নগরজুড়ে বাসন্তী ভালোবাসা

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২১ । ২২:৫১

সমকাল প্রতিবেদক

ছবি: সমকাল

ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ৭টা ২৫ মিনিট; রোদ ঝলমলে সকালের আলো ছড়িয়ে পড়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। সবুজ পাতার ফাঁক গলে মিষ্টি রোদের কিরণে উদ্ভাসিত মঞ্চ। উদ্যানে ভোরের অলসতা কাটিয়ে আসা বেশির ভাগেরই মুখে ছিল মাস্ক। কেউ অবশ্য মাস্কের ধার ধারেননি। আবরণে-আভরণে সবাই সেজেছিলেন বাসন্তী সাজে। কেউ আবার ভালোবাসার রং লাল পোশাকেও জড়িয়েছিলেন নিজেকে। শুধু মানুষই নয়, ঋতুরাজের আগমনী দিনে মহামারির শোক ছাপিয়ে প্রকৃতিও সেজেছিল শিমুলে, পলাশে। বাতাসেও ছিল বসন্তের আগমনী সুর।

সেই সুর আছড়ে পড়েছিল রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, বলধা গার্ডেন, টিএসসি, বেইলি রোড, হাতিরঝিল, ধানমন্ডি লেক, রবীন্দ্রসরোবর, শিল্পকলা একাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপন করেছে বসন্ত আর ভালোবাসার এমন দিন।

জাতীয় বসন্ত উদযাপন পরিষদ :সদ্য প্রয়াত অভিনেতা আলী যাকেরের স্মৃতির প্রতি উৎসর্গ করে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বসন্ত উদযাপন করেছে জাতীয় বসন্ত উদযাপন পরিষদ। গান, কবিতা, দলীয় নৃত্য আর বসন্ত কথন দিয়ে সাজানো ছিল এবারের আয়োজন। ফাগুনের প্রথম দিনের সকাল ৭টা ২৫ মিনিটে যন্ত্রশিল্পী দীপেন সরকারের সুরের মধ্য দিয়ে 'এসো মিলি প্রাণের উৎসবে' স্লোগানের এবারের আয়োজনের সূচনা ঘটে। উৎসবের উদ্বোধন করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ। কাজল দেবনাথের সভাপতিত্বে এতে স্বাগত বক্তৃতা করেন মানজার চৌধুরী সুইট।

উদ্বোধনী বক্তৃতায় নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলেন, বিগত ২৭ বছর ধরে এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে বসন্ত উৎসব উদযাপন করি, বসন্তকে বরণ করি। করোনার এই মহামারিকালেও যার ব্যত্যয় ঘটেনি। আশা করি, করোনাকালের ভয়াবহতা কাটিয়ে আসছে বসন্তে আমরা আবার মিলিত হতে পারব দারুণ প্রাণের সম্মিলনে।

অনুষ্ঠানে একক আবৃত্তি করেন ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় ও কাকলী। এককসংগীত পরিবেশন করেন বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, সঞ্জয় কবিরাজ, রাজিয়া মুন্নি, নবনীতা জাহিদ চৌধুরী, আঞ্জুমান ফেরদৌস কাকলি প্রমুখ। কীর্তন পরিবেশন করেন তাপসী ঘোষ। সমবেতসংগীত পরিবেশন করে সুরসপ্তক, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি ও সত্যেন সেন শিল্পী গোষ্ঠী। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে নাচের দল স্পন্দন, আঙ্গীকম, ধ্রুপদ কলা কেন্দ্র, ভাবনা, মুদ্রা ক্লাসিক্যাল ড্যান্স, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি, স্বপ্নবিকাশ কলাকেন্দ্র, সাধনা সংস্কৃতি মণ্ডল, নৃত্যাঙ্গ, সুরবাহার ও নৃত্যম, মারমা সম্প্রদায়। নজরুলসংগীতের সঙ্গে যুগল নৃত্য পরিবেশন করে ধ্রুপদী নৃত্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। একক নৃত্য পরিবেশন করেন ওয়ার্দা রিহাব প্রমুখ।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত প্রথম পর্বের আয়োজন শেষে বিকেলে সাড়ে ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত গেন্ডারিয়ার সীমান্ত গ্রন্থাগার প্রাঙ্গণের সীমান্ত-সাহারা মঞ্চে ও উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টরের আজমপুর প্রাইমারি স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় পর্বের আয়োজন।\হগেন্ডারিয়ার সীমান্ত গ্রন্থাগার প্রাঙ্গণে বসন্ত কথন পর্ব শেষে সেখানে একক গান পরিবেশন করেন দিলদার হোসেন মুক্তার, প্রদীপ সরকার, সংযুক্তা রায়, ঢালী মো. দেলোয়ার, এসএম মেজবা উদ্দিন, শান্তা সরকার, উদয় শংকর বসাক, শ্রাবণী গুহ রায়, ঐশ্বর্য বসাক, মো. টিটু আলী, সাধনা মিত্র ও তাহমিনা খন্দকার মুক্তি। দলীয় সংগীত পরিবেশন করে সীমান্ত খেলাঘর আসর, গেন্ডারিয়া কিশলয় কচি-কাঁচার মেলা, মৈত্রী শিশুদল, কিশোর থিয়েটার, রঙ্গপীঠ শিশুদল, শাপলা কচি-কাঁচার আসর, চাইল্ড হেভেন ললিতকলা একাডেমি, সপ্তকলির আসর, মহিরুহ, মরমি লোকগীতি শিল্পীগোষ্ঠী।

শিল্পকলা একাডেমি : নাচ, গান, আবৃত্তি ও আলোচনাসহ নানা বর্ণাঢ্য আয়োজনে বসন্ত উদযাপন করেছে শিল্পকলা একাডেমি। বিকেলে একাডেমির উন্মুক্ত প্রাঙ্গণের নন্দনমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় শিল্পকলা একাডেমির এই আয়োজন। দুই পর্বে বিভক্ত এই আয়োজনের প্রথম পর্বে ছিল আলোচনা। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. বদরুল আরেফীন। এতে স্বাগত বক্তব্য দেন শিল্পকলা একাডেমির সচিব মো. নওশাদ হোসেন।

আলোচনা শেষে সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় সমবেত নৃত্য রিয়াদ আল ইসলাম এর নৃত্য পরিচালনায় বাংলাদেশ ওয়ার্ল্ড পারফরমিং আর্টসের শিশুশিল্পীরা পরিবেশন করে 'আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে' এবং 'আজ দখিন দুয়ার খোলা' অনিক বোসের নৃত্য পরিচালনায় স্পন্দন নৃত্যদলের শিশুশিল্পীরা পরিবেশন করে 'বিহরী লগন-মধুর এই লগন এবং নীল দিগন্তে ঐ ফুলের আগুন লাগলো', শিল্পকলা একাডেমির নৃত্যশিল্পীরা পরিবেশন করে 'শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা', তামান্না রহমানের নৃত্য পরিচালনায় নৃত্যমের শিল্পীরা পরিবেশন করে 'কৃষ্ণ মানে কালো যদি হয়'। এ ছাড়াও সমবেত নৃত্য পরিবেশন করে কবিরুল ইসলাম রতনের নৃত্য পরিচালনায় নৃত্যালোক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নৃত্যশিল্পীরা, ফারহানা চৌধুরী বেবীর নৃত্য পরিচালনায় একাডেমি অব ফাইন আর্টসের নৃত্যশিল্পীরা, এম আর ওয়াসেকের নৃত্য পরিচালনায় নন্দন কলাকেন্দ্রের শিল্পীরা এবং ফিফা চাকমার নৃত্য পরিচালনায় মারমা সম্প্রদায়, ওয়ার্দা রিহাবের নৃত্য পরিচালনায় ধৃতি নৃত্যনালয়ের শিল্পীরা সমবেত নৃত্য পরিবেশন করেন। দ্বৈত সংগীত পরিবেশন করেন সাজেদ আকবর ও সালমা আকবর, ইবরার টিপু ও বিন্দু কনা এবং খায়রুল আনাম শাকিল ও কল্পনা আনাম। একক সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী অপু আমান, সাব্বির, বিউটি এবং দিতি সরকার।

জবিতে বসন্তবরণ: কভিড-১৯ এর কারণে খোলা আকাশের নিচে ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করতে না পারলেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগ ভার্চুয়ালি 'বসন্তবরণ-১৪২৭' উদযাপন করেছে। রোববার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনুষ্ঠানটির ভিডিও সম্প্রচার করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে ভিডিও বার্তায় উপস্থিত ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান।

বঙ্গে বসন্ত উৎসব: শান্তিনিকেতনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের হাত ধরেই 'বসন্ত উৎসব' উদযাপনের সূচনা ঘটেছে। বসন্ত নিয়ে রবীন্দ্রনাথ, নজরুলসহ সব কবি, শিল্পী-সাহিত্যিকরা লিখেছেন, এঁকেছেন ছবি এবং গেয়েছেন বসন্তের বন্দনাগীত। বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশক থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় বসন্ত উৎসব উদযাপিত হয়ে আসছে। শুরুর দিকে এ উৎসব আয়োজনে ভূমিকা পালন করেছেন রবীন্দ্র গবেষক ও সংগঠক ওয়াহিদুল হক এবং কবি শামসুর রাহমান। বর্তমানে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা শহরে বসন্ত উৎসব উদযাপিত হয়। শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে এক দশকের অধিককাল ধরে বসন্ত উৎসব উদযাপিত হয়ে আসছে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com