প্রকৃতি আর মানবতার স্বজন

গাজীপুর

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইজাজ আহ্‌মেদ মিলন

বজ্রপাত থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য তালের চারা রোপণ কার্যক্রম

নদীনালা, খালবিল কিংবা গভীর অরণ্য ধ্বংসের নগ্ন উল্লাসে যখন মেতে আছে দস্যুরা, ঠিক তখনই গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার চকপাড়া গ্রামের তরুণ সাঈদ চৌধুরী সেইসব প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার জন্য আন্দোলন করে চলছেন বছরের পর বছর।

প্রকৃতিকে তার আপন গতিতে চলতে দেওয়ার আকুতি সাঈদ চৌধুরীর সেই ছোটবেলা থেকেই। বন, বনভূমি, নদীনালা, খালবিল রক্ষার আন্দোলন করেই তার কাজ শেষ নয়; সমমনা একদল তরুণকে নিজের দলে ভিড়িয়ে মানুষকে বইমুখী করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সভা-সেমিনার, মানববন্ধন, সমাজের সহায়-সম্বলহীন মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়লে তার পাশে দাঁড়ানোসহ নানা কাজ করে চলছেন।

নদীনালা দূষণ ও ভরাট করে সেগুলো বিনাশ আর প্রকৃতিকে ধ্বংস করে সেখানে বসতি স্থাপন করার বিপক্ষে সাঈদ চৌধুরীর অবস্থান বলেই বারবার তিনি প্রতিবাদে নেমেছেন। আন্দোলন করেছন শ্রীপুরের ঐতিহ্যবাহী লবণদাহ খাল, শীতলক্ষ্যা ও তুরাগ নদ রক্ষার জন্য। জলজ প্রকৃতি ও জল পরিবেশ নিয়ে কাজ করার কারণেই বছর দুই আগে তিনি যুক্ত হন বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের সঙ্গে। শ্রীপুর শাখার সভাপতিও করা হয় তাকে। উদ্যমী একদল তরুণকে সঙ্গে নিয়ে বন ও বনভূমি এবং নদীনালা রক্ষায় নিরলস কাজ করে চলছেন সাঈদ চৌধুরী। তিনি বলেন, শ্রীপুর অঞ্চলটি নৈসর্গিক সবুজে ঘেরা। লবণদাহ, পারুলী, শীতলক্ষ্যা, সুতিয়াসহ বিভিন্ন খাল এবং নদীর বাঁকে বাঁকে মিশে থাকত প্রাকৃতিক জলজ সম্পদ ও মিঠাপানির সমারোহ। আজ সেসব শুধুই গল্পতেই শোভা পায়। বাস্তবে সেই দৃশ্য ফিরিয়ে আনার জন্যই তার এ কাজ করে যাওয়া।

২০০৫ সালে তখন তিনি কেবল এইচএসসি পাস করেছেন। প্রতিষ্ঠা করেন গ্রাম্য পাঠাগার। পাঠাগারের কর্মসূচি প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নাম দেন পল্লি উন্নয়নভিত্তিক পাঠাগার। ষাট সদস্য নিয়ে পাঠাগারের যাত্রা শুরু হয় এবং ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে এই পাঠাগারের কাজ। বিভিন্ন স্কুল, মাদ্রাসায় সাধারণ জ্ঞানের পরীক্ষা, দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা করানো ও অসহায়দের সহায়তায় দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে পাঠাগারটি। একসময় দুর্নীতিবিরোধী কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় পাঠাগারটি। উপজেলার বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে কথা বলা খলিলুর রহমান মাস্টারের ছেলে সাঈদ চৌধুরী অতি অল্প সময়ে হয়ে ওঠেন অধিকার আদায়ের পরিচিত মানুষ। ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, নদীর প্রবাহ সমস্যা, নদীর দখল, দূষণে বা প্রকৃতির কোনো ক্ষতিসাধন দেখলেই কোনো ব্যানার ছাড়াই কখনও কখনও দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছেন। তার কলমও রয়েছে সচল। ১৯৮৬ সালের ২২ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া সাঈদ চৌধুরী ২০০৮ সালে রসায়ন বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

অসহায় বহু অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার জন্য এগিয়ে এসেছেন তিনি। পুরোপুরি সামর্থ্য না থাকলেও নিজের গ্রহণযোগ্যতার পাখায় ভর করে আহ্বান জানিয়েছেন সমাজের বিত্তশালীদের। সাড়াও পড়েছে ব্যাপক। এভাবে ফান্ড গঠন করে চিকিৎসা করিয়েছেন অনেকেরই। ভয়াল করোনার সময় বিশ্ব থেমে যায়। মানুষ বাইরে বের হতেই পারেনি, স্থবির ব্যবসা-বাণিজ্য, সেবার বিভিন্ন খাত। সাঈদ চৌধুরী বলেন, অক্সিজেনের অভাবে আমরা দেখলাম মানুষের কী পরাজয়! বাবাকে ট্রলিতে করে ছেলে নিয়ে যাচ্ছে অথচ অক্সিজেন মুখে দেওয়া যাচ্ছে না সিলিন্ডারের অভাবে। ঠিক এমন একটি সময়েও পুরো দল নিয়ে দাঁড়িয়ে যান। তিনি অক্সিজেন সিলিন্ডার ক্রয়ের জন্য অর্থ সংগ্রহ শুরু করেন। সমাজের সব মানুষকে এমনভাবে এক সমান্তরালে নিয়ে এলেন সবাই এ উদ্যোগকে স্বাগত জানালেন। এই উদ্যোগের সঙ্গে যোগ হয় রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, ব্যবসায়ীসহ সমাজের সব স্তরের মানুষের সহযোগিতা ও আন্তরিকতা। একটি সময় গিয়ে এই উদ্যোগের একটি নামকরণ করা হয়। 'প্রশ্বাস' নামে যখন এই উদ্যোগ সারা শ্রীপুরে ছড়িয়ে পড়ে তখন চারটি ছোট অক্সিজেন সিলিন্ডার ও একটি বড় অক্সিজেন সিলিন্ডার তাদের সংগ্রহে চলে আসে। এরই মধ্যে এই সেবা নিয়ে পাঁচজন করোনা রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি যায়। বড় সিলিন্ডারটি দেওয়া হয়েছে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সেখান থেকে সেবা নিচ্ছেন অনেক রোগী।

সম্প্রতি সাঈদ চৌধুরী লবণদাহ খালের দু'পাড়ে কয়েকশ তালের বীজ বপন করেছেন। বজ্রপাত থেকে মানুষজনকে রক্ষার জন্যই তার এ উদ্যোগ। সাঈদ চৌধুরীর এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয় পিয়ার আলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের স্কাউট টিম।

লেখক: গাজীপুর প্রতিনিধি

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com