বাস্থ্যকর্মীরা স্বাস্থ্যসেবা দানকালে পরবেন। ঘরের বাইরে থাকার সময় অন্যদের থেকে কমপক্ষে দু'হাত দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে, বিশেষ করে বদ্ধ জায়গায় একসঙ্গে অনেক মানুষ আছে এমন স্থানে যাওয়া উচিত নয়। এমন স্থানে যেতে বাধ্য হলে ১০ মিনিটের বেশি থাকা ঝুঁকিপূর্ণ। বদ্ধ জায়গার চেয়ে আলো-বাতাস চলাচল আছে এমন স্থান কম ঝুঁকিপূর্ণ। গণপরিবহনে চড়তে হলে গাড়ির জানালা খোলা রাখতে হবে, যেন বাতাস চলাচল হতে পারে। ঘরের বাইরে থাকার সময় হাত দিয়ে কোনো কাজ করার পর সাবান বা হ্যান্ড স্যানিটইজার দিয়ে হাত পরিস্কার করতে হবে। ঘরে ফেরার পর সঙ্গে সঙ্গে সাবান দিয়ে দু'হাত ধুয়ে ফেলতে হবে। এরপর পরনের কাপড় সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলাই ভালো। সম্ভব না হলে কাপড় এমন জায়গায় রাখতে হবে, পরিবারের অন্যদের কাপড়ের সংস্পর্শে যেন তা না আসে। এরপর সাবান দিয়ে গোসল সেরে ফেলতে হবে। তা সম্ভব না হলে দু'হাতের সঙ্গে মুখমণ্ডল সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।

চতুর্থত. স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সক্রিয় পন্থায় রোগী শনাক্তকরণ, তাকে ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও পৃথক্‌করণ, তার চিকিৎসা, ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত করে কোয়ারেন্টাইন এবং নাগরিকদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে জনগণকে সম্পৃক্ত করা অত্যাবশ্যক। যতটুকু সম্ভব ছোট এলাকা ধরে সেখানকার স্থানীয় জনগণকে এ কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে সংগঠিতভাবে। বাংলাদেশে সবচেয়ে ছোট রাজনৈতিকভাবে নির্দিষ্ট এলাকা হচ্ছে ওয়ার্ড। নির্বাচিত কাউন্সিলর হচ্ছেন ওয়ার্ডের জনপ্রতিনিধি। তাকে সম্পৃক্ত করে ওয়ার্ডের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে প্রথম (রোগ নজরদারি), দ্বিতীয় (রোগী শনাক্তকরণ, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টাইন) এবং তৃতীয় কাজ (স্বাস্থ্যবিধি পালন) সুচারুভাবেই সম্পন্ন করা সম্ভব। ওয়ার্ডে তরুণ-যুবক, নারী-পুরুষ, স্বেচ্ছাসেবকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই তিনটি কাজ খুব ভালোভাবে সম্পন্ন করেছেন মার্চ মাসে ঢাকার টোলারবাগে, মাদারীপুরের শিবচরে, জুনে ঢাকার পূর্ব রাজাবাজারে, জুলাইতে ঢাকার ওয়ারীতে। এসব স্বেচ্ছাবেকদের আইইডিসিআর সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং হাতে-কলমে বাস্তব কাজের মধ্যে মূল প্রশিক্ষণটা দিয়েছে। জনসম্পৃক্ততা ও স্বেচ্ছাসেবার এ উদাহরণ যদি বাংলাদেশের সব ওয়ার্ডে অনুসরণ করা হয়, তাহলে দেশব্যাপী যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ (লকডাউন) না করেও সংক্রমণ নিম্নগামী করা যেতে পারে। তবে এটি করতে হলে সমস্ত ওয়ার্ডে একই সময় বা কাছাকাছি সময়ে এটার মহড়া দিতে হবে, অনেকটা দেশব্যাপী শিশুদের টিকা দেওয়ার মতো সপ্তাহ বা পক্ষ পালন করে।

কভিড-১৯ বিশ্বমহামারি মোকাবিলায় হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। কীভাবে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ বন্ধ করা যাবে, সে পদ্ধতি ও বিজ্ঞান আমাদের জানা। দরকার সবগুলো আঙুল মুষ্টিবদ্ধ করে আঘাত হানা। সমাজের সমস্ত মানুষ, সমগ্র সরকার, পৃথিবীর সমস্ত দেশকে ঐক্যবদ্ধভাবে এ ঘাতক ব্যাধি থামাতে হবে। কোনো মানুষ একা কিংবা কোনো দেশ একা ভাইরাসকে পরাজিত করতে পারবে না। ভাইরাস যেন কোথাও আশ্রয় না পায়, সেটা নিশ্চিত করতে হলে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ ও সমস্ত দেশকে একযোগে হাত মেলাতে হবে। ইতিহাস বলে মানুষ পরাজিত হয়নি। এবারও আমরা পরাজিত হবো না।

রোগতত্ত্ববিদ; সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)





© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com