সীমানায় সম্প্রীতির বাঁশঝানি মসজিদ

১৭ অক্টোবর ২০২০ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২০

গোলাম মওলা সিরাজ, নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম)

দেশের সীমান্তজুড়ে হত্যা, নির্যাতন আর মাদক পাচার যখন প্রতিদিনের সংবাদ, দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের শান্তি আলোচনা যখন শুধুই প্রহসন, তখনও শান্তি খোঁজে সীমান্তবাসী। কিন্তু সীমান্তের বর্বরতা যেন কিছুতেই থামছে না।

এ অবস্থায় সীমান্তে নজির স্থাপন করেছে একটি মসজিদ। যে মসজিদে দিনের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ একসঙ্গে আদায় করেন দুই দেশের মানুষ। দিনে পাঁচবার ছাড়াও শুক্রবার তারা একসঙ্গে জুমার নামাজ আদায় শেষে দোয়া করেন সমস্ত মানবজাতির জন্য। সীমান্তে শান্তি ফিরে আসার প্রার্থনায় রত হন দুটি দেশের মুসল্লিরা। নামাজ শেষে আবার দুটি রাষ্ট্রের মানুষ ভাগ হয়ে যান। ফিরে যান নিজ নিজ দেশে। দেশের সর্বউত্তরের জেলা কুড়িগ্রাম। এ জেলারই উত্তর সীমান্ত লাগোয়া উপজেলা ভূরুঙ্গামারীর পাথরডুবি ইউনিয়নের বাঁশঝানি সীমান্তে প্রায় ২০০ বছর আগে নির্মিত এ মসজিদ। নাম বাঁশঝানি মসজিদ।

এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠরা জানান, ব্রিটিশ আমলে নির্মিত হয় এ মসজিদ। ১৯৪৭-এ দেশে ভাগ হলে সীমান্ত এলাকায় পড়ে মসজিদটি। একটি গ্রামকে আলাদা করে দেয় দুটি দেশের মানচিত্র। পূর্ব পাকিস্তানের গ্রামটির নাম হয় ঝাকুয়াটারি। পরে যা হয় বাংলাদেশের একটি গ্রাম। অন্যদিকে, ভারতের অংশের এলাকার নাম রাখা হয় ছোট গাড়লঝোড়া। ভারতের কোঁচবিহার জেলার দিনহাটা থানার অধীন ছিল এলাকাটি। কয়েক বছর আগে সাহেবগঞ্জ থানার অন্তর্ভুক্ত হয় এলাকাটি।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের আন্তর্জাতিক ৯৭৮ নম্বর মেইন পিলারের সাব-পিলার ৯ এসের পাশে আধাপাকা মসজিদটির কিছুটা অংশ ভারতে। বেশিরভাগ বাংলাদেশের জমিতে।  তবে সীমান্তবর্তী হওয়ায় মসজিদটির অবকাঠামোগত কোনো উন্নয়ন হয়নি আজও। মুসল্লিদের দানের টাকায় কোনো রকমে সংস্কার হয় প্রয়োজন পড়লে।

স্থানীয়রা জানান, মসজিদটি এখন দুই দেশের মধ্যে শান্তির প্রতীক। দুটি আলাদা রাষ্ট্রের মানুষ একসঙ্গে প্রার্থনায় রত হন। প্রতিদিন কুশল বিনিময় হয় তাদের।

কথা হয় মসজিদের মুয়াজ্জিন বাঁশঝানি গ্রামের বাসিন্দা নজরুল মিয়ার সঙ্গে। জানালেন, 'ছোট বয়সে বাপ-দাদার হাত ধরে নামাজ পড়তে এসেছি। এখন আজান দিই। আজানের ধ্বনিতে দুই দেশের মুসল্লিরা ছুটে আসেন, একসঙ্গে নামাজ পড়েন। মসজিদ থেকে বের হয়ে কোলাকুলি করেন। একে অপরের পরিবারের খোঁজ-খবর নেন।'

দু'দেশের মানুষ একসঙ্গে নামাজ পড়ায় ভালো লাগা সত্যিই অন্যরকম উল্লেখ করে মসজিদের ইমাম আবুবক্কর সিদ্দিক বলেন, শুক্রবার জুমার দিনে মসজিদ প্রাঙ্গণ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। এক দেশ থেকে তবারক বা মিষ্টি নিয়ে আর এক দেশের মানুষ খায়।

ভারতের ছোট গাড়লঝোড়া থেকে আসা মুসল্লি খয়বর আলী বলেন, ২০০ বছরের পুরোনো মসজিদ। কিন্তু সীমান্তে হওয়ায় কোনো বরাদ্দ আসে না। স্থানীয়রা উদ্যোগ নিলেও আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতায় তা বাস্তবায়ন হয় না। অথচ দুই দেশের সরকার মিলে মসজিদটির উন্নয়ন করলে এটি হতে পারে একটি দর্শনীয় স্থান।

মসজিদ কমিটির সম্পাদক বাংলাদেশের অংশের বাসিন্দা কফিলুর রহমান বলেন, 'কয়েক পুরুষ ধরে একই সমাজে আমরা দুই দেশের মানুষ। সীমান্তে চলাচলে কোনো জটিলতা নেই। তবে মসজিদটি পাকারণের জন্য সরকারের সহায়তা চাইলেই সীমান্ত জটিলতা সামনে চলে আসে।'

মসজিদটির উন্নয়নের অন্তরায় কী? জানতে চাইলে পাথরডুবি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর মিঠু বলেন, আন্তর্জাতিক আইনে সীমান্তে ভবন নির্মাণের সুযোগ নেই। তবে মসজিদের বিষয়টি সেভাবে দেখার জন্য সংশ্নিষ্টদের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে। এ জনপ্রতিনিধি আরও বলেন, মসজিদটি সারাদেশের সীমান্তে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা রোধে দৃষ্টান্ত হতে পারে। দুই দেশের সীমান্তরক্ষীসহ সংশ্নিষ্ট কর্তারা এখান থেকে ধারণা নিতে পারেন, সীমান্ত মানেই হত্যা বা নির্যাতন নয়, হতে পারে বন্ধন আর সম্প্রীতির উদাহরণ।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)