কালীগঞ্জের সেই রাস্তার নির্মাণকাজ বন্ধ

১৬ অক্টোবর ২০২০

জামির হোসেন, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ)

সম্প্রতি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ ডাকবাংলো সড়কে কাজ শেষের সাত দিনের মধ্যেই এভাবে উঠে যায় পিচ - সমকাল

নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ছাড়াও নানা অনিয়মের সত্যতা পাওয়ায় কালীগঞ্জের সেই আলোচিত সড়কটির নির্মাণকাজ বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ। দুই সপ্তাহ আগে কাজ বন্ধের নির্দেশনা পেয়ে রাস্তাতেই নির্মাণসামগ্রী ও যন্ত্রপাতি রেখে চলে গেছেন শ্রমিকরা। নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই ঠিকাদারের লোকজন ভেকু দিয়ে নিম্নমানের কিছু পিচ তুলে কৌশলে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। সে সময়ে স্থানীয়দের বাধার মুখে তারা কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। রাস্তার কাজ বন্ধ থাকায় নিজেরা দুর্ভোগে পড়েছেন বলেও জানান এলাকাবাসী। তারা দ্রুত সঠিক উপায়ে রাস্তাটি ফের সংস্কারের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন।

রাস্তাটিতে পুরোনো ইট-খোয়া ছাড়াও নিম্নমানের ইট দিয়ে ম্যাকাডম কাজ সম্পন্ন করার অভিযোগ ওঠে। তার ওপরে নিম্নমানের পিচ কার্পেটিং ঢালাই করার কারণে সাত দিনের মাথায় সেই পিচ উঠে যায়। সড়ক ও জনপথ বিভাগের ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এ রাস্তাটির বেহাল অবস্থার খবর সমকালে প্রকাশ হলে টনক নড়ে সংশ্নিষ্টদের। ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন সড়ক ও জনপথ ঝিনাইদহের নির্বাহী প্রকৌশলী, কালীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যশোর টিম, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের তদন্ত টিম। তাদের সবাই সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে রাস্তাটি নির্মাণে ত্রুটি হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।

সোমবার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, ঘটআমতলা বাজার নামক স্থানে ফিডার রাস্তার পাশেই কাজের পিচ ঢালাই মেশিন, রুলার ও যানবাহনগুলো পড়ে আছে। সেখানে উপস্থিত স্থানীয় লোকজন বলেছে, ১০-১২ দিন আগে ওই শ্রমিকরা যন্ত্রপাতিগুলো রেখে চলে গেছেন। এখন ওই বাজারেরই নাইটগার্ড এগুলো দেখভাল করছেন। রাস্তাসংলগ্ন কমলাপুর গ্রামের মোশারেফ হোসেন বলেন, এত নিম্নমানের রাস্তা তৈরি তারা জীবনেও দেখেননি। ঠিকাদারের লোকজন এই রাস্তারই পুরোনো ইট-খোয়া তুলে সেগুলোই রাস্তায় ব্যবহার করেছে।

স্থানীয় অনেকের অভিযোগ, রাস্তাটির নির্মাণকাজের ঠিকাদার ঝিনাইদহের মিজানুর রহমান মাসুম প্রভাবশালী ব্যক্তি। সড়ক ও জনপথ বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে তার সখ্য রয়েছে। তিনি যেখানেই কাজ করেন, সেই এলাকার প্রভাবশালীদেরও ম্যানেজ করে নেন। নিয়ম অনুযায়ী সরকারি কাজ শুরুর আগে রাস্তার নকশার সাইনবোর্ড প্রদর্শন করতে হয়। সেটাও করেননি ঠিকাদার মাসুম।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দরপত্রে ওই রাস্তার কাজ পায় খুলনার মুজাহার এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু হাতবদল হয়ে কাজটি চলে যায় ঝিনাইদহের ঠিকাদার মিজানুর রহমান মাসুম মিয়ার হাতে। রাস্তার কাজের সর্বশেষ অবস্থা জানতে গত রোববার তার মোবাইলে কয়েকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। একই দিন সড়ক ও জনপথ বিভাগের ঝিনাইদহ নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হায়দারের মোবাইলে ফোন দেওয়া হলে অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, তিনি অফিসের বাইরে আছেন।

কালীগঞ্জ থেকে গান্না হয়ে ঝিনাইদহের ডাকবাংলো পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার এ রাস্তার সংস্কারকাজ চলছে তিন বছর ধরে। এরই মধ্যে তিন কিলোমিটার পিচ কার্পেটিং কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু সাত দিনের মধ্যে ওই সড়কের শ্রীরামপুর এলাকার প্রায় এক কিলোমিটার অংশে পিচ উঠে যায়। কোথাও কোথাও বড় ফাটলের সৃষ্টি হয়। গণমাধ্যমে এর সংবাদ প্রকাশ হলে ইউএনও সুবর্ণা রানী সাহা এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের ঝিনাইদহ নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হায়দার রাস্তাটি পরিদর্শনে আসেন। তারা নির্মাণে ত্রুটির কথা স্বীকার করে খারাপ অংশটি তুলে পুনরায় নতুন করে রাস্তার কাজের জন্য ঠিকাদারকে নির্দেশ দেন। এরপর গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাস্তাটি দেখতে আসেন দুদকের যশোর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক নাজমুস সাদাত। তখন সাংবাদিকদের তিনি জানিয়েছিলেন, সড়কটিতে অতি নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। এ কারণেই পিচ উঠে যাচ্ছে। এমন অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দুদক যথাযথ ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান তিনি। পরবর্তী সময়ে রাস্তাটির অনিয়ম তদন্তে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। গত ৯ অক্টোবর ঢাকা থেকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপসচিব আবদুল মোক্তাদের নেতৃত্বে দুই সদস্যের তদন্ত টিম কালীগঞ্জে আসে। তারা রাস্তার নমুনা সংগ্রহ করেন। শিগগিরই অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন তারা।



© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)