নির্যাতনে অতিষ্ঠ নড়াইল শিশু পরিবারের এতিমরা, ডিসি কার্যালয় ঘেরাও

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০ । ২০:৪৪ | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০ । ২১:১৮

নড়াইল প্রতিনিধি

নড়াইল সরকারি শিশু পরিবারের শিশুরা-সমকাল

'পুলিশ বলেছে, তোরা গাঁজা ও ফেনসিডিলখোর, জঙ্গি-সন্ত্রাসী হবি। কখনও মানুষ হতে পারবি না। ছোট থেকে বড় সবাই তোরা খারাপ।' পুলিশের বিরুদ্ধে এমন ভয়ংকর অভিযোগ ছাড়াও নানা সময়ে কর্তৃপক্ষের নির্যাতনে অতিষ্ঠ নড়াইল সরকারি শিশু পরিবারের এতিম নিবাসী শিশুরা। নির্যাতন থেকে মুক্তি পেতে সোমবার সকালে তারা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করে। পরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমাধানের আশ্বাস পেয়ে তারা চলে যায়।

সোমবার দুপুরে নড়াইল সরকারি শিশু পরিবারে গেলে নবম শ্রেণির ছাত্র মো. তৌফিক, সপ্তম শ্রেণির আসিফ গাজী, ষষ্ঠ শ্রেণির রবি, মুন্না, প্রিন্স ও চতুর্থ শ্রেণির হুসাইন সমকালকে বলে, সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সোহান সিকদার ১০-১২ দিন ধরে অসুস্থ। তার জরুরি চিকিৎসার জন্য রোববার রাত ১০টার দিকে নিচে গেটের সামনে গিয়ে দেখি গেট বন্ধ। ডাকাডাকি করে কাউকে না পেয়ে কাচের জানালার ফাঁক দিয়ে নিচে নেমে কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়ে সোহানের চিকিৎসার দাবি জানাই। এটাই ছিল আমাদের অপরাধ। রাত ২টার দিকে কর্তৃপক্ষ দুই পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের ঘুম থেকে ডেকে তুলে কান ধরায় এবং চড়থাপ্পড় মারে। আমরা নাকি হইচই ও শব্দ করেছি এবং চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করেছি। এসব আমরা কিছুই করিনি।

তারা আরও অভিযোগ করে, আমাদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষ প্রায়ই অসদাচরণ করে। কিছু হলেই নাম কেটে দেওয়ার ভয় দেখায়। মৈত্রী মণ্ডল নামে এক কারিগরি প্রশিক্ষক প্রায়ই আমাদের জন্য বরাদ্দকৃত বিস্কুট, মুড়ি, চানাচুর নিয়ে যান। আমাদের দিয়ে উপতত্ত্বাবধায়ক ঘরের মেঝে পরিষ্কার করান এবং ময়লা ফেলার কাজ করান। বর্তমান উপতত্ত্বাবধায়ক দুই বছর আগে এখানে আসার পর থেকে এ সমস্যা শুরু হয়েছে। তারা আরও বলে, ডরমিটরিতে ৩০টি ফ্যানের মধ্যে সাতটি নষ্ট। অনেকগুলো আস্তে আস্তে ঘোরে। জগ নেই, গ্লাস নেই। দুপুরের রান্না করা খাবার রাতে খেতে দেয়। ফলে অনেক সময় খাবার নষ্ট হয়ে যায়।

সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সোহান সিকদার জানায়, সে ১০-১২ দিন ধরে অসুস্থ। গলাব্যথা, সর্দি-কাশি রয়েছে। শুধু নাপা খেতে দেয়। আর একটি কাশির সিরাপ দিয়েছে। এতে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। সিরাপ খেলে মাথা ঘোরে। রোববার রাতে প্রতিবাদের কারণে এতদিন পর সদর হাসপাতালে চিকিৎসক দেখাতে নিয়ে গেছে।

চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র সৌরভ মোল্যা বলে, এক মাস ধরে তার ডান হাতে চুলকানি- একজিমা ধরনের সমস্যা হয়েছে। তাকে ঠিকমতো ওষুধ দেওয়া হচ্ছে না। ষষ্ঠ শ্রেণির আল মামুন জানায়, এক মাস ধরে তার হাতের আঙুল কেটে গেলেও চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। জোবায়ের মোল্যার অভিযোগ, একবার ডিশ লাইনের তার দিয়ে উপতত্ত্বাবধায়ক তাকে পিটিয়েছিলেন।

এসব অভিযোগ সম্পর্কে সরকারি শিশু পরিবারের উপতত্ত্বাবধায়ক আসাদুল্লাহ বলেন, আমরা তাদের সঙ্গে সব সময় ভালো ব্যবহার করি। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর থেকে তারা এমন উচ্ছৃঙ্খল আচরণ শুরু করেছে। তাদের কিছু দিন খেলতে বা সাঁতার কাটতে না দেওয়ায় এমনটা হতে পারে। রোববার রাতে নিবাসীরা লাঠি নিয়ে বের হয় আমাকে মারার জন্য। রাতে সমাজসেবার উপপরিচালকের অনুমতি নিয়ে পুলিশ ভেতরে প্রবেশ করে তাদের বুঝিয়েছে। কোনো মারধর করেনি।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক রতন হালদার বলেন, শিশুরা একটু উচ্ছৃঙ্খল হয়ে গেছে। রোববার রাতে তারা ডরমিটরির চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করেছে। টহল পুলিশ শব্দ টের পেয়ে আমাদের অনুমতি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। কাউকে মারধর করেনি। তাদের দিয়ে কাজ করানো, খেলতে না দেওয়া, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কথা অস্বীকার করেন তিনি।

জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা বলেন, শিশুরা তাদের কিছু সমস্যার কথা জানিয়েছে। দুই পক্ষের কাছ থেকে বিভিন্ন অভিযোগ শোনা হয়েছে। কীভাবে এর সুষ্ঠু সমাধান করা যায় সেটা দেখছি।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com