দুদকের অনুসন্ধান

পি কে হালদারের দুর্নীতির আরও নতুন তথ্য

ব্যবহার হয়েছে জাল এনআইডি অস্তিত্বহীন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | প্রিন্ট সংস্করণ

হকিকত জাহান হকি

জাল এনআইডি (জাতীয় পরিচয়পত্র), অস্তিত্বহীন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন পি কে হালদার। কোনোরূপ ঝুট-ঝামেলা ছাড়াই রিলায়েন্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে বের করে নিয়েছেন শত শত কোটি টাকা। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সহযোগী চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী আবদুল আলিম চৌধুরী পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে পি কে হালদারের দুর্নীতির নতুন নতুন তথ্যপ্রমাণ বেরিয়ে আসছে। দুদক সূত্রে এই খবর জানা গেছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে পি কে হালদার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে ইতোমধ্যে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির আরও অভিযোগ অনুসন্ধান চলছে।

দুদক সূত্র জানায়, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও পুঁজিবাজারে অর্থ সরিয়ে নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন পি কে হালদার। এই ক্ষেত্রে ১৪টি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হয়েছে। ১৪ প্রতিষ্ঠানের মাত্র দুটি ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানে জানা গেছে, পি কে হালদার রিলায়েন্স লিজিংয়ের এমডি থাকাকালে জাল এনআইডি ব্যবহার করে ভুয়া দুই ব্যক্তির নামে ১৫০ কোটি টাকা ঋণ দিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। জে কে ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক ইরফান আহমেদ খান ও ভার্স মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক ফয়সাল মুস্তাকের নামে নেওয়া হয় এই ঋণ। বাস্তবে ইরফান আহমেদ খান ও ফয়সাল মুস্তাকের কোনো অস্তিত্ব নেই। ভুয়া এনআইডি তৈরি করে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে। এনআইডি ও ট্রেড লাইসেন্সের ঠিকানা খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ঋণের নামে জে কে ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের নাম ব্যবহার করে প্রায় ২০০ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়। একই কায়দায় এফএএস ফাইন্যান্স থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকা নেওয়া হয়। জাল এনআইডি ও ভুয়া ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে রিলায়েন্স, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও এফএএস ফাইন্যান্স থেকে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা লোপাট করা হয়। এই কাজে তাকে সহায়তা করেছেন ব্যবসায়ী আবদুল আলিম চৌধুরী। দুদকের অনুসন্ধান বলছে, আবদুল আলিম নিজে ঋণের নামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৬৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে পাচার করেছেন। পি কে হালদার মন্টেনিগ্রোতে ৬০০ কোটি টাকায় ফাইভ স্টার হোটেল নির্মাণ করেছেন। এই হোটেলে আলিমের শেয়ার রয়েছে। জে কে ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের নামে চট্টগ্রামের ওয়ান ব্যাংকের জুবিলী রোড ও স্টেশন রোড শাখায় একাধিক হিসাব খোলা হয়েছিল। বিডি ট্রেডিং নামের অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের মালিক ইরফান আহমেদ। দুই প্রতিষ্ঠান থেকে ২০১৪-১৮ সাল পর্যন্ত বিদেশে পাচার করা হয় ৪০০ কোটি টাকা। দুদক জানায়, পি কে হালদার দুবাইয়ে অর্থ পাচারে আবদুল আলিমকে ব্যবহার করেছেন। দুবাইয়ে রোয়েল আমরো লিমিটেড নামের কোম্পানির হিসাবে শত শত কোটি টাকা পাচার করা হয়।

জাল এনআইডি ব্যবহার করে দ্রিনান অ্যাপারেলস নামীয় একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয় ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে। ভুয়া কোম্পানিটির চেয়ারম্যান ছিলেন লে. কর্নেল (অব.) কাজী মোমরেজ মাহমুদ ও এমডি ছিলেন আবু রাজীব মারুফ। চেকে স্বাক্ষর পাওয়া গেছে রাজীম সোমের- যার এনআইডি ভুয়া। ব্যাংক এশিয়ার ধানমন্ডি শাখায় যে হিসাবে টাকা স্থানান্তর করা হয় সংশ্নিষ্ট এই গ্রাহকের এনআইডি ছিল ভুয়া।

দুদকের অনুসন্ধান থেকে আরও জানা যায়, দ্রিনান অ্যাপারেলসের পক্ষে এমডি আবু রাজীব মারুফ ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ২০১৬ সালের ৯ মার্চ ২০ কোটি টাকা মেয়াদি ঋণ ও ৪০ কোটি টাকা চলতি মূলধনসহ মোট ৬০ কোটি টাকার ঋণের আবেদন করেছিলেন ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে। জামানত হিসেবে আনান কেমিক্যালসের মানিকগঞ্জের ১০০ শতাংশ জমি, সিকিউরিটি হিসেবে পিপলস লিজিং থেকে আনান কেমিক্যালসের কেনা এক কোটি ৪৪ লাখ ৪০ হাজার ৯০০টি শেয়ার দেখানো হয়। এসব যাচাই ছাড়াই ওই পরিমাণ ঋণ দেওয়া হয়।

ঋণ প্রস্তাবটি ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের পর ঋণ মঞ্জুরিপত্রে স্বাক্ষর করেন ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুল হক। যিনি দুদকের মামলায় বর্তমানে জেলে।

দুদকের অনুসন্ধান থেকে আরও জানা যায়, দ্রিনান অ্যাপারেলস এমডি আবু রাজীব মারুফের ২০১৬ সালের ৮ মে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক এমডি রাশেদুল হক বরাবর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের চেক নং গ০০০৮৬১২ অনুযায়ী ১২ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়। এরপর ৪৮ লাখ ৭৫ হাজার ১৮৫ টাকা বিতরণ করা করা হয়। একইভাবে কাগুজে প্রতিষ্ঠান ওয়াকামা লিমিটেড, পি অ্যান্ড এল, কণিকা, উইন্টেল ইন্টারন্যাশনাল, দেয়া শিপিং, আরবি, বর্ণ, নিউট্রিক্যাল, মুন, আর্থস্কোপ, এমটিবি মেরিনসহ দুই ডজন কাগুজে প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে পি কে হালদার ও তার সহযোগীরা চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে লুট করেছেন প্রায় কয়েক হাজার কোটি টাকা।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com