করোনা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছেন বিদেশি ক্রেতারা: টিআইবি

প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০ । ২২:১১

সমকাল প্রতিবেদক

বৈশ্বিক করোনায় সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে দেশের তৈরি পোশাক খাতের। শতভাগ রপ্তানিপণ্য হওয়ায় সরবরাহ চেইনে দুই দিক থেকেই এ খাতের ক্ষতি হয়েছে। একদিকে রপ্তানি বাজারে চাহিদা কমেছে; অন্যদিকে কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হওয়ায় দেশে উৎপাদন বিঘ্নিত হয়েছে। বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো রপ্তানি আদেশ বাতিল করার ফলে অনেক শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন।

'তৈরি পোশাক খাতে করোনা ভাইরাস উদ্ভূত সংকট : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়' বিষয়ক জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে  বৃহস্পতিবার এ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। 

এতে বলা হয়, এ সময় বিদেশি ক্রেতারা শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করেননি। সংকটকালে নৈতিক দায় এড়িয়ে গেছেন তারা। বরং কারখানা মালিকদের নানামুখী চাপে রাখার মতো নীতিহীন বাণিজ্য করার প্রবণতা দেখা গেছে তাদের ভেতর। পণ্যের মূল্যে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দাবি করেছে তারা। অর্থ পরিশোধেও ছয় মাস পর্যন্ত সময় চাওয়া হয়েছে। অর্থাৎ অধিকাংশ ক্রেতা প্রতিষ্ঠান করোনা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে জরিপে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হয়। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানসহ সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, করোনা সংকটের কারণে তৈরি পোশাক খাতে সুশাসনের ঘাটতি আরও ঘনীভূত হয়েছে। তৈরি পোশাক উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থাপনা একদিকে যেমন ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, অপরদিকে কারখানা লে-অফ ঘোষণা, শ্রমিক ছাঁটাই, মাতৃত্বকালীন সেবা থেকে বঞ্চিত করাসহ শ্রমিক অধিকার নিশ্চিতে সংশ্নিষ্ট অংশীজনের ব্যর্থতা আগের তুলনায় আরও বেড়েছে। তিনি বলেন, মহামারির শুরুতে বৈশ্বিক বাণিজ্যের নজিরবিহীন সংকোচনের কারণে বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিতে অবস্থানকারী দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়। ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে ক্রেতারা ৩১৮ কোটি ডলার মূল্যের চলমান ক্রয়াদেশ স্থগিত বা বাতিল করে। এপ্রিল মাসে পোশাক রপ্তানি প্রায় ৭৮ শতাংশ কমে যায়, যা জুন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ৪১৮টি কারখানা এ সময় সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এসব কারখানার শ্রমিকরা কাজ হারান। রপ্তানি আদেশ বাতিল, মালিকপক্ষের আর্থিক সক্ষমতা না থাকার যুক্তি এবং কারখানা বন্ধের কারণে শ্রমিকদের মজুরি দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এ সময় বিদেশি ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করেননি। এ বিষয়ে করণীয় বিবেচনার জন্য সরকার এবং উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএর প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।

টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, পোশাক খাতের চলমান ঝুঁকি নিরসনে সরকার, ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা মহামারির সময় বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। সরকার এবং মালিকপক্ষের বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ শ্রমিক অধিকার ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যেই শ্রমিকদের মজুরি ও ভাতা না দেওয়া, লে-অফ ঘোষণা, শ্রমিক ছাঁটাই, স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত না করা ইত্যাদি অভিযোগ পাওয়া গেছে। করোনায় উদ্ভূত সংকট মোকাবিলায় সরকারি প্রণোদনা মালিকপক্ষের ব্যবসায়িক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে। শ্রমিকরা এ প্যাকেজের খুব সামান্য সুবিধাই পেয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার ঘোষিত ৬২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ৮৪ শতাংশ অর্থই গেছে মালিকদের সহায়তায়। শ্রমিকরা পেয়েছেন মাত্র ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ। জরিপ অনুযায়ী, প্রণোদনা থেকে সুবিধা পাননি ৪২ দশমিক ২ শতাংশ শ্রমিক। এদের সংখ্যা ১৪ লাখ। এমনকি শ্রমিকরা যথাসময়ে তাদের মজুরি পাননি। অভিযোগ রয়েছে, লে-অফ হওয়া ৬৪ কারখানার ২১ হাজার শ্রমিক বেতন-ভাতা পাননি। এ ছাড়া সাবকন্ট্রাক্টের তিন হাজার কারখানার ১৫ লাখ শ্রমিকের বেতন-ভাতা অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। আবার প্রণোদনার অর্থপ্রাপ্তিতে বড় কারখানা অগ্রাধিকার পেয়েছে; রাজনৈতিক প্রভাব এবং তদ্বিরের অভিযোগও রয়েছে। প্রাথমিক দুর্যোগ কাটিয়ে উঠে তৈরি পোশাক খাত ঘুরে দাঁড়ানোর মুহূর্তে বিশ্বে করোনা সংকটের দ্বিতীয় পর্যায়ের সংক্রমণ বেড়ে চলেছে। এ অবস্থায় আগের ঝুঁকিগুলো আরও প্রকট আকারে দেখা দেওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

করোনাকালে পোশাক খাতের সুশাসনের ঘাটতি চিহ্নিত করতে পরিচালিত এ জরিপের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন সময়ে সুশাসনের ঘাটতি উঠে এলেও তা নিরসনে সরকার ও মালিকপক্ষের সদিচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি করোনায় আরও প্রকট হয়েছে। চার দশক ধরে বিকশিত তৈরি পোশাক খাত এখনও প্রণোদনার ওপর নির্ভরশীল। মালিকপক্ষ সরকারের ওপর প্রভাব ও চাপ প্রয়োগ করে নিজেদের সুবিধা আদায় করে। করোনার মতো সংকট মোকাবিলায় এ খাতের নিজস্ব সক্ষমতা এখনও তৈরি হয়নি। সংকটের প্রাথমিক পর্যায়ে শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনায় না নিয়ে শুধু ব্যবসায়িক স্বার্থে আইনের অপব্যবহারের মাধ্যমে কারখানা লে-অফ ঘোষণার প্রবণতায় পোশাক খাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়। গত মে মাস থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে জরিপটি পরিচালনা করেছে টিআইবি। 

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতা, বিভিন্ন কারখানার মালিক ও কর্মকর্তা, শ্রমিক, শ্রমিক নেতা, ক্রেতা জোটের প্রতিনিধি, গবেষক এবং দেশি-বিদেশি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে জরিপ পরিচালনা করা হয়। গবেষণা পরিকল্পনা ও প্রতিবেদন প্রণয়ন করেন টিআইবির গবেষক নাজমুল হুদা মিনা এবং নূরে আলম মিল্টন।

সুপারিশে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, টিআইবির এ গবেষণা তৈরি পোশাক খাতে করোনাভাইরাস উদ্ভূত সংকট মোকাবিলায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করতে এবং তা থেকে উত্তরণে সহায়ক হবে। তৈরি পোশাক খাতসংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা এ গবেষণার সুপারিশের আলোকে মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেবেন বলে টিআইবি আশা করছে। প্রতিবেদনে মহামারিকে বিবেচনায় নিয়ে সব শ্রেণির শ্রমিকের চাকরির নিরাপত্তা বিধানে শ্রম আইন সংশোধন, পোশাকের ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নৈতিক ব্যবসা পরিচালনায় অঙ্গীকারবদ্ধ করাসহ বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com