মেঘনার মূর্তিমান আতঙ্ক চেয়ারম্যান আব্বাসী

চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যার পর ঢাকায় আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন হিসেবে পরিচিতি পান

২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১

কুমিল্লা সংবাদদাতা

ফারুক হোসেন আব্বাসী। কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার ভাওরখোলা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান তিনি। নানা কারণে অসংখ্যবার গণমাধ্যমে সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন। ভাওরখোলা গ্রামের শাহজাহান সরকারের ছেলে ফারুক আব্বাসী এলাকার মানুষের কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্ক। ১৯৯৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকায় চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলার অন্যতম আসামি তিনি। আলোচিত ওই খুনের সময় তার পরিচিতি ছিল 'কিলার আব্বাস' হিসেবে। আব্বাসীর বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ছয়টি খুনের অভিযোগ রয়েছে। মানুষকে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টার বেশ কিছু মামলারও প্রধান আসামি তিনি। সর্বশেষ গত শুক্রবার সন্ধ্যায় তার বাহিনী নিয়ে ভাওরখোলা গ্রামের একটি ঘরে ঢুকে একই পরিবারের ছয়জনকে কুপিয়ে জখম করেন। তাদের মধ্যে নাজমা বেগম (৬৫) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়। তার স্বামী আবদুস সালামেরও হাত-পা কেটে ফেলেছেন এই ভয়ংকর সন্ত্রাসী। সালাম এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে। বাকিদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালের পর তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। তৎকালীন সরকারি দলের প্রভাব খাটিয়ে ২০০৩ সালে প্রথমবারের মতো ইউপি চেয়ারম্যান হন। সরকার পরিবর্তন হলে ২০০৮ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ২০১৬ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে পুনরায় ভাওরখোলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হন। প্রতিবেশীরা জানান, ১৯৯০ সালে ফারুক আব্বাসী অভাব-অনটনের কারণে বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে চলে যান ঢাকার হাজারীবাগে। সেখানে গিয়ে ট্যানারিতে কাজ শুরু করেন। পুরান ঢাকার ট্যানারি কারখানাগুলোতে চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। ধীরে ধীরে অপরাধ জগতের ডন হয়ে ওঠেন। ঢাকা শহরের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকায় নাম ওঠে তার। ১৯৯৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলায় পরের বছরের ৩০ জুলাই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার আবুল কাশেম ব্যাপারী ৯ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। তাদের মধ্যে ফারুক আব্বাসীর নামও রয়েছে। পরে উচ্চ আদালতে আসামিদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলার কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ঢাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রেপ্তার এড়াতে আব্বাসী ফিরে আসেন ভাওরখোলা গ্রামের নিজ বাড়িতে। সেখানে এসে গড়ে তোলেন নিজের সন্ত্রাসী বাহিনী। এলাকায় শুরু করেন মাদক ব্যবসাসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে গত তিনবারের ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যানও হন। সর্বশেষ গত ইউপি নির্বাচনে আব্বাসীর বিরুদ্ধে প্রার্থী হন একই গ্রামের বাসিন্দা ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম সিরাজ। তবে সন্ত্রাসী আব্বাসীর সঙ্গে টিকতে পারেননি তিনি। ওই নির্বাচনে পরাজিত হয়ে পরিবার নিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন সিরাজ। পাঁচ বছর পর ঢাকা থেকে এক ভাতিজির বিয়েতে পরিবার নিয়ে গ্রামে আসেন সিরাজ। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন আব্বাসী। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় আব্বাসীর নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী রামদা, চায়নিজ কুড়ালসহ দেশি অস্ত্র নিয়ে সিরাজুল ইসলামদের ঘরে হামলা চালায়। এ সময় তারা নারী-পুরুষ যাকে যেখানে পেয়েছে, কুপিয়ে জখম করেছে। ওই হামলায় নিহত হন সিরাজের ভাবি নাজমা বেগম।

ফারুক আব্বাসীর বিরুদ্ধে একটি চাঁদাবাজির মামলায় সাক্ষী হওয়ায় নিজের চাচাতো ভাই লিটন আব্বাসীকে কুপিয়ে জখম করেন। এখন তিনি ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না। লিটন আব্বাসী জানান, চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যার পর এলাকায় এসেই ভয়ংকর হয়ে ওঠেন ফারুক আব্বাসী। এরই মধ্যে সোনারগাঁয়ে একটি ট্রিপল মার্ডারের ঘটনা ঘটান তিনি। এ ছাড়া ঢাকায় আরেকটি হত্যাকাণ্ডে তার নাম রয়েছে। জমি দখল, বাড়ি নির্মাণে চাঁদাবাজি, মেয়েদের বিয়ে থেকে চাঁদা আদায়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদাবাজি সবই করেন তিনি। তিনি ইউনিয়ন পরিষদেও যান না, বাড়িতে বসেই সব কাজ সারেন।

সোনারগাঁয়ে ট্রিপল মার্ডার সম্পর্কে জানা যায়, ২০০৫ সালে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের নামকরা পরিবার সুলতান হাজীর ছেলে মিজানুর রহমানের সঙ্গে তার ছোট বোন লাকী আক্তারের বিয়ে হয়। এক পর্যায়ে ওই পরিবারের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে ফারুক আব্বাসী সুলতান হাজীর মেয়ে ও দুই নাতিকে ঢাকায় নিয়ে হত্যা করে লাশ ডাস্টবিনে ফেলে রাখেন। ওই ঘটনায় তার নামে হত্যা মামলা হয়। বিএনপি সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় ওই মামলা থেকে অব্যাহতি পান তিনি।

মেঘনা থানার ওসি আবদুল মজিদ জানান, শুক্রবার রাতের ঘটনার পর চেয়ারম্যান ফারুক আব্বাসী, তার ভাই খোকন আব্বাসী, ইমরান হোসেন টিটু, ইয়ার আব্বাসীদের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ দেশি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)