উত্তপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়

'সব স্বাভাবিক চলছে, ক্যাম্পাস বন্ধ কেন'

২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১

সমকাল ডেস্ক

রোববার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বরে সংবাদ সম্মেলনে ৬ দফা দাবি জানান শিক্ষার্থীরা- সমকাল

দেশের কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ও আবাসিক হল খুলে দেওয়ার দাবিতে গতকাল রোববার মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। এসব কর্মসূচি থেকে প্রশাসনকে আলটিমেটামও দিয়েছেন তারা। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসন বলছে, এ সিদ্ধান্ত তারা নিতে পারে না। এটা সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়। এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) প্রশাসন গতকাল রাতে এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষার্থীদের আজ সোমবার সকাল ১০টার মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে।

প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর :

শিক্ষার্থীদের হল খোলার আলটিমেটামের পর জাবিতে হল ছাড়ার নির্দেশ :জাবি প্রতিনিধি জানান, গতকাল ছয় দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বরে এ সংবাদ সম্মেলন হয়। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে- হামলাকারী গেরুয়া গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে মামলা, শিক্ষার্থীদের পুলিশি নিরাপত্তায় ক্যাম্পাসে প্রত্যাবর্তন, হল খুলে দেওয়া ও হামলায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা।

শনিবার ছাত্ররা তালা ভেঙে জাবির হলে ঢুকলেও ছাত্রীরা তা পারেননি। ছাত্রীদের হলে ওঠার বিষয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অন্যতম নেত্রী সামিয়া লিতু বলেন, আগামীকাল (আজ) দুপুর ১২টার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হল খুলে না দিলে তারা সব ছাত্রীকে নিয়ে হলে প্রবেশ করবেন। শিক্ষার্থীদের হলে অবস্থানের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আ স ম ফিরোজ উল হাসান বলেন, বিষয়টি তারা সরকারকে জানিয়েছেন। তারা সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন। এরপর রাতে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার রহিমা কানিজ স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তি জারি করে জাবি প্রশাসন।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, করোনা থেকে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার জন্য গত বছরের ১৯ মার্চ থেকে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জবিতেও ক্লাস ও হল বন্ধ রয়েছে। ২০ ফেব্রুয়ারি (গত শনিবার) কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী সরকারি নির্দেশ অমান্য করে কোনো কোনো হলে প্রবেশ করে অবস্থান নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ২২ ফেব্রুয়ারি (আজ) সকাল ১০টার মধ্যে তাদের হল ত্যাগের নির্দেশ দিচ্ছে। না হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম রাবি শিক্ষার্থীদের :রাবি প্রতিনিধি জানান, হল-ক্যাম্পাস খুলে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীরা। এ দাবিতে গতকাল প্রায় এক ঘণ্টা ভিসির বাসভবনের গেটে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তারা। আজ সকাল ১১টার মধ্যে হল খোলার আলটিমেটাম দিয়ে প্রশাসনকে সময় বেঁধে দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এই সময়ের মধ্যে হল খুলে দেওয়া না হলে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই হল খুলে ভেতরে ঢোকারও ঘোষণা দেন।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলেন, সোমবার সকাল ১১টার মধ্যে হল খোলা না হলে, প্রশাসনের দরকার নেই। তারাই সিদ্ধান্ত নেবেন। প্রশাসন হল না খুললে তারাই হল খুলবেন। তারা আরও বলেন, সবকিছু স্বাভাবিক চলছে, তাহলে ক্যাম্পাস বন্ধ কেন! শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি চলতে পারে না। দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বহিরাগতদের হামলার শিকার হয়েছে। এর দায় প্রশাসনকে নিতে হবে। অবস্থান কর্মসূচিতে বিভিন্ন বিভাগের শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেন।

চবি শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন :চবি সংবাদদাতা জানান, ক্যাম্পাস ও আবাসিক হল খোলার দাবিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) মানববন্ধন করেছেন শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি একই দাবিতে প্রধানমন্ত্রী ও উপাচার্যের দপ্তরে স্মারকলিপিও দিয়েছে। এ ছাড়া ফেসবুকে হল খোলার দাবিতে সরব থাকতে দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে যাবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে।

হল খোলার দাবিতে আন্দোলনরত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাত্মতা জানাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। আবাসিক হল খুলে দেওয়ার দাবিতে চবি শিক্ষার্থীরা ৮ ফেব্রুয়ারি মানববন্ধন করেন। বিভিন্ন হলের অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী এই মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষার্থীরা পাঁচ দফা দাবিতে প্রক্টরকে একটি স্মারকলিপি দেন। এর আগে জানুয়ারি মাসের ৯ তারিখ হল খুলে দেওয়াসহ চার দফা দাবিতে উপাচার্য বরাবর একটি স্মারকলিপি দেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আশরাফী নিতু সমকালকে বলেন, আবাসন সংকটের কারণে মূলত জাহাঙ্গীরনগর ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। তারাও হল খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। দ্রুত ক্যাম্পাস ও হল খুলে না দেওয়া হলে বৃহত্তর আন্দোলনে যাব।

ইবিতে বিক্ষোভ :ইবি প্রতিনিধি জানান, আবাসিক হল খোলার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থীরা। গতকাল ক্যাম্পাসের ডায়না চত্বর থেকে মিছিল শুরু করে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন শতাধিক শিক্ষার্থী।

জানা যায়, শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব ম্যুরালের সামনে এসে প্রক্টরিয়াল টিমের বাধার সম্মুখীন হয়। একপর্যায়ে বাধা উপেক্ষা করে মিছিল চালিয়ে যান শিক্ষার্থীরা। পরে পুরো ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে তারা ভিসি বাসভবনের সামনে সমবেত হন। এ সময় 'প্রশাসনের প্রহসন মানি না মানবো না', 'এক দফা এক দাবি, আজকে হল খুলে দিবি', 'শিক্ষকরা ভিতরে, আমরা কেন বাহিরে?', 'ভাঁওতাবাজি বন্ধ কর, হলগুলো ওপেন কর' ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকেন।

এ সময় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বলেন, 'দেশের কোথাও করোনার ভয় নেই। সব স্বাভাবিক চলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসও খোলা আছে, পরীক্ষাও হচ্ছে। বাসে ঠাসাসাসি করে এসে এক বেঞ্চে একজন করে পরীক্ষা দিচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো ছাড়া আর কি কোথাও করোনা নাই? ক্যাম্পাসের আশপাশে বাসা-মেসও পর্যাপ্ত নেই। মেসে আমরা গাদাগাদি করে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েই থাকছি।' দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

পরে দুপুরে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি দল উপাচার্য অধ্যাপক শেখ আবদুস সালামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। এ সময় উপাচার্য বলেন, 'যদি সুযোগ থাকত তাহলে আমিও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দিতাম। আমরা চাইলেই হল খোলার ঘোষণা দিতে পারছি না। এ সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে নেই। এ সপ্তাহের শেষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আমাদের মিটিং আছে। সেখানে দাবিগুলো সরকারকে জানাব।'

হলের সামনে অবস্থান চুয়েট শিক্ষার্থীদের :চুয়েট সংবাদদাতা জানান, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষা দিতে আসা কিছু শিক্ষার্থী আবাসিক হলের সামনে অবস্থান করছে। শনিবার বিকেল ৪টা থেকে শহীদ তারেক হুদা হলের সামনে অবস্থান করছেন। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, আবাসিক হল বন্ধ থাকায় তারা মেস খুঁজেছিলেন। কিন্তু মেস না পেয়ে তারা হলের সামনে অবস্থান নিয়েছেন।

দীর্ঘ ১১ মাস পরে চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের শেষ টার্মের পরীক্ষা নিবে চুয়েট প্রশাসন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক হলগুলো খুলে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে চুয়েটের পাশে মেসগুলোতে অবস্থান করছিলেন শিক্ষার্থীরা। আগামী ২২ তারিখ থেকে বিভিন্ন বিভাগের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। তাই সকলেই ক্যাম্পাসে চলে এলে আবাসিক মেসগুলোতে জায়গার সংকট দেখা যায়। শিক্ষার্থীরা কোনো উপায় না পেয়ে হলের সামনেই বিছানাপত্র নিয়ে অবস্থান নিয়েছেন। তারা বলেন, হল না খুললে এভাবে থেকেই অবস্থান করে তারা পরীক্ষা দেবেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শহীদ তারেক হুদা হলের প্রভোস্ট ড. জিয়াউল হক হায়দার জানান, 'আমরাও চাচ্ছি, আমাদের শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে থেকে কোনোরকম ভোগান্তি ছাড়া পরীক্ষা দিক। আমরা সবসময় শিক্ষার্থীদের পক্ষেই আছি। এখন হলের মালিক হলেন কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিলেই আমরা হল খুলে দিতে পারি।'

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)