সাক্ষাৎকার: আব্দুল কাইয়ুম

বঙ্গবন্ধু সংগ্রামের গতিপথ তৈরি করেছিলেন

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০ । ১৭:৪১ | আপডেট: ২৭ ডিসেম্বর ২০ । ১৫:৩৪

সাক্ষাৎকার গ্রহণ তপোব্রত মুখার্জী

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাইয়ুম মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা থানা স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কসবা থানা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ভারতের সাংবাদিক তপোব্রত মুখার্জী

তপোব্রত মুখার্জী: মুক্তিযুদ্ধে আপনি যখন অংশগ্রহণ করেন তখন আপনার বয়স কত ছিল?

আব্দুল কাইয়ুম: তখন বয়স ছিল ২৩ বছর। বঙ্গবন্ধু তখন ডাক দিয়েছেন, 'তোমাদের যা কিছু আছে, তাই দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোল ... এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'। পুকুরে গোসল করতে যাওয়ার সময় দেখলাম দলে দলে মানুষ ছুটে আসছে। সবাই বলছে পাকিস্তান হামলা করেছে। আর্তনাদ শুনলাম মানুষের। তারপর ছুটে গেলাম থানায়। শুরু হলো প্রতিরোধ যুদ্ধ।

তপোব্রত মুখার্জী: মুক্তিযুদ্ধে ভারত কতটা সহায়তা করে?

আব্দুল কাইয়ুম: প্রতিবেশী ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সর্বতোভাবে সহায়তা করে। প্রথম দিকে ভারতে অবস্থানকারী ছদ্মবেশী কিছু মুক্তিযোদ্ধার সহায়তায় আধুনিক বন্দুক, গোলাবারুদ আমাদের কাছে আসে। ভারত সরকার ও সেনাবাহিনীর পূর্ণ সহযোগিতা না থাকলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পন্ন হতে পারত না।

তপোব্রত মুখার্জী: মুক্তিযুদ্ধে সামরিক বাহিনীর যুদ্ধনীতি কে তৈরি করেছিলেন?

আব্দুল কাইয়ুম: মুক্তিযুদ্ধে সামরিক বাহিনীর যুদ্ধনীতিসহ সবই হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা অনুসারে। সামরিক নেতা, যারা তখন বাংলায় থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন, তারা ছাড়াও ভারতীয় সামরিক বাহিনী এক্ষেত্রেও সহায়তা করেছিল। বহু যুবক গোপনে সামরিক শিক্ষা লাভ করে এসে মুক্তিবাহিনীতে নাম লিখিয়েছিল। প্রধান যারা সামরিক শিক্ষাদানের বিষয়টি দেখেছিলেন, তাদের মধ্যে মনে পড়ছে কর্নেল এইচ.এম.এ গাফফার, জেনারেল হারূন অর রশিদ (তৎকালীন লেফটেন্যান্ট), লেফটেন্যান্ট শমশের সিং-জাঠ রেজিমেন্ট, ক্যাপ্টেন হুমায়ুন কবির (তৎকালীন লে.) তাদের নাম।

তপোব্রত মুখার্জী: সে সময় বঙ্গবন্ধুর ঠিক কী ভূমিকা ছিল?

আব্দুল কাইয়ুম: বঙ্গবন্ধু শুরুতেই সংগ্রামের গতিপথ তৈরি করেছেন। সে অনুযায়ীই আমরা কাজ করেছি। বঙ্গবন্ধু ১৯৬২ সাল থেকে ভারতের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর অনুসারীরা নির্বাসিত সরকার গঠন করেছেন এবং তাদের নির্দেশেই যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। তপোব্রত মুখার্জী :মুক্তিযুদ্ধে রাজাকার কারা?

আব্দুল কাইয়ুম: রাজাকার প্রধানত ব্যুরোক্র্যাট শ্রেণি, যারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করার লোভে নির্লজ্জ সমর্থন করেছিল পাকিস্তানি আগ্রাসন। মানুষের বিরোধিতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তারা পাকিস্তানি সৈন্যদের এবং পশ্চিম পাকিস্তানের সরকারের সপক্ষে দাঁড়ায়। এক কথায়, সিরাজের যেমন মীরজাফর, তেমনই বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের রাজাকার।

তপোব্রত মুখার্জী: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জনজীবন কেমন ছিল?

আব্দুল কাইয়ুম: যুদ্ধের প্রভাব তখন বলাচলে পূর্ব পাকিস্তানের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছিল। এমন নয় যে শুধু কিছু উদ্যমী যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিলেন বরং ঘরে ঘরে সব বয়সের সব মানুষ স্বতঃস্ম্ফূর্ত স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিতে চেয়েছিলেন। এমনকি নারীরাও পিছিয়ে ছিলেন না। মানুষ সত্যিই যা পেয়েছিল, তা নিয়েই প্রতিরোধ গড়তে চাইছিল। রাজনৈতিক অব্যবস্থা চূড়ান্ত ছিল, তাই স্বাভাবিক কাজকর্মের ফাঁকে জনজীবন যে অস্থির ছিল, সেটা আলাদা করে না বললেও চলে।

তপোব্রত মুখার্জী: মুক্তিযুদ্ধের আগের অবস্থা কীভাবে বর্ণনা করবেন।

আব্দুল কাইয়ুম: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের আইয়ুববিরোধী গণঅভ্যুত্থান, সবকিছুতেই বিদ্রোহ বিপ্লবের বীজ থেকে অঙ্কুরিত হয়েছিল। সর্বশেষ রাজনৈতিক নির্বাচন এবং মুজিবের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি এবং বিশ্ব নেতৃত্বের সমর্থন দেশের মধ্যে একটা আলোড়ন তুলেছিল। বাঙালি স্বাধীনতা চাইছিল। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উন্মেষ হঠাৎ হয়নি।

তপোব্রত মুখার্জী :স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ কেমন ছিল?

আব্দুল কাইয়ুম: স্বাধীনতার প্রথম তিন বছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তখন নতুন বাংলাদেশ, তাতে সকলেরই সহযোগিতা ছিল। তবে প্রাথমিক ঘোর কেটে যাবার পর অনেক যোদ্ধার সদম্ভ বিচরণ, প্রাচুর্যের প্রকাশ দেশের সাধারণ মানুষের কাছে ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই সময় দেশে একের বেশি পার্টি গড়ে ওঠে। ক্রমে তাদের আলাদা রাজনৈতিক এজেন্ডা তৈরি হয়। এসব দেশের মধ্যে একটা অন্যরকম রাজনৈতিক বাতাবরণ তৈরি করেছিল।

তপোব্রত মুখার্জী: বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ড কীভাবে দেখেন?

আব্দুল কাইয়ুম: বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় বঙ্গবন্ধুর ডাকে ও নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত হয়েছিল। আমাদের স্লোগান ছিল 'জয় বাংলা'। তিনিই স্বাধীনতার মহান স্থপতি। বঙ্গবন্ধুর নির্মম মৃত্যু বস্তুত বঙ্গবন্ধু হত্যা দেশি-বিদেশি চক্রান্তের ফসল। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যেন তার সুযোগ্য উত্তরসূরি না থাকে সেজন্য তাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সবাইকে আপন মনে করতেন। কোনো বাঙালি তাকে হত্যা করতে পারে এটা তিনি বিশ্বাস করতেন না।

তপোব্রত মুখার্জী: আজকের বাংলাদেশ আপনি কীভাবে দেখেন?

আব্দুল কাইয়ুম: মৌলবাদের উত্থান, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অবিচার, ইতিহাস বিকৃতি ইত্যাদি বেদনাদায়ক ঘটনা আমরা কম প্রত্যক্ষ করিনি। তবে সরকারে এখন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। দেশের উন্নয়ন ঈর্ষণীয়। যতদিন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বাংলাদেশ পরিচালিত হবে ততদিন আমরা স্বপ্ন দেখতে থাকব।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com