ইউটিউবের দখলে টিভি নাটক

প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০ । ১১:২৬ | আপডেট: ২৪ ডিসেম্বর ২০ । ১৭:২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

সালাহউদ্দিন লাভলু

শতাব্দীর অন্যতম দুঃসময় বলতে হয় ২০২০ সালকে। নাটক, চলচ্চিত্র, শিল্প-সাহিত্য, অর্থনীতি, রাজনীতি সব ক্ষেত্রেই এই বছরটিকে ওলাট-পালট করে দিয়েছে কভিড-১৯। ২০২০ সালের শুরুতে অনেক প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ ও অভিজ্ঞ নির্মাতা নতুন ভাবনা নিয়ে কাজের চেষ্টা করছিলেন। কাহিনী, নির্মাণশৈলী ও উপস্থাপনা রীতিতেও নতুনত্বের ছোঁয়া পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎই কভিড-১৯ সব থামিয়ে দিল। দীর্ঘসময় ঘরবন্দি, কর্মহীন করে রাখল আমাদের। এখনও থেমেই আছি। থেমে থাকতেই হচ্ছে; কারণ করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। কারণ আমাদের টিভি নাটক নির্মাণ করতে হয় দলবদ্ধভাবে। তারপরও সীমিত পরিসরের মধ্যে আমাদের অনেক নির্মতা কাজ করছেন।

টিভি নাটক কায়েক যুগ ধরে বাংলাদেশের দর্শকদের কাছে একটি অবশ্যম্ভাবী প্রাত্যহিক বিনোদন মাধ্যম। শুধু বিনোদন বললে ভুল হবে, অনেক ক্ষেত্রে আমাদের মনন গঠনে, মূল্যবোধ তৈরিতেও টেলিভিশন নাটক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে টেলিভিশন নাটক কেমন যেন বদলে যেতে শুরু করে। শিক্ষণীয়, নান্দনিক বোধ, সৃজনশীলতা থেকে সরে এসে টিভি নাটক শুধু একটি বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে আবির্ভূত হতে থাকে। সৃজনশীল মানুষ, যারা টিভি নাটকের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারা এই বদলে যেতে থাকা 'পণ্য নাটক' থেকে নিজেদেরকে সরিয়ে নিতে থাকেন। বলা যায়, সরে যেতে বাধ্য হন। শিল্পমনা মানুষের জায়গা দখল করে নেন নিরেট ব্যবসায়ীরা। এই প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে বেশ অনেক বছর আগে থেকেই। আমরা অনেকে এটা বুঝেও না বোঝার ভান করেছি। ২০২০ সালে এসে এই বাণিজ্যিক আগ্রাসনটা যেন চূড়ান্ত আকার ধারণ করে। টেলিভিশন যেহেতু ঘরোয়া বিনোদনমাধ্যম তাই টেলিভিশন নাটকের বিষয়বস্তু, কাহিনি বিন্যাস, উপস্থাপনরীতি সেই আঙ্গিকেই করা হতো। চ্যানেলগুলোতে প্রোগ্রাম ডিপার্টমেন্ট ছিল, মার্কেটিং ডিপার্টমেন্ট ছিল, ছিল নাটক প্রিভিউয়ের প্রক্রিয়া।

হঠাৎ উধাও হয়ে গেল প্রিভিউ প্রক্রিয়া। এ বছরই প্রত্যক্ষ করলাম, বেশিরভাগ টিভি চ্যানেলের নাটকের চাংক বিক্রি হয়ে যাচ্ছে এজেন্সি নামক মাধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে। তারাই নির্ধারণ করছে কী নাটক হবে, কে নির্মাণ করবেন আর কারা অভিনয় করবেন। সবকিছুর নির্ধারক তারা। তাদের মূল উদ্দেশ্য শুধুই ব্যবসা। শিল্প-সাহিত্যের নির্ধারক হবেন শিল্পী-সাহিত্যিকরা কিন্তু তা না হয়ে যদি নির্ধারক হন ব্যবসায়ীরা তাহলে সে শিল্পের অবস্থা কেমন হয় সেটা এখনই আমরা বুঝতে পারছি। দর্শক মূখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, নিয়েছে টেলিভিশন নাটক থেকে। একটা সময় যা ছিল আমাদের গর্বের। এখন আবার যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন প্ল্যাটফর্ম। ইউটিউব, ওয়েব, ওটিটি নানা ধরনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। যদিও প্রতিটি প্ল্যাটফর্মের আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে কিন্তু আমরা সব গুলিয়ে ফেলছি। যে নাটকটি টেলিভিশনের জন্য নির্মিত হচ্ছে, সেটাই টিভিতে প্রচারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইউটিউবে দেখা যাচ্ছে। তা হবে কেন? এমনটা হলে দর্শক কেন টেলিভিশনে নির্দিষ্ট সময়ে নাটকটি দেখবে, সে তো তার সময় অনুযায়ী যে কোনো সময় বিজ্ঞাপনের যন্ত্রণাবিহীন ইউটিউবে নাটকটি দেখবে। ডিজিটাল অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের নাটক থেকে টিভি নাটক অবশ্যই আলাদা। আলাদা হতে হবে। আমাদের দেশের চেয়ে অনেক আগেই অনেক দেশেই তো এসব অনলাইন প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সেসব দেশে তো টিভি চ্যানেল বন্ধ হয়ে যায়নি। আমাদের পাশের দেশের চ্যানেলগুলো তো আগের মতোই চলছে।

আমাদের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর কর্তৃপক্ষকে এই নতুন বাস্তবতায় নতুন করে ভাবতে হবে। একক নাটকের পরিবর্তে দীর্ঘ ধারাবাহিক নাটকের প্রতি জোর দেওয়া উচিত। দীর্ঘ ধারাবাহিক নাটকের মাধ্যমে দর্শক তৈরি ও ধরে রাখা সহজ। একটি একক নাটকের মাধমে হুট করেই ভূঁইফোঁড় প্রযোজক, পরিচালক উদয় হতে পারে কিন্তু দীর্ঘ ধারাবাহিক নাটক করতে হলে সত্যিকার অর্থেই একজন প্রযোজক যার পর্যাপ্ত অর্থ আছে বিনিয়োগের জন্য। একজন পরিচালক যার শতাধিক পর্ব নাটক নির্মাণের যোগ্যতা, মেধা, টেম্পারমেন্ট থাকতে হবে, যে শুধু একজন ক্যামেরাম্যান ও সম্পাদকনির্ভর পরিচালক হবেন না। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের বেলায়ও একই কথা প্রয়োজ্য, কারণ শুধু শখের বসেই না, প্রফেশনাল যোগ্যতা নিয়েই তাকে অভিনয়ে আসতে হবে। এভাবে দেশে একটি প্রফেশনাল শিল্পী-কলাকুশলী গোষ্ঠী তৈরী হতে পারে দীর্ঘ ধারাবাহিক নাটকের মাধ্যমে।

পরিশেষে বলব, ২০২০ সাল একদিকে যেমন ওলট-পালট করেছে আমাদের চলার ছন্দকে, তেমনি অনেক নতুন উপলব্ধির জায়গাও তৈরি করে দিয়েছে। এই উপলব্ধি কাজে লাগিয়ে নতুন সৃষ্টির পথে হাঁটব- আমাদের এটাই প্রত্যাশা।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com