সমাজ

মদ্যপান নিয়ে লুকোচুরি

২২ ফেব্রুয়ারি ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২১ । ০২:২১

ইকরাম কবীর

একসময় এ দেশের মানুষ লুকিয়ে চা পান করত। মনে করা হতো চা একটি নিষিদ্ধ পানীয়, চা পান করলে ছেলেমেয়েরা নষ্ট হয়ে যাবে। তখন বড়রাও লুকিয়ে চা পান করতেন। ধীরে ধীরে চা গ্রহণযোগ্যতা পেল, সবাই পান করা শুরু করলেন। আমাদের সময় যদিও ছোটদের চা পান করতে দেওয়া হতো না, তবে এখন আর তেমনটি হয় না। সন্তানদের আমরা চা পানে বাধা দিই না। তবে আমরা তাদের মদ্যপানে বাধা দিই। যুবাকালে আমাদের কেউ কেউ পানশালায় গিয়ে রাজা-উজির মেরেছি। বয়সকালে যারা শুদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করি, তারাই অবলীলায় বলি মদ্যপান হারাম এবং শাস্ত্রে নিষিদ্ধ। মদ্যপানে নিষেধাজ্ঞা খারাপ কোনো ব্যাপার নয়। দারুপানে অবশ্যই ক্ষতি হয়। অনেক ক্ষতি। পান করলে মস্তিস্কের অণু-পরমাণু-মলিকুল কাজ করে না। মানুষ স্বকীয়তা হারায়। স্বাভাবিক বুদ্ধি লোপ পায়। তখন অনেক অপরাধ সংঘটিত হতে পারে এবং হয়ও।

মানবজাতি ঠিক কবে দারু আবিস্কার করেছিল এবং তা পান করে আনন্দ পেতে শুরু করেছিল এ বিষয়ে আমি খুব নিশ্চিত নই। তবে বই-পুস্তকে পড়েছি প্রাচীনকাল থেকেই মানবসমাজে মদ্যপানের প্রথা ছিল। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর মানুষ একসঙ্গে বসে দারুপান করে, একটু নাচগান করে ঘুমিয়ে পড়ত। গ্রিক, রোমান, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ও আরও অনেক জাতির মদের দেব-দেবী ছিলেন। তাদের জন্য পূজাও দেওয়া হতো। যুদ্ধ জয়ের পর, নতুন ফসল উঠলে, সন্তান জন্মালে, শত্রুর মৃত্যু হলে ওইসব দেশে সবাই একসঙ্গে মদ্যপান করতেন। মধ্যযুগ পেরিয়ে যদি আধুনিককালের দিকেও তাকাই মদ্যপান সেই একই প্রথায় চলছে। সোভিয়েতরা তো সমাজতন্ত্র জারি করার পর মানুষকে খুশি রাখতে নামমাত্র মূল্যে ভদকা বিতরণ করত। তবে ধীরে ধীরে মানবজাতির মদ্যপানে সুমতি এসেছে। অনেকেই বেশ চিন্তা-ভাবনা করে মদ্যপান করেন।

এ দেশে দারুর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বেশ হাস্যকর। দারু বা দারুমিশ্রিত পানীয় নিষিদ্ধ করেছে রাষ্ট্রই। মাদকাপ্লুত করতে পারে এমন কোনো দ্রব্য সঙ্গে রাখা যাবে না, আইনে আছে। সঙ্গে রাখলে আপনাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। তবে যে ব্যক্তি আপনাকে গ্রেপ্তার করবেন তিনিও যে সুযোগ পেলে সেই দ্রব্য চেখে দেখবেন না তার নিশ্চয়তা নেই। এখানেই শেষ নয়। আমাদের দুটি দারু কারখানা আছে। একটি সরকারি এবং একটি ব্যক্তি খাতে। লক্ষ্য হচ্ছে- আপনি নিজের দেশে তৈরি দারুপান করুন। বিদেশি নয়। যদি আমদানি করে পান করতে চান তাহলে উচ্চহারে কর দিন। বিমানবন্দর ধরে বিদেশে যাওয়ার সময় শুল্ক্কমুক্ত দোকান থেকে বিদেশি দারু কিনুন এবং যে দেশে যাচ্ছেন, সেখানে গিয়ে পান করুন, কিন্তু ফিরে আসার সময় বিদেশি দারু সঙ্গে দেশে আনতে পারবেন না।

তবে স্থানীয় পানভক্তদের জন্য ব্যবস্থা আছে। আপনি যদি বিদেশি দারু পান করতে চান তবে ডাক্তারের সাহায্য নিন। চিকিৎসক লিখে দেবেন যে, আপনার শরীর ভালো নেই এবং সে কারণে আপনি দারুপানের মাধ্যমে নিজ স্বাস্থ্য উন্নত করতে পারবেন। সে বিষয়ে একটি লিখিত সনদ থাকতে হবে। ইংরেজিতে বলে 'লাইসেন্স'। লাইসেন্সটি সঙ্গে রাখতে হয়। কোনো ক্লাব বা বারে গিয়ে পান করতে চাইলে তা দেখাতে হয়। লাইসেন্সে বলা আছে, স্বাস্থ্যজনিত কারণে লাইসেন্সধারী ব্যক্তি মাসে 'সাত ইউনিট' বিদেশি দারু পান করতে পারবেন। লাইসেন্সপত্রের প্রথম পাতায় অনুমতি এবং পেছনের পাতায় বারো মাসের তালিকা আছে যেন দারু-ক্রেতা কোথা থেকে কতটুকু কিনছেন তার হিসাব রাখা যায়। যেখান থেকে কিনছেন সেখানকার সিলমোহরও থাকতে হবে। কিন্তু এই কেনাকাটা সমস্যাজর্জরিত। দেশের বেশিরভাগ বার ও ক্লাবের বিদেশি দারু বিক্রি করার লাইসেন্স নেই। তাই তারা বিক্রির সময় ব্যক্তিগত লাইসেন্সে সিল দেবে না। সিল না থাকার অর্থই হচ্ছে সেই বিক্রি আইনসম্মত নয়। দারু কিনে বাড়ি ফেরার পথে কোনো আইনরক্ষক যদি পথ আগলান, তাহলে তিনি সেই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারেন। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে বিদেশি হুইস্কি-ভদকা-টাকিলা-রাম সঙ্গে রাখার লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে কেন?

আমাদের এখানে দারুপান এক ধরনের ফ্যাশন। বাংলা ও ইংরেজি নববর্ষ, পূজা, বড়দিন, বৃষ্টি-অনাবৃষ্টি- সব পার্বণের মুহূর্ত অনেকের কাছেই যেন মলিন হয়ে যায়, যদি দারুপান না হয়। আমরা কেউ কেউ পান করি সবাইকে জানিয়ে এবং অনেকেই গোপনে। অ্যালকোহলের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কে একটু কপটতার মিশ্রণ আছে। দারুযুক্ত পানীয় উন্মুক্ত করে দেওয়ার প্রস্তাবে আমরা এক পা এগোই এবং তিন পা পিছিয়ে যাই। তাহলে আমরা কী নিয়ে ভয় পাচ্ছি? মদ্যপান করে মানুষ মাতলামি-পাগলামি করবে? মাতাল হয়ে সামাজিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করবে?

শ্রীলঙ্কায় রাস্তার পাশের দোকানের বেঞ্চিতে বসে বিয়ার পান করা যায়। সেখানে দারু কেনার দোকান আছে। ভারত, ভুটান ও নেপালেও তাই। সেখানকার মানুষ যদি দারুপান করার পর পাগলামি, মাতলামি ও অপরাধপ্রবণ হয়ে যেত, তাহলে ওই দেশগুলোর সরকার তো দারু বিক্রি বন্ধ করে দিত। যারা ইয়াবা বা আইস সেবন করেন, তারা কেমন পাগলামি করেন? এই মাদকগুলো কিন্তু সারাদেশে যথেষ্ট পরিমাণেই পাওয়া যায়। এগুলো কি অ্যালকোহল-নির্ভর পানীয়র চেয়ে কম ক্ষতিকর? সততার সঙ্গে কিছু গভীর চিন্তার প্রয়োজন। ভ্রান্ত যুক্তিগুলোকে নিয়ে আবারও চিন্তা করা উচিত। এ কথা জানা যে, যতই বাধা দিই না কেন, মানুষ মদ্যপান করবে। কিছু অসৎ ও লোভী ব্যবসায়ী ভেজাল দারু তৈরি করবে এবং তা পান করে অনেক মানুষের মৃত্যু হবে।

এমন অনেক দেশ আছে যেখানে দারুপান নিষিদ্ধ। সেসব দেশের নাগরিকরা কি তাহলে দারুপান করেন না? অবশ্যই করেন। মদ্যপান ঠেকানো কতটা সম্ভব তা আমাদের চিন্তা করতে হবে। এদেশে খেজুরের রস থেকে দারু তৈরি খুবই সহজ। আদিবাসীরা ভাত থেকে দারু তৈরি করতে পারে। আমাদের চিন্তাগুলো আরেকটু পরিস্কার হওয়া প্রয়োজন। আমাদের মদ্যপানের আকাঙ্ক্ষা, চাহিদা ও সংস্কারাচ্ছন্ন ধারণাগুলো ভালো করে বোঝা প্রয়োজন। মানবজাতি মাত্রেই নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হয়। কেউই তাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে না। একটু চিন্তা এবং পর্যবেক্ষণ করলেই বুঝতে পারব যে, আমরা নাগরিকদের যতটা পাগল বা মাতাল মনে করি, তারা আসলে ততটা নন। মদ্যপান নিয়ে আমাদের এই লুকোচুরির একটি ইতি টানা প্রয়োজন, যারা নিজেদের সমাজ রক্ষাকারী মনে করেন, তাদের পুরো পরিস্থিতিটা আরেকটু চিন্তা করে দেখার অনুরোধ জানাচ্ছি।

গল্পকার ও যোগাযোগ পেশায় নিয়োজিত

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com