বাংলাদেশে বন্যপ্রাণীর বিশাল কালোবাজার

বছরে ৩০০ কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা

৩০ ডিসেম্বর ২০ । ০০:০০ | আপডেট: ৩০ ডিসেম্বর ২০ । ০১:৫৮

জাহিদুর রহমান

বন্যপ্রাণীর অবৈধ বাণিজ্য বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক অপরাধগুলোর একটি। বাংলাদেশেও অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবৈধ বাণিজ্যের কারণে বন্যপ্রাণীর বহু প্রজাতির অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। বন্যপ্রাণী নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠেছে সিন্ডিকেট। কোটিপতি হওয়ার স্বপ্নে এক দল মানুষ ছুটছে এর পেছনে। সেই দলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি আছে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও পেশাদার প্রতারক।

বন্যপ্রাণীর বিশাল কালোবাজারে যেমন আছে কোটি কোটি টাকা হারানোর গল্প, তেমনি গহিন জঙ্গলে প্রাণী কিনতে গিয়ে খুনের ঘটনাও ঘটছে। বাংলাদেশকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে বিদেশ থেকে বন্যপ্রাণী পাচার হয়ে আসার ঘটনাও ঘটছে। মিঠাপানির কচ্ছপ চোরাচালানের মাধ্যমে লাখ লাখ ডলারের যে ব্যবসা চলছে বিশ্বজুড়ে, তার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ঢাকা। দেশে সবচেয়ে বেশি, ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ বন্যপ্রাণী কেনাবেচা হচ্ছে রাজধানীতেই।

সারাদেশে সিন্ডিকেট :পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জেলা ও উপজেলাগুলোতে অনেক দিন ধরে সক্রিয় তক্ষক পাচারকারীরা। যদিও তক্ষক দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ওষুধের 'উপকারিতা' নিয়ে যেসব কথা শোনা যায়, বৈজ্ঞানিকভাবে তার কোনো ভিত্তি নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারপরও সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্র নানা গুজব ছড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

তক্ষকের ব্যবসা ঘিরে বাড়ছে অপরাধের ঘটনা। এ ব্যবসা করতে গিয়ে ২০১১ সালে দালালের খপ্পরে পড়ে নিহত হয় ফটিকছড়ির নারায়ণহাট এলাকার নন্দীপাড়ার রূপক নন্দী নামে এক ব্যক্তি। তক্ষক ব্যবসা নিয়ে বিরোধের জেরে ২০১৮ সালের ১৩ এপ্রিল খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার মধ্য বেতছড়ির গোরস্তানপাড়ার যুবলীগ নেতা মোশারফ হোসেনকে দুর্বৃত্তরা খুন করে। এ ঘটনার ছয় মাসের মাথায় গত বছরের ২৩ নভেম্বর তক্ষক ব্যবসার সূত্র ধরে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে এনে খুন করা হয় ঢাকার এনজিও 'সেতু বন্ধন'-এর ম্যানেজার হেলাল উদ্দিনকে।

গতকাল মঙ্গলবার বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের দক্ষিণ চরদুয়ানী এলাকা থেকে একটি তক্ষকসহ একজনকে আটক করা হয়। গত ২৫ ডিসেম্বর জামালপুরে দুটি তক্ষকসহ ৫ কারবারিকে আটক করে র‌্যাব-১৪। অক্টোবর মাসে নওগাঁর বদলগাছীতে তক্ষক কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে পুলিশের এক উপপরিদর্শকসহ সংঘবদ্ধ একটি চক্রের পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এভাবে প্রায় প্রতি মাসেই তক্ষকসহ গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে।

হাঙরের ব্যবসাও চলছে বাংলাদেশে। ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি (ডব্লিউসিএস) বাংলাদেশ জানিয়েছে, ২০১৬ সালেই হাঙরের পাখনা রপ্তানি হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কেজি। এর পর আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া না গেলেও অবৈধ পথে যাচ্ছে হাজার হাজার টন হাঙর। আবার শাপলা পাতা মাছের চামড়া দিয়ে বানানো হয় অভিজাত ও শৌখিন পণ্য। প্রচলিত আছে, এ মাছের চামড়া ও বিশেষ অঙ্গ চীনসহ এশীয় অঞ্চলের দেশগুলোয় দামি মাছ হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশে ৮-১০ প্রজাতির শাপলা পাতা মাছের মধ্যে চারটি প্রজাতি মহাসংকটাপন্ন ও সংকটাপন্ন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

অন্যদিকে মিঠাপানির কচ্ছপ চোরাচালানের মাধ্যমে লাখ লাখ ডলারের যে ব্যবসা চলছে বিশ্বজুড়ে, তার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ঢাকা। আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা ওয়াইল্ডলাইফ জাস্টিস কমিশন (ডব্লিউজেসি) দু'বছর অনুসন্ধান চালিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে।

এ ছাড়া সুন্দরবনে বাঘ ও নিঝুম দ্বীপে হরিণ শিকার করছে একটি চক্র। অনুসন্ধানে জানা গেছে, চোরা শিকারিরা সুন্দরবন ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে বন্যপ্রাণী ধরে বাজারে চালান দেয়। চট্টগ্রাম বন্দর, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও মিয়ানমার সীমান্ত পথে অনেক বন্যপ্রাণী বিদেশে পাচার হচ্ছে। থাইল্যান্ড, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ এগুলোর সবচেয়ে বড় ক্রেতা।

বন্যপ্রাণী ব্যবসার ওপর নজরদারি করা আন্তর্জাতিক সংগঠন 'ট্রাফিক'-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বছরে ৩০০ কোটি টাকার বেশি অবৈধ বন্যপ্রাণীর ব্যবসা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের চামড়ার দাম ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা। মেছোবাঘ ও লামচিতার চামড়া মিলবে ২০ থেকে ৬০ হাজার টাকায়।

জ্যান্ত মেছোবাঘ বা লামচিতা এক থেকে দুই লাখ টাকায় পাওয়া যাবে বলে জানান এক ব্যবসায়ী।

ভালুকের পিত্ত বিক্রির সবচেয়ে বড় বাজার চট্টগ্রাম। পিত্ত দিয়ে তৈরি হয় ওষুধ। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ভালুকের পিত্ত সরবরাহ হয়ে থাকে। ওই অঞ্চলের চোরা শিকারিরা ফাঁদ পেতে ভালুক ধরে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে নিয়মিতভাবে জীবিত ভালুক ও এর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচার হয়ে থাকে। দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও তাইওয়ানের মানুষ এর সবচেয়ে বড় ক্রেতা।

২০১২ সাল থেকে চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত ডব্লিউসিএসের গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে যে বন্যপ্রাণীর ব্যবসা-বাণিজ্য হচ্ছে, তার মধ্যে বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীর বাণিজ্য শতকরা ২৮ শতাংশ, সরীসৃপ ২৯, পাখি ৩৫, ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী ৭ এবং হাঙর ও শাপলাপাতা রয়েছে এক শতাংশ।

বিশ্বজুড়ে বন্যপ্রাণী পাচারের ক্ষেত্রে বিশেষ নজরদারি বা 'ফোকাস' দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। ডব্লিউসিএসের গবেষণায় বলা হয়েছে, সারাদেশের মধ্য ঢাকায় ৩৩.৮, খুলনায় ৩১.৫, বরিশালে ৯.০, রাজশাহীতে ৭.৯, সিলেটে ৬.৪, চট্টগ্রামে ৬.১, রংপুরে ৩.৩ এবং ময়মনসিংহে ১.৮ শতাংশ বন্যপ্রাণীর বেচাকেনা হয়।

ভুয়া ছাড়পত্রে বন্যপ্রাণী পাচার :বন বিভাগের অনুমোদন ছাড়া কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্যপ্রাণী আমদানি-রপ্তানি করতে পারে না। এ জন্য সাইটিসের (বিলুপ্ত নয়- এমন প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী রপ্তানিতে দেওয়া সনদ) ছাড়পত্র প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে এই ছাড়পত্র দিয়ে থাকে বন অধিদপ্তর। তবে বন বিভাগের নামে ভুয়া ছাড়পত্রে অনেক বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণী এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবহন হচ্ছে। সূত্র জানিয়েছে, কার্গো বিমানে পাচার করে আনার পর ভুয়া ঠিকানা, জাল কাগজপত্র দেখিয়ে দ্রুত বিমানবন্দর থেকে খালাস করা হয়। সেখান থেকে ৭-১০ দিনের মধ্যে ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করানো হয়। প্রথমে প্রাণীগুলোকে রাখা হয় রাজধানীর উত্তরা ও আশপাশের এলাকায়। পরে সুযোগ বুঝে সেগুলো সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করা হয়। তবে কচ্ছপগুলো আকাশপথে চীন, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় পাচার করা হয়। পরিবহনের সময় বন্যপ্রাণীকে অজ্ঞান কিংবা বিশেষ কায়দায় রাখা হয়। বন্যপ্রাণী সম্পর্কে ধারণা না থাকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে যায়।

ডব্লিউসিএসের কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বন্যপ্রাণী নিয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কালোবাজার চলছে। এ বাজারে প্রতিবছর বিলিয়ন ডলার আদান-প্রদান হচ্ছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে বাংলাদেশে বন্যপ্রাণীর বড় অংশ আজ বিলুপ্ত প্রায়।

বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসাইন চোধুরী বলেন, বন্যপ্রাণী শিকার, পাচার এবং পণ্য হিসেব ব্যবহারের জন্য এশিয়া একটি বৈশ্বিক হটস্পট। বাংলাদেশ এখনও বিশ্বব্যাপী বিলুপ্ত প্রজাতির উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বন্যপ্রাণীর ধারক ও বাহক হওয়া সত্ত্বেও এখানে বন্যপ্রাণীর অবৈধ বাণিজ্য ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত। পাচারের ক্ষেত্রে অস্ত্র ও ড্রাগের পরই রয়েছে বন্যপ্রাণী।

বন অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২০১২ সাল থেকে ২০১৯ পর্যন্ত বন্যপ্রাণীবিষয়ক অপরাধের ঘটনা ঘটেছে দুই হাজার ৭৮টি। এ-সংক্রান্ত মামলা হয়েছে প্রায় ৩৮৬টি, গ্রেপ্তার হয়েছে ৬৮৪ জন, সাজা হয়েছে ৯২ জনের। এই অপরাধে শাস্তি হয়েছে মাত্র ৬৫ জনের।

বন বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ বন্যপ্রাণীর অবৈধ বাণিজ্য দমনে মূল চ্যালেঞ্জ অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনায় জটিলতা। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন-২০১২ অনুযায়ী, বন্যপ্রাণী নিধন এবং ব্যবসার সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে ১৫ লাখ টাকা জরিমানা ও ১২ বছরের কারাদণ্ড।

বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালক এএসএম জহির উদ্দিন আকন বলেন, ২০১২ সালে গঠন হওয়া ক্রাইম কন্ট্রোল ইউনিটের জনবল মাত্র সাতজন। তবুও গত আট বছরে বহু অভিযোগ পরিচালনা করেছি।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com