চাইলেই সম্ভব

২২ জানুয়ারি ২০২১ | আপডেট: ২২ জানুয়ারি ২০২১

সম্পাদকীয়

সব চাওয়া সঠিক কি? সব চাওয়া পূরণ হওয়া কতটা সম্ভব? আম জনতার কথা বাদ, এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও নিশ্চিত ছিলেন না। আমরা দেখি, কবিতা ও গানে তিনি একাধিকবার এই কথা বলেছেন যে- 'যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই, যাহা চাই তাহা পাই না।' সঠিকভাবে চাইলেও কি তা সবসময় পূরণ সম্ভব? এই যে আমরা তারস্বরে চিৎকার করে আসছি, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প কিংবা সরকারি ক্রয়কাজে অস্বাভাবিক ব্যয়ের লাগাম টানা প্রয়োজন; আমাদের সেই চাওয়া পূরণ হয় কি? আমরা বলছি যে, কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে দফায় দফায় মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি নিয়েও জনপরিসরে কম আলোচনা হয় না। কিন্তু জনতার সেই প্রত্যাশা পূরণ হয় কি? অন্তত কিছু কিছু ক্ষেত্রে যে চাইলে সম্ভব, মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের ভাষ্য তা প্রমাণ করেছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, 'দ্বিতীয় কাঁচপুর, মেঘনা, গোমতী সেতু' প্রকল্পে প্রাক্কলনের চেয়ে ব্যয় কমেছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। উন্নয়ন প্রকল্পে যেখানে দফায় দফায় ব্যয় বাড়ানোই 'নিয়ম' হয়ে দাঁড়িয়েছে; বিশেষত অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পে যেখানে তিন থেকে চার গুণ ব্যয় বাড়ানোর নজির রয়েছে; সেখানে এই নজির সত্যিই উৎসাহব্যঞ্জক। প্রাক্কলিত ব্যয় কমে আসার কারণ সম্পর্কে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সচিব সমকালকে বলেছেন, এর মূলে রয়েছে প্রকল্পের আন্তর্জাতিক অংশীদার ও সরকারের পক্ষ থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ।

আমাদের সামান্য প্রশ্ন, অন্যান্য প্রকল্পেও কেন এভাবে নজরদারি ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা হয় না? গবেষণা সংস্থা পিআরআইর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে আমরা একমত যে, এখন সরকারের উচিত ব্যয়-সাশ্রয়ী পদক্ষেপগুলো চিহ্নিত করে অন্যান্য প্রকল্পেও তা অনুসরণ করা। এই দেশে একটি প্রকল্প প্রণয়ন ও পাস এবং তার জন্য উপযুক্ত বরাদ্দ আনতে গিয়ে কত কাঠখড় পোড়াতে হয়, আমাদের অজানা নয়। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে আগে যদিও সিংহভাগ অর্থ আসত বৈদেশিক ঋণ বা অনুদান থেকে, এখন ক্রমেই অভ্যন্তরীণ রাজস্ব থেকে উন্নয়ন প্রকল্পের বিনিয়োগ বাড়ছে। অবশ্য এটাও ভুলে যাওয়া চলবে না যে, বৈদেশিক ঋণ বিনিয়োগ হলেও আখেরে সেই অর্থ ও তার সুদ জনসাধারণের করের অর্থ থেকেই পরিশোধ করতে হয়। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি মানেই জনসাধারণের খরচ বৃদ্ধি। এক্ষেত্রে সুশাসন ও সাশ্রয় দূরে থাক; নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন না করেই ঠিকাদার বিল তুলে নিয়ে গেছে- দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছোটোখাটো প্রকল্পে এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়।

আর সার্বিকভাবে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প বা প্রতিষ্ঠানে পণ্য ক্রয় নিয়ে কী হয়, তা অনেকটা 'ওপেন সিক্রেট'। ঠিকাদাররা বাজারের চেয়ে খানিকটা বেশি মূল্য দেখাবেন এবং মানের দিক থেকে খানিকটা ছাড় দিয়ে পণ্য কিনবেন- এটা এক ধরনের অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। 'সরকারের মাল, দরিয়ায় ঢাল' প্রবাদটি বাংলা ভাষায় এক-দুই দশকে তৈরি হয়নি, বলা বাহুল্য। আলোচ্য প্রকল্পটির ধারা যদি আমরা অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তাহলে উল্টো প্রবাদের প্রচলনও দুরাশা হতে পারে না। এই করোনাকালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার উপজীব্য করে নির্মিত একটি জনপ্রিয় বিজ্ঞাপন সিরিজের 'ট্যাগলাইন' ছিল- 'আমরা চাইলে কি না সম্ভব?' সেটি প্রতিধ্বনিত করে, সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনটি সামনে রেখে আমরা বলতে চাই- হ্যাঁ, চাইলে সম্ভব। কিন্তু যাদের চাওয়া প্রকল্পগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তারা চান কিনা- সেই প্রশ্ন রয়েই যায়।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com