করোনাকাল

নতুন চ্যালেঞ্জ 'নিউ নর্মাল' লাইফ

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০ । ০০:০০ | আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০ । ০২:৪৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজীব নন্দী

করোনাকাল এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার নাম। ধারণা করা হচ্ছে, ভাইরাসটির ক্রমহ্রাসমান সংক্রমণে স্তব্ধ পৃথিবীর সুনসান নীরবতা ভাঙতে বসেছে। ধীরে ধীরে সচল হচ্ছে দুনিয়া। জানুয়ারি থেকে যে ভূতুড়ে মহাজাগতিক বসবাস আমাদের, তা একটু একটু করে 'ব্যস্ত' হতে যাচ্ছে। করোনাক্রান্তিতে আমাদের নিত্য চলাচলে যে নিষেধাজ্ঞা, স্কুল-অফিস বন্ধ, ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা এবং গণজমায়েতে বিধিনিষেধ ছিল তা উঠতে যাচ্ছে। করোনাকাল এমন এক পরিস্থিতি, যা সভ্যতার ইতিহাসে অভূতপূর্ব।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের মহামারি গবেষক ড. পর্ণালী ধর চৌধুরীর মতে, 'মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পোলিও টিকা বিপর্যয়ের পর ৬৫ বছর কেটে গেছে। টিকা নিরাপদ এবং কার্যকর হবে কিনা, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন অনেক বেশি সচেতন। ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণার ফলাফল দেখে আশাবাদী হতে ইচ্ছা করছে, কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন, এ বছর শেষ হওয়ার আগেই বাজারে কভিড-১৯ এর টিকা এসে যাবে, এ কথা বলার সময় এখনও কোনোমতেই হয়নি' (সূত্র :সব রোগের কি টিকা হয় :ট্রায়ালের প্রথম ধাপ সফল, কিন্তু টিকা এখনও অনেক দূর, আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৯ জুলাই, ২০২০)। হ্যাঁ, সত্যিই গবেষণার কোনো একটি ধাপে সাফল্যের সংবাদ মেলা আর সত্যিই কোনো কার্যকর প্রতিষেধক টিকা তৈরি করতে পারার মধ্যে বিস্তর ফারাক। যদিও এরই মধ্যে ভদ্মাদিমির পুতিন 'রুশ বিপ্লব' ঘটিয়ে ফেলেছেন বলে দাবি আছে বাজারে।

ভারত ও বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের ছয় মাস পেরিয়েছে। আমাদের যেহেতু নতুন করে এই রোগের সঙ্গে সহাবস্থান করতে হবে, তাই এমন কিছু কমিউনিকেশন ম্যাটেরিয়াল বানাতে হবে এবং ছড়িয়ে দিতে হবে, যা সমাজে সত্যিকার অর্থে বোধগম্য এবং অর্থবোধক হয়। এই কাজটি করবেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং জনস্বাস্থ্যবিদ। এই যুগল বোঝাপড়ায় আমরা সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জীবনযাপন অনুযায়ী নির্দিষ্ট বার্তা তৈরির প্রস্তাব দিতে পারি।

পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল, ঘনপুঞ্জীভূত বস্তি বা হতদরিদ্র এলাকার জন্য যে সচেতনতা প্রয়োজন, সেটি মধ্যবিত্তের জন্য প্রযোজ্য নয়। শিক্ষিত শহুরে উচ্চবিত্তের মুখের ভাষা গ্রামীণ জনগোষ্ঠী কোনোভাবেই বুঝবে না। ফলে এই কাজটি করতে হবে ফলপ্রসূ যোগাযোগ মডেলকে আশ্রয় করে। 'নিউ নর্মাল পোস্ট করোনা' যুগসন্ধিক্ষণের বিহ্বল মুহূর্তটি যেন মাটি ছেড়ে এই প্রথম আকাশে ডানা মেলার অপেক্ষায়। মহাভারতের পা বদের শেষ প্রতিনিধি পরীক্ষিৎ মহারাজার মতো 'করোনা' যেন একটি যুগসন্ধিক্ষণ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একাধিক গবেষক আশঙ্কা করছেন, করোনার পরের যুগে যারা বাঁচবেন, তাদের জন্য রয়েছে অভূতপূর্ব এক দানবিক অথবা মানবিক পৃথিবী। করোনার সঙ্গে সহাবস্থান অনিবার্য হয়ে উঠলে করোনাকালে ব্যবহূত শব্দগুলোর নতুন সামাজিক ব্যাখ্যা ও অর্থবোধকতা তৈরি হবে। সে লক্ষ্যে গত ছয় মাসে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সময়ে জনস্বাস্থ্য এবং সাংবাদিকতায় যে নতুন শব্দগুলোর বহুল প্রয়োগ ঘটেছে তার অর্থময়তা দরকার।

বলা বাহুল্য, কভিড-১৯ নামক একটি রোগ সেই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। গত বছরের মধ্য নভেম্বরে চীনের উহান থেকে যার যাত্রা শুরু, সে আজ জারি করেছে নয়া-রোগের বিশ্বায়ন। এই করোনাকে ঠেকাতে পুরো বিশ্ব যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাল তা নজিরবিহীন। কারণ, করোনা যা করেছে তা ছিল অভূতপূর্ব। করোনা-পরবর্তী সময়কে বলা হচ্ছে নিউ নর্মাল লাইফে ফেরা। দেশ থেকে দেশ-দেশান্তরে মহাভারতের নারদ মুনির মতো বিশ্বভ্রমণে করোনাভাইরাস যদি নিজের চরিত্র বদলাতে পারে, এবার প্রশ্নটি নিজের দিকে করা দরকার, নিউ নর্মাল লাইফে আমরা কতটুকু বদলাব?

যে কোনো মহামারির হাত ধরে আসে আতঙ্ক। ফলে জনস্বাস্থ্যকে দেখতে হবে যোগাযোগবিদ্যার পরিসর থেকে। কারণ, মহামারি মোকাবিলা আসলে প্রধানত জনস্বাস্থ্যকেন্দ্রিক যোগাযোগ বার্তার সফল প্রয়োগের মাধ্যমেই সম্ভব। এই ভাইরাসটি ব্যক্তিগতভাবে ঠেকানো মূল কৌশল হলেও, মহামারি কিন্তু সামাজিক প্রতিরোধের বিষয়। তাই আমরা দেখছি, কভিড-১৯ মহামারি একটা ভয়ংকর আতঙ্ক তৈরি করেছে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি জনমানসে। এই ভয় তৈরি করেছে কখনও অনিশ্চয়তা, কখনও হিংসা। রোগীর স্বজনের হাতে ডাক্তারকে পিটিয়ে মারার ঘটনাও ঘটেছে বাংলাদেশে। এই ভয়াবহ সময়টি পোস্ট করোনা নিউ নর্মাল লাইফ বলা হলেও, করোনাযুগ কি শেষ হয়েছে? আমরা ঠিকমতো বলতে পারছি না। কারণ, অনেক দেশ 'সেকেন্ড ওয়েবে'র আশঙ্কা করছে। সমাজটা আসলে কোনদিকে যাচ্ছে, তা ঠিকভাবে বুঝতে না পারার ফলে আতঙ্ক এবং হতাশা ঘিরে ধরেছে আমাদের।

জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর, 'নয় নয়' করে নয় মাস গত হলো। বিভিন্ন দেশে দ্বিতীয় দফায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে সংক্রমণের মাত্রা অনেক বেশি। এছাড়া বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ উন্মুক্ত হচ্ছে। দেশে বর্তমানে স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের শিথিলতা চলে এসেছে। এসব কারণে বাংলাদেশেও পুনরায় করোনা সংক্রমণের আশঙ্কায় 'নতুন স্বাভাবিক' জীবনে ফেরাটা একটি চ্যালেঞ্জ বটে। দ্বিতীয় দফার সংক্রমণ প্রতিরোধের পাশাপাশি সংক্রমণ আবারও প্রকট আকার নিলে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পূর্ণ প্রস্তুতি এবং নতুন যোগাযোগ কৌশল নিয়ে এখনই আমাদের ভাবা দরকার।

শিক্ষক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
rajibndy@gmail.com


© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com