ব্যতিক্রমী জীবিকা

ছিপে কাপড় ছিপেই ভাত

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১

শফিক সরকার, মুক্তাগাছা (ময়মনসিংহ)

মুক্তাগাছার বাদেমাঝিরা গ্রামের বড়শির ছিপ তৈরিতে ব্যস্ত নারীরা- সমকাল

বাড়ি বাড়ি মাছ ধরার ছিপ বানানো হয় প্রত্যন্ত সেই গ্রামে। সেই ছিপ যায় সারাদেশের বিভিন্ন জেলায়। ছিপ বেচার টাকাতেই ভাত জোটে গ্রামটির দুইশ'রও বেশি পরিবারের মানুষজনের, জোটে কাপড়চোপড়।

এমন গ্রাম সত্যিই আছে। ময়মনসিংহ থেকে ২২ কিলোমিটার পথ পেরোলেই দেখা মেলে এই গ্রামের। মুক্তাগাছা উপজেলার মানকোন ইউনিয়নের এ গ্রামটির নাম 'বাদেমাঝিরা'। গ্রামে ঢুকলেই চোখে পড়ে বাড়ির আঙিনায় আগুন জ্বেলে ছ্যাঁকা হচ্ছে মাছ ধরার ছিপ। নারী-পুরুষ-কিশোর নির্বিশেষে সবাই যুক্ত এই কাজে।

এই ছিপ বানাতে বানাতেই ভাগ্য খুলে গেছে এ গ্রামের মানুষের। অথচ একসময় দিন আনি, দিন খাই অবস্থা ছিল তাদের। তখন তারা সবাই নির্ভরশীল ছিলেন অন্যের জমি চাষাবাদের ওপর। এখন ছিপ বানানোর কুটিরশিল্প ভাগ্য খুলে দিয়েছে তাদের। পাল্টে যাচ্ছে তাদের জীবনযাপনের মান।

'বাদেমাঝিরা'র ভাগ্য বদলের সূচনা গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব বাসিন্দা চাঁন মাহমুদ ওরফে চাঁন মিয়ার সুবাদে। বছর পঞ্চাশেক আগে ছিপ বানাতে শুরু করেন তিনি। পর্যায়ক্রমে গ্রামের সবাই উৎসাহিত হয়ে এ কাজের শিক্ষা নেন তার কাছ থেকে। যুক্ত হয় এই কুটিরশিল্পে।

চাঁন মিয়া বলেন, তখন আগুন জ্বালিয়ে বাঁশের চোঙ্গায় ফুঁ দিয়ে বাঁকা বাঁশ সোজা করে ছিপ বানাতাম। এখন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি দিয়ে ছিপ সেঁকা হয়। কাজকর্ম অনেক সহজ হয়ে গেছে।

বাদেমাঝিরার সবাই এখন কোনো না কোনোভাবে যুক্ত ছিপ তৈরির পেশায়। নারীরাও ঘরে বসে বাড়তি আয় করছেন এই কুটিরশিল্পের সুবাদে। ছিপ চেঁছে তারা একেকজন প্রতিদিন আয় করেন ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। ছিপের চিকন বাঁশ দা দিয়ে চেঁছে দেন নারীরা। পুরুষ সদস্যরা সেইসব চিকন বাঁশ সেঁকে নেন বাড়ির আঙিনাতে। তারপর রংবেরঙের নকশা আঁকেন ছিপে। শৌখিন মৎস্যশিকারিদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে এই নকশা। বাদেমাঝিরা গ্রামের শারমিন আক্তার জানান, সারাদিনে ৫০ থেকে ৭০টি ছিপ চাঁছতে পারেন তারা। এ থেকে আয় হয় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। এ টাকা তারা খরচ করেন সন্তানদের লেখাপড়ার পেছনে। সারাবছর ধরে বানালেও এই ছিপ বিক্রি হয় মূলত আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র- এই তিন মাসে। গ্রামে ছিপ বানানোর উপযোগী বাঁশের চাষ খুব অল্পই হয়। এই ছিপ তৈরির বাঁশ তারা সংগ্রহ করেন সিলেট ও সুনামগঞ্জ থেকে। প্রতিটি ছোট ছিপ আট টাকা আর বড় ছিপ ১৪ টাকা দরে কিনে থাকেন তারা। একেকটি ছোট ছিপ তৈরিতে খরচ পড়ে ২৩ টাকা আর বড় ছিপে ৩০ টাকা। ছিপ তৈরি হওয়ার পর তারা ছোটগুলো ২৫ টাকায় আর বড়গুলো ৪০ টাকা দরে বিক্রি করে থাকেন। তবে বন্যা ও বৃষ্টির পানি বেশি হলে ছিপের দাম বেড়ে যায়। ছিপ তৈরির কারিগর আমিনুল ইসলাম বলেন, বংশপরম্পরায় ছিপ তৈরির কৌশল আয়ত্ত করতে হয়। না হলে নিখুঁত ছিপ বানানো সম্ভব নয়। একসময় তাদের অভাব অনটনে দিন কাটত। এখন এই ছিপ বানিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি করে তারা স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন।

গ্রামজুড়ে ছিপ তৈরির কুটিরশিল্প গড়ে ওঠায় সপ্রশংস কণ্ঠে মুক্তাগাছার ইউএনও আবদুল্লাহ আল মনসুর বলেন, বাদেমাঝিরার মাছ ধরার এই ছিপ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি হচ্ছে। এর ফলে তাদের অবস্থা পাল্টেছে। পাশাপাশি সারাদেশে বাদেমাঝিরা বিশেষ পরিচিতিও পেয়েছে। তাদের এ কুটিরশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারিভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করা হবে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)