ভাষার মাস

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলা ভাষা

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১

রাশেদ খান মেনন

ভাষার মাস শেষ হতে না হতেই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর মাসের শুরু। ২৬ মার্চে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হলেও পহেলা মার্চ যেদিন ইয়াহিয়া খান জাতীয় সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেছিলেন, সেদিনই পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইতি ঘটেছিল। সেই সময়ে ঢাকার রাজপথে হাজারো কণ্ঠে আওয়াজ উঠেছিল- 'জিন্নাহ সাহেবের পাকিস্তান, আজিমপুরের গোরস্তান'। পরবর্তী দিনগুলোতে দ্রুতলয়ে ঘটে গিয়েছিল স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ, স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন, সব শেষে ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর সেই অমোঘ ঘোষণা- 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।'

ভাষাশহীদের মাসের মাত্র ১৯ বছরের মাথায় এসেছিল স্বাধীনতার ঘোষণা। অবশ্য শুরু হয়েছিল আরও আগে। পাকিস্তানের সূচনালগ্নই ভাষার প্রশ্ন নিয়ে। ১৯৪৭-এর ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানে একটি অসাম্প্রদায়িক সংগঠন গড়ে তোলার জন্য যে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে ভাষাবিষয়ক যে প্রস্তাব গৃহীত হয় তাতে বলা হয়েছিল- 'পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে, বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন ও আইন-আদালতের ভাষা করা হউক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হইবে তৎসম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্তের ভার জনসাধারণের ওপর ছাড়িয়া দেওয়া হউক এবং জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক।' ১৯৪৭-এর ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীর উদ্যোগে গঠিত তমদ্দুন মজলিস 'পাকিস্তানের রাষ্ট্র-ভাষা বাংলা- না উর্দু?' নামে যে পুস্তিকাটি প্রকাশ করে তাতে ভাষাবিষয়ক একটি প্রস্তাব সংযোজিত হয়। তাতে বলা হয়- 'বাংলা ভাষাই হবে (ক) পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন (খ) পূর্ব পাকিস্তানের আদালতের ভাষা (গ) পূর্ব পাকিস্তানের অফিসাদির ভাষা; (ঘ) পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষা হবে দুটি- উর্দু ও বাংলা ...'।

এই পথ ধরে বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১১ মার্চ ধর্মঘট পালনের আহ্বান জানায় এবং ধর্মঘট পালিত হয়। সেই সময় শামসুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ প্রমুখ গ্রেপ্তার হন। ১১ মার্চের এই ধর্মঘটের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার ছাত্রদের সঙ্গে যে চুক্তিতে আসতে বাধ্য হয়, তাতে স্থির হয়- 'পূর্ব পাকিস্তান ব্যবস্থাপক পরিষদে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করিবার এবং তাহাকে পাকিস্তান গণপরিষদে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের পরীক্ষাদিতে উর্দুর সমমর্যাদাদানের জন্য একটি বিশেষ প্রস্তাব উত্থাপন করা হইবে ...'। অবশ্য এর আগেই ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮, পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনেই বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দুটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করে বলা হয়- (১) বছরে অন্তত একবার ঢাকায় পাকিস্তানের গণপরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে এবং (২) উর্দু এবং ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকেও গণপরিষদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা হোক। পাকিস্তানের গণপরিষদের এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিলেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। এই ভাষার প্রশ্ন উত্থাপন করার কারণেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চোখের কাঁটা হয়েছিলেন শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।

এর পরবর্তী ঘটনাবলি আমাদের সবারই কমবেশি জানা। ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহকে যে সংবর্ধনা দেওয়া হয়, সেখানে তিনি ঔদ্ধতপূর্ণভাবে বলেছিলেন- '...এ কথা আপনাদের পরিস্কারভাবে বলে দেওয়া দরকার যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোনো ভাষা নয়।' তিনি যখন ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার সম্মানে আয়োজিত বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে তার ওই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করলেন, তখনই কয়েকজন ছাত্র 'না', 'না' বলে চিৎকার করে প্রতিবাদ জানান। এর পর আর ওই প্রতিবাদ থামিয়ে রাখা যায়নি। পরবর্তীকালে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হিসেবে খাজা নাজিমুদ্দিন ১৯৫২-তে একইভাবে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে সর্বদলীয় ভাষাসংগ্রাম পরিষদ ভাষা আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে ২১ ফেব্রুয়ারি হরতাল ডাকলে নুরুল আমিন সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। ওই ১৪৪ ধারা ভেঙে ছাত্ররা আন্দোলনে অগ্রসর হলে তার ওপর গুলি চললে সৃষ্টি হয় অমর একুশের, যা বাঙালি কোনোদিনই ভুলবে না।

ভাষার মাসের শেষে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর শুরু হওয়ার যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেখানে ফিরে গিয়ে যে কথা বলতে চাই তা হলো, সেই বাংলা ভাষা, বাংলা ভাষার রাষ্ট্র বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা কেবল নয়, অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাংলা ভাষাকে শিক্ষা-সাহিত্যে তো বটেই, অফিস-আদালতসহ রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে ব্যবহারের আইন করা হয়েছে বেশ আগেই। বাংলাদেশ সৃষ্টির পরপরই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে বাংলায় বক্তৃতা করে বাংলাকে আন্তর্জাতিক ব্যাপ্তি দিয়েছেন। সেই জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান ইউনিসেফ ভাষাশহীদ দিবসকে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি। অর্থাৎ বাংলা ভাষার আন্দোলন এখন পৃথিবীর সব মাতৃভাষা রক্ষার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আধেয়। কিন্তু স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলা ভাষার রাষ্ট্রে বাংলা ভাষার অবস্থা কী?

প্রশ্ন হচ্ছে- স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলা ভাষা এগিয়েছে, না পিছিয়েছে? পশ্চিমবাংলায় বাংলা ভাষা হিন্দির আগ্রাসনে পর্যুদস্ত, আসামের শিলচরে বাংলা ভাষার জন্য জীবনদানের পরও বাংলা সেখান থেকে বিতাড়িত, এমনকি বাঙালিরাও একঘরে। সেখানে বাংলাদেশে বাংলা ভাষার কোনো প্রতিপক্ষ না থাকলেও বাংলা ভাষা এখন কার্যত কোণঠাসা। এটা ঠিক যে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে, অফিসে নথিতে বাংলা ভাষা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বিভিন্ন সভা-সমিতি-সেমিনারে ইংরেজি এখনও প্রধান বাহন হয়ে আছে। এমনকি এ ধরনের কোনো অনুষ্ঠানে একজন বিদেশি থাকলেও ইংরেজি ভাষায় সেসব অনুষ্ঠান পরিচালিত হয় এবং সবচাইতে দুর্ভাগ্যজনক হলো, অশুদ্ধ এবং ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে উচ্চারণ। তবুও বাংলায় বলা হবে না। পাছে ওই একজন বিদেশি ইংরেজি ভাষায় অজ্ঞ বলে মনে করতে পারেন। অথচ পৃথিবীর যে কোনো দেশে তারা নিজ ভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় এ ধরনের অনুষ্ঠান পরিচালনা করে না। প্রয়োজনে যুগপৎ অনুবাদের ব্যবস্থা থাকে, এবং এই ব্যবস্থা আমাদের এখানে করাও কোনো দুরূহ কাজ নয়। এখন তো কোনো ইনবিল্ট ডিভাইসের প্রয়োজন নেই। প্রযুক্তির উন্নয়নের যুগে ব্যাপক ব্যবহার করেই সেটা হতে পারে।

অন্যান্য ক্ষেত্রে যদিওবা গত ৫০ বছরে কিছুটা এগোনো গেছে; দেশের আদালতের ভাষার কোনো পরিবর্তন হয়নি। দু'একজন বিচারক উদাহরণ সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন, কিন্তু আইনি পরিভাষার অভাব বা অনুপস্থিতির কথা বলে আদালতে ইংরেজিই বহাল রয়েছে। অথচ কুয়েতের মতো দেশের আদালত তাদের রায় আরবিতেই দেন। এর প্রমাণ হলো, সংসদ সদস্য পাপুলের বিরুদ্ধে কুয়েত আদালতে দেওয়া রায়, যার কপি আমাদের জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পৌঁছেছে।

স্বাধীনতার ৫০ বছরেও সর্বস্তরে বাংলা প্রচলিত না হওয়ার কারণ আইন, বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্রসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বইসহ ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে সহজ বাংলা পরিভাষার অনুপস্থিতি। এক সময় বাংলা ভাষার উন্নয়নের জন্য বাংলা উন্নয়ন বোর্ড ছিল। যতদূর মনে পড়ে, বাংলা একাডেমির সঙ্গে এই বোর্ড এক করে দেওয়া হয়েছে। ফলে অন্য অনেক কাজে বাংলা একাডেমি পরিভাষার কাজে খুব একটা এগোয়নি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে যা প্রয়োজন তা হলো প্রতি ক্ষেত্রে পরিভাষা তৈরি করার জন্য বাংলা উন্নয়ন বোর্ড বা সে ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠান জরুরি ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করা এবং তার জন্য বড় অঙ্কের যথোপযুক্ত অর্থ মঞ্জুর করা, যাতে দেশ-বিদেশ থেকে ব্যক্তিদের নিয়ে এসে অন্য ভাষা বিশেষ ইংরেজির পরিভাষা তৈরি করা যায় এবং এ ক্ষেত্রে সেই পরিভাষা হতে হবে একেবারেই সহজ। প্রয়োজনে অন্য ভাষার আত্তীকরণ করতে হবে, যেভাবে বাংলা ভাষা আরবি, ফার্সি, সংস্কৃতকে আত্তীকরণ করেছে নিজ ভাষায়।

আমরা ইতোমধ্যে ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছি। বেশ আগেই ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভাপতি হাসানুল হক ইনুর উদ্যোগে বাংলাদেশ সরকার বাংলা ভাষাকে কম্পিউটারের টেকনিক্যাল ভাষার অন্তর্ভুক্ত করেছিল। এর অগ্রগতি ঘটাতে হবে এবং সামগ্রিকভাবে তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে বাংলাকে সম্প্রসারিত করতে হবে জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিকিৎসা, আইন, তথ্যপ্রযুক্তিসহ সব ক্ষেত্রে। তাহলেই বাংলা ভাষা রাষ্ট্র, সেই সঙ্গে পৃথিবীতে সগর্বে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে, যেভাবে অন্য ক্ষেত্রে দাঁড়াতে পারছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র। বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলা ভাষাকে সেই মর্যাদায় উন্নীত করার ব্যবস্থা এখনই নিতে হবে। তাহলেই যেমন ভাষাশহীদ, তেমনি স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান আমরা দেখাতে পারব।

সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)