সমকালীন প্রসঙ্গ

বিজয়ের মাসে ধর্মের নামে বিভ্রান্তি

প্রকাশ: ২৮ ডিসেম্বর ২০ । ০০:০০ | আপডেট: ২৮ ডিসেম্বর ২০ । ০৩:১৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

রওশন জাহান সাথী

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যবিরোধী উস্কানি প্রচার এবং তার ফলে ভাস্কর্য ভাঙার যে ঘটনা ঘটেছে, তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাঙালি জাতির যা কিছু অর্জন তার বিরোধিতাকারীদের ধারাবাহিক অপচেষ্টার এটি একটি পর্যায় মাত্র। ভাস্কর্য ভাঙা শুধু ভাস্কর্যের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা কার্যত আমাদের সামষ্টিক অর্জনের স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাসকে খারিজ করে দিতে চাওয়ার নামান্তর।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির সূত্রে নির্মিত বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের গৌরবগাথা, বীর নারীদের আত্মত্যাগের ইতিহাস। কোনো দালালের পরিকল্পনায় জাতীয় রাজনীতি ও জনগণের মুক্তির ইতিহাসে কুঠারাঘাতের স্পর্ধা দেখাতে পেরেছে হামলাকারীরা! এদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে হবে।

দেশের মুষ্টিমেয় কিছু লোক বাদ দিলে প্রায় সব প্রজন্মের মানুষের কাছেই মুক্তিযুদ্ধ এক অহংকারের নাম। পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের এদেশীয় দালালদের বিরুদ্ধে পাহাড়সম যে ঘৃণা ও ক্ষোভ মানুষের মনে রয়েছে, তাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে পরাজিত শক্তি ব্যবহার করছে ধর্মকে। ধর্মের নামে যারা ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষকে ধর্মান্ধতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্য মুক্তিযুদ্ধের প্রতি জনমানুষকে বিভ্রান্ত করা। গর্বের সেই ইতিহাসের প্রতি তাদের দ্বিধান্বিত করে তোলা যে ইতিহাসে বর্ণিত আমাদের জাতীয় পরিচয়।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যই শেষ নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাঙা হয়েছে মধুদার ভাস্কর্যও। মধুর ক্যান্টিনের মধুদা ছিলেন ছাত্রনেতাদের প্রতি নিবেদিত প্রাণ। তিনি তার অবস্থান থেকে জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে যুক্ত ছাত্রনেতাদের সহায়তা করে গিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত এই বাঙালির ভাস্কর্য ভাঙাটাও স্পষ্টভাবে আমাদের দেখিয়ে দেয় যে, ধর্মের দোহাই দিয়ে কার্যত হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে।

মুক্তিযুদ্ধেরও আগে শতাব্দী ধরে কত অন্যায়ের বিরুদ্ধে কত কত বিদ্রোহের ইতিহাস আমাদের। কত সংগ্রাম, কত সংগঠন, কত সংগঠক, কত আত্মদানকারী! বিদ্রোহী সূর্যসেন-প্রীতিলতা-কল্পনা দত্ত-কুমুদিনীর মরণপণ লড়াই, বাঘা যতীন-বিনয়-বাদল-দীনেশের আত্মত্যাগে সমৃদ্ধ বাঙালির ইতিহাস। সেই ইতিহাসও একাত্তরের পরাজিত শক্তির হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। রক্ষা পায়নি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রবল সংগ্রামী বাঘা যতীনের স্মৃতির উদ্দেশে নির্মিত ভাস্কর্যও। বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে পরাজিত পক্ষ শুধু মুক্তিযুদ্ধ নয়, বাঙালির সব অর্জনের বিরুদ্ধেই চক্রান্তে লিপ্ত।

ভাস্কর্য প্রসঙ্গে ধোঁয়াশা তৈরির পাশাপাশি আরও কয়েকটি ঘটনা চোখে পড়ল। বিজয় দিবসের ব্যানারে শহীদ মিনারের ছবি দেওয়া, আবার জাতীয় পতাকার বিকৃত নকশা নিয়ে হাজির হওয়ার মতো অভিনব সব ব্যাপার ঘটছে। বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধাদের অস্বস্তিতে ফেলে যারা বিষয়টি উপভোগ করছে, তাদেরকে সফল হতে দেওয়া হবে না।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ও ধর্মের নামে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল। সে বাধা অতিক্রম করেই তো মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ওঠা। মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির গর্বের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভাস্কর্য ধর্মের দোহাই দিয়ে ভাঙার বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণের এটাই সময়।

স্বাধীন বাংলাদেশে নেতিবাচক রাজনীতির কোনো স্থান হবে না। মুক্তিযুদ্ধের পর কয়েক প্রজন্মে কোটি কোটি অসাম্প্রদায়িক তরুণের জন্ম হয়েছে। তারা নিশ্চয় বুঝতে শিখবে ধর্মের আবরণে জাতিগত অর্জনের বিরুদ্ধে কত গভীর আগ্রাসী ষড়যন্ত্র চলমান। ক্ষুদ্র স্বার্থ ও মিথ্যার রঙিন হাতছানির বিপরীতে জাতির গর্বোজ্জ্বল ইতিহাসকে সমুন্নত রাখতে তারা সফল হবে সেই আশাই করি।

ইন্টারনেটকে কেন্দ্র করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মিথস্ট্ক্রিয়ার, চিন্তার আদান-প্রদানের যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, কামনা করি তা যেন সংগঠিত এক আন্দোলনের রূপ ধারণ করে। তাদের চিন্তা শানিত হোক। মত প্রকাশের স্বাধীনতা গঠনমূলক আলোচনার বিষয়বস্তু করে তুলুক দেশ-জাতি-ভাষা, জীবনের মৌলিক প্রয়োজন, নারী-পুরুষের সমতা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় আনা, কৃষক-শ্রমিকের অবদানের যথাযথ মূল্যায়নের মতো প্রসঙ্গগুলোকে।

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর চলছে। আমাদের নিতে হবে নতুন প্রত্যয়। বিজয় অর্জনের পর চলতে থাকে বিজয় ধরে রাখার সংগ্রাম। বিজয়কে সুরক্ষা দিতে হলে চোখ-কান খোলা রাখা আমাদের কর্তব্য। যারা ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের এ বিষয়ে দায় সবচেয়ে বেশি। সরকারে নেই, তাই প্রতিবাদ-প্রতিরোধের দায় নেই এমনটা ভাবার অবকাশ কোথায় একজন মুক্তিযোদ্ধার? গণমানুষের জন্য বাংলাদেশ অর্জনের যুদ্ধে যারা ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নস্যাৎ করতে চাওয়ার অপচেষ্টা দেখে প্রতিবাদমুখর না হয়ে তারা থাকতে পারেন না।

আমাদের যেমন এসব বিষয়ে প্রস্তুত করে তুলেছিল মুক্তিযুদ্ধ ও তার আগে স্বাধীনতার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে চলা সংগ্রাম, ঠিক তেমনি সেসবের ইতিহাস অনুপ্রাণিত করবে আজকের তরুণদের। তাদের হাতে রচিত হবে প্রতিরোধ-বিজয়ের নতুন ইতিহাস। তরুণদের প্রতি অনেক ভরসা করি নিজেদের তরুণ জীবনের কথা মনে করে।

বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় শক্তিশালী, দেশ-জাতির ইতিহাসের প্রতি সচেতন ও অধিকার আদায়ে সরব তরুণ প্রজন্মের উপস্থিতিই পারবে তাদেরকে দাঁতভাঙা জবাব দিতে, যারা ধর্মের দোহাইতে ভাস্কর্য ভেঙে জাতিগত পরিচয়, ইতিহাস-অর্জনকে নস্যাতের নীলনকশা বাস্তবায়নে লিপ্ত।

দেশ-মানচিত্র-পতাকার মর্যাদা সমুন্নত রাখার প্রশ্নে নবীন-প্রবীণ মিলে আমরা যেন সমুদ্রের জলরাশি। পল্গাবনের তোড়ে সব চক্রান্ত ভেসে যাবে বঙ্গোপসাগরে। একাত্তরের পরাজিত শক্তি নিমজ্জিত হবে সমুদ্রের গভীর তলদেশে। মুক্তিযুদ্ধে হানাদার বাহিনীর এদেশীয় দালালদের বিচার-শাস্তি নিশ্চিতের দৃষ্টান্ত কারও ভুলে যাওয়া উচিত নয়।

সাবেক সংসদ সদস্য; সাবেক সভাপতি, মহিলা শ্রমিক লীগ

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com