উচ্চশিক্ষা

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি- আগ্রহে ভাটা

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২১ । ১৭:৫৯

সৈয়দ ফারুক হোসেন

আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার অভাবে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কয়েক বছর ধরে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক রেটিং থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পিছিয়ে পড়ছে। গতানুগতিক সিলেবাস, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব ও মানসম্মত আবাসন সংকটের কারণে বিদেশিরা আসতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ চিত্র উল্টো। প্রতি বছর বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও পরিবেশ নিশ্চিত করায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশিরা আসতে আগ্রহী হচ্ছেন।

অন্যদিকে বিদেশি শিক্ষার্থী কম থাকায় বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্ব রেটিংয়ে পিছিয়ে পড়ছে। তারা আমাদের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলছে, তারা না এলে মনে করতে হবে আমরা একঘরে হয়ে যাচ্ছি। আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসরুম সংকট রয়েছে। একটি ক্লাসে ১৬০ জন পড়ানো হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের চাপে ক্লাসের পরিবেশ বজায় থাকে না। চরমভাবে আবাসন ও খাবার সংকট রয়েছে। বিদেশিরা এসব মেনে নিতে পারে না।

ঢাকা মহানগরে এমন পরিস্থিতি, ঢাকার বাইরে এ সমস্যা আরও প্রকট। এদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদনে সাধুবাদ জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রতি বছরই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর কারণ বর্তমানে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাপক ডিজিটালাইজেশন হয়েছে। ফলে বিদেশি শিক্ষার্থীরা তথ্য ও প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের যে কোনো প্রান্ত থেকে উচ্চশিক্ষার কোর্স-কারিকুলাম, সিলেবাস ইত্যাদি দেখে বাংলাদেশে পড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি বিদেশি শিক্ষার্থীদের এমন আগ্রহের বিভিন্ন কারণ তুলে ধরেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তারা বলেন, আমরা প্রতিটি শিক্ষার্থীকে আলাদাভাবে কেয়ার করে থাকি। আমাদের ডিগ্রি নিয়ে কেউ বেকার থাকছে না। এখানে সেশনজট নেই। যারা আধুনিক সুবিধা নিশ্চিত করতে পারছে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশিরা পড়তে আগ্রহী হচ্ছে। মানসম্মত সিলেবাস ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নানাবিধ সুবিধা তৈরি করা হয়েছে। নিজ তহবিল থেকে গবেষণা কার্যক্রমের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ শিক্ষকরা বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও সে তুলনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাড়ছে না। বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য তেমন কোনো প্রচার-প্রচারণা করে না। বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খরচ কম, আফ্রিকান দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশের আবহাওয়া-পরিবেশ অনেক ভালো, শিক্ষার গুণগত মান ঠিক রাখার চেষ্টা হয় এবং উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়।

যেসব দেশে এক সময় উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না সেসব দেশে এখন বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। ফলে ওইসব দেশ থেকে শিক্ষার্থী তেমন আসে না। যেমন- ভুটান, নেপাল, মালয়েশিয়ায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। এখন তারা অনেক উন্নত। আবার বেশিরভাগ দেশে উচ্চশিক্ষার চেয়ে কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। এ কারণেও তারা এখন উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশে আসে না। দেশে বর্তমানে ৪৬টি সরকারি ও ১০৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক বিদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তবে আগে বিদেশি শিক্ষার্থীরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশি ভর্তি হতো। এখন সেই সংখ্যা কমে গেছে- এমনটাই জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রমেই বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তা বাড়ছে। শিক্ষার মান নিম্নমুখিতার কারণেও দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কয়েক বছর ধরে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা নেমে এসেছে অর্ধেকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মানের নিম্নমুখিতাই দায়ী। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৯ সালে বিদেশ থেকে দেশে পড়তে এসেছিলেন মাত্র ৪৮২ জন শিক্ষার্থী। ৪৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছেন তারা। ঠিক আগের বছর ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল ৮০৪। অন্যদিকে ১০৫টি দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৪০টিতে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৯৪৯ জন। সে তুলনায় দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।

২০১৮ সালে হলি আর্টিসানে জঙ্গি হামলার ঘটনায় সে বছর শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কমে গিয়ে এক হাজার ৩৮৬ হয়। অবশ্য পরে তা বেড়ে ১ হাজার ৪৬৭ জন হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী জানা যায়, ২০১৮ সাল থেকে আরও ৪টি দেশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৯ সালে ৩৭টি দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ন করতে আসেন। দেশগুলো হলো- ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, চীন, জাপান, ইউএসএ, ইয়েমেন, ফিলিস্তিন, গাম্বিয়া, মরক্কো, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক, উগান্ডা, জিম্বাবুয়ে, সিয়েরা লিওন, যুক্তরাষ্ট্র, ইন্দোনেশিয়া, সোমালিয়া, ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া, আফগানিস্তান, ফিলিপাইন, বাহরাইন, লাইবেরিয়া, ফিজি, পাপুয়া নিউগিনি, মিয়ানমার, কেনিয়া, দক্ষিণ সুদান, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, ক্যামেরুন, ইরান এবং জর্ডান। ১০৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা অধ্যয়ন করেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্ববিদ্যালয়ের যথাযথ পরিচিতি না থাকা, বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত আবাসনের অভাব, ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক অস্থিরতা, জটিল ভর্তি প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে বিদেশি শিক্ষার্থী বাড়ছে না। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তির ক্ষেত্রে যেভাবে প্রচার চালায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই অর্থে তেমন প্রচার নেই। এখানে কী কী সুযোগ-সুবিধা আছে বা কী কী বিষয়ের ওপর লেকচার দেওয়া হয়, কোন কোন বিষয়ে ডিগ্রি নেওয়া যাবে, এ বিষয়গুলোর প্রচারে যথেষ্ট ঘাটতি আছে। শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক সুবিধা ও পরিবেশ নিশ্চিত করায় এবং শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাওয়ায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশিরা আসতে আগ্রহী হচ্ছে।

বিশ্বায়নের যুগে পুরো পৃথিবীটাই আজ পরিণত হয়েছে 'গ্লোবাল ভিলেজে' বা 'বিশ্বগ্রাম'। একমাত্র শিক্ষার মাধ্যমেই বিপুল এই পৃথিবী দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। আগে যেখানে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল হাতেগোনা, সেখানে এখন উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর অধিকাংশ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণে এগিয়ে আসছেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষায় আন্তর্জাতিক রেটিংয়ে অগ্রসর হওয়ার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়া নিশ্চিত করার জন্য আমাদের কাজ করতে হবে।





© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com