শ্রদ্ধাঞ্জলি

প্রেরণার অদম্য উৎস

প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারি ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ২৩ জানুয়ারি ২১ । ০১:৩৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

মামুনুর রশীদ

নিজাম উদ্দিন লস্কর (১৯৫২-২০২১)

কিছু মানুষের হঠাৎ সাক্ষাৎ পাই, যারা নিভৃতচারী। কিন্তু হঠাৎই কিছুটা উচ্চকণ্ঠেই জানান দেন- এই পৃথিবীটাকে মন্থন করার অধিকার তার আছে। তেমনি একজন মুক্তিযোদ্ধা-লেখক-নাট্যকর্মীর সঙ্গে সিলেটে এক অনুষ্ঠানে গিয়ে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল। সেই থেকে তার সঙ্গে অল্পসময়ে দীর্ঘ পথচলা। সে পথ আবিস্কারের, অভিজ্ঞতা বিনিময়ের এবং নতুন সৃজনের। লোকটির নাম ময়না। ডাক নামটি সহজ হলেও আসল নামটি বেশ বড়। নিজাম উদ্দিন লস্কর। জীবনে বহু ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আছে তার। মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব আছে। পড়াশোনাতেও তার বেশ প্রবল আধিপত্য আছে।

ময়না আটটি ভাষা জানতেন। বহুদিন তিনি সিলেটে থিয়েটারের মঞ্চ দাপিয়ে বেড়িয়েছেন নির্দেশনা, নাট্য রচনা এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে। থিয়েটারের তত্ত্বের বেশ গভীরে ঢুকেছেন তিনি। সিলেটে তার বাড়িটি নাট্যকর্মীদের চলাচলে মুখর হয়ে থাকে। এক কর্মশালায় সেশন জুড়ে তিনি স্তানিলাভস্কির তত্ত্ব অবলীলায় ব্যাখ্যা করে গেলেন। তার কর্মক্ষেত্র বিচিত্র। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই একদা থেকেছেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীর সাহচর্যে। তারপর বিদেশ যাত্রা। এরপর চা বাগানের ব্যবস্থাপনায়। সর্বশেষ একটি তেল কোম্পানির কাজ। কিন্তু এর মধ্যে লেখালেখি, পরোপকার, নাট্যচর্চা কোনোটিই বন্ধ হয়নি।

সিলেটের নাট্যকর্মীদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একটা বড় আশ্রয় ও ভরসাস্থল। ঢাকা থেকে কোনো বড় ধরনের নাট্য প্রশিক্ষক গেলে তার বাসায় শুভাগমন হতো। শুধু তাই নয়, আনন্দময় আশ্রয় মিলত। তার স্ত্রীও অতিথি আপ্যায়নে একেবারেই ক্লান্তিহীন। ছোট ভাই মাহবুব তেমনি সদাপ্রস্তুত। প্রয়াত নাট্যকর্মী ইশরাত নিশাতেরও তার গৃহে থাকার চমৎকার অভিজ্ঞতা ছিল। এমনই একজন মানুষ যার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নাটক, চলচ্চিত্র, সাহিত্য, চিত্রকলা, ক্রীড়া এসব বিষয়ে কথা বলা যেত। ক্লান্তিহীন আনন্দে, কৌতূহলে সময় কেটে যেত যে কোনো অতিথির। এর মধ্যে লেখালেখির কাজটিও তিনি কম করেননি। অনুবাদ-রূপান্তরেও তার ছিল মনোযোগ। তার অনুবাদ গ্রন্থগুলো হচ্ছে 'আই লাভড অ্যা গার্ল', 'হৃদয় বদল', 'দ্য মঙ্ক হু সোল্ড হিজ ফেরারি' ও 'ডেথ অব অ্যা ডিক্টেটর'। ভ্রমণ কাহিনির মধ্যে আছে- 'ইউরোপের পথে', 'ইকরাম উদ্দিনের বিলাত যাত্রা'। নাটকও লেখা শুরু করেছিলেন কলেজে থাকাকালীন বা পরেও।

কিছু নাটক লিখেছিলেন সেগুলো অবশ্য ছাপা হয়নি। এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত সিলেটের সব নাট্যদলের সদস্যকে নিয়ে গঠিত সম্মিলিত নাট্য পরিষদে তিনি দীর্ঘ সময় সভাপতি এবং প্রধান পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। সিলেটে এ সময়ের মধ্যে তিনটি নাটক রচনা ও নির্দেশনা দেন। নাটকগুলোর নাম হচ্ছে- 'পাগলা গারদ', 'ঝুঁকি' ও 'ভণ্ড'। সর্বশেষ এই করোনাকালেও তিনি শেকসপিয়রের 'মার্চেন্ট অব ভেনিস' অনুবাদ করেন এবং নির্দেশনার দায়িত্বও পালন করেন। তার বহুমুখী চর্চার মধ্যে রয়েছে ছবি তোলা। সে কারণে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সিলেট ফটোগ্রাফিক সোসাইটি। এই সোসাইটি প্রায়ই ফটোগ্রাফি এক্সিবিশনের আয়োজন ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকে। কখনও কখনও ব্যাধি তাকে গৃহবন্দি করে রাখত। কিন্তু কর্মে তিনি ছিলেন অদম্য। তার কর্ম ও খ্যাতির সীমানা অনেক বিস্তৃত। তিনি তার কাজের জন্যই আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। সৃজনশীল এই মানুষটির কর্মোদ্দীপনা উত্তরসূরিদের কাছে অনুসরণীয় হয়ে থাকবে। সংস্কৃতির এই দিকপাল, সদাকর্মময় এবং তরুণদের প্রেরণার উৎস ময়না ভাই সম্প্রতি অকস্মাৎ ও অকালেই আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তার চলে যাওয়া অবিশ্বাস্য এবং অবর্ণনীয় এক ক্ষতের সৃষ্টি করে গেল।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com