গুচ্ছ গুচ্ছ কবিতা

করোনাকালে গৃহবন্দি অভিজ্ঞতার কবিতা

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কামাল চৌধুরী

আমরা যে পৃথিবীতে ছিলাম, তা আর নেই। হঠাৎ বদলে গেছে সবকিছু। অজানা ভাইরাসের ভয়াবহ থাবায় থমকে গেছে জনজীবন। আলবেয়ার কামুর পেল্গগ উপন্যাসে মৃত ইঁদুরের জেগে ওঠার কথা আছে। তাই যেন ঘটলো ভিন্নরূপে। করোনা মহামারিতে বদলে গেল আমাদের চেনা পৃথিবী। আমরা সবাই হয়ে পড়েছি স্বেচ্ছাগৃহবন্দি, মুখোশী, ভীত, সতর্ক মানুষ- আমাদের সম্পর্কের ভেতরে শারীরিক দূরত্ব তৈরি করেছে গভীর শূন্যতা। সবাই দূরত্ব বজায় রাখছে- কারও বিপদে কেউ এগিয়ে আসতে পারছে না। এমন ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে আমরা কাটিয়েছি দীর্ঘদিন- এখনও কাটছে। এখন আবার শুরু হয়েছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ- মৃতের মিছিল বেড়েই চলেছে। এর মধ্যে আমরা অনেকেই স্বজন হারিয়েছি। স্বজন হারানোর হাহাকার আর অস্বাভাবিক পরিবেশে বিপর্যস্ত সবাই। আমরা গল্প উপন্যাসে, কবিতায় মহামারি সম্পর্কে পড়েছি; কিন্তু ভাবতে পারিনি কতটা আগ্রাসী হতে পারে এর রূপ। লকডাউনের অনিবার্য একাকিত্বে মূল্যহীন হয়ে গেল মানবিক সম্পর্ক! আমরা এখনো এ দুঃসময় কাটিয়ে উঠতে পারিনি, এখনো শেষ হয়নি গৃহবন্দিত্ব। জানিনা পৃথিবী কবে নবজীবন পাবে!

তবে প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগে পৃথিবী সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েনি। টিভির মধ্যমে সারা পৃথিবীর পরিস্থিতি যেমন সবাই জানতে পারছে, তেমনি স্যোশাল মিডিয়ায় যুক্ত থেকে শারীরিক দূরত্বকে ভুলতে চেয়েছে সবাই। এ সময়ে কবি লেখকরাও বসে থাকেননি। করোনা নিয়ে প্রচুর লেখা হয়েছে। বিষাদ ও নৈঃসঙ্গ্যের নানা মাত্রিকতা ফুটে উঠেছে তাদের লেখায়। যে জীবন আমি প্রত্যক্ষ করেছি এ সময়ে, একাকিত্বের অনুভবে অস্তিত্বের যে গভীর সংকটের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে আমাদের সবাইকে- তাই নিয়ে আমিও বেশ ক'টি কবিতা লিখছি।

আমার এই কবিতাগুলোও করোনাকালের অভিজ্ঞতায় রচিত। স্তব্ধতা, নৈঃসঙ্গ্য, মানবিক অসহায়ত্ব ও শারীরিক দূরত্ব নানা অনুষঙ্গে স্বগতোক্তির মতো ঘুরেফিরে এসেছে বিভিন্ন চরণে। গাণিতিক হিসাবে বিভাজিত এসব কবিতা মূলত অখণ্ড। এ কবিতাগুলো আমার একাকী পরিভ্রমণের কবিতা। খোলা বাতায়ন পাশে গৃহবন্দি মানুষের দৃষ্টিসীমার কবিতা। আমি স্মৃতিকাতর হয়ে যাকে খুঁজছি- সে দৃষ্টিসীমার বাইরে! আমার জানালার পাশে অচেনা পৃথিবী- আমি যেন একটা পাড়া-প্রতিবেশীহীন, জনমানবহীন প্রান্তরে হেঁটে বেড়াচ্ছি। যেখানে মানুষ একা- পাখিরা নয়।



পাড়া নাই, প্রতিবেশী নাই

১.
এতকাল আড়াল চিনেছি-আজ চিনি তোমার মুখোশ
অচেনা দিনের ঘোরে ভুলে গেছি
কবে আমি তোমাকে ছুঁয়েছি-

আঙুল তোমাকে আমি দূরত্ব ও সাবানের ক্ষারে
কতটা যে নিরাপদ ভাবি
তিন ফিট শূন্যতার পাশে কী অবাক দীর্ঘ চরাচর!

২.
দরজা পেরিয়ে গেলে পৃথিবীটা অলৌকিক ঘর
তালা মেরে রাজ্যপাল নিজেই উধাও!

সেখানে নিস্তব্ধ মেঘ, শূন্যধূলি সড়কের পাশে
বিন্দু কী দারুণ ওড়ে; সে এখন মুক্ত ত্রসরেণু
যেদিকে গাছেরা হাটে, বৃষ্টি যায় যেই পথ দিয়ে
কত গল্প, কত চাঁদ-সব স্মৃতি ঝাপসা হয়ে গেলে
দেখি তুমি জনশূন্য, এই একা শালিকআসরে

পাড়া নাই, প্রতিবেশী নাই!

৩.
আশ্চর্য, তুমিই ছিলে, নানা রঙে, বহু আলিঙ্গনে
শিরোনামহীন ছিল অপ্রকাশ্য কিছু আলোড়ন
অঙ্গীকারনামা ছিল অলিখিত ভেতর বাহির
যে ছাদ ভাঙতে চেয়ে আস্তিন গুটিয়ে
রাজপথে তুমি আমি পলাশের রঙ

অথবা নৈবেদ্য হাতে ভোরবেলা বালিকাশিশিরে
আমার হাতের পাশে ফুটে থাকা শুভ্র ভাঁটফুল

সেই তুমি ভীত চোখ! গুহাবাসী আমিও প্রেমিক
অতিদীর্ঘ রাজপথ-রাগ নাই, চিৎকারও নাই
স্লোগান দিচ্ছে না কেউ-

তাই, আজ তোমাকে দেখি না!

৪.
কাদের নজরবন্দি? থাকি আমি বায়ু প্রহরায়
দেয়াল উঠেছে পাশে, দরোজাও সেরকম লাগে
আমি কি অধ্যাস বসে ভেবে নিচ্ছি তুমিও দেয়াল?

পৃথিবীটা কয় হাত? পাখি ভেবে প্রতিদিন উড়ি?
পালকের নিচে রাখি খালবিল আবদ্ধ পুকুর
স্রোতের সকল গল্প ঢুকে গেছে খেয়াওঠা সড়কে সড়কে
যে মেয়েটি অপেক্ষায় তার প্রেমচিঠিটা হারিয়ে
আকাশ টপকে যেতে দিচ্ছে না বহির্গমন!

নিষেধ মানে না পাখি, তার চোখ বিষুবরেখায়!


৫.
রাতটা গভীর হলে আমি বলি, তুমি আছো
কোথাও তোমাকে দেখে ছুটে গেলে ব্যাকুল বাতাস
গাছতলা, ফুটপাত, ঝরাফুল নক্ষত্র বিলাসী-
ধূলি আসে, ধূলি যায়, প্রতিবেশী জেগে থাকে চাঁদ
দূরে কোনো ঝাপসা নগরে
হারানো ঝুলিতে তবু চিঠি আসে, ডাকপিয়নের!

সেই লেখা পাঠ করে আজও আমি নিঃসঙ্গ মর্মর।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২৩

সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com