মাতৃভাষার আন্দোলন এখনও চলছে

নির্মূল কমিটির ওয়েবিনার

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১

সমকাল প্রতিবেদক

ছবি: ফাইল

মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি আদায়ে বাঙালির আত্মত্যাগ বিশ্বের নানাপ্রান্তে মাতৃভাষার দাবিকে মহিমান্বিত করেছে। এই আন্দোলন এখনও পাকিস্তান, ভারত, লাটভিয়া, আমেরিকা, নেপাল ও দক্ষিণ আমেরিকায় অব্যাহত রয়েছে। তবে আমাদের সৌভাগ্য, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে একটি বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি। পাশাপাশি আমাদের শহীদ দিবসটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হয়ে উঠেছে- এও বড় অর্জন।

গতকাল সোমবার মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনলাইন ওয়েবিনারে বিশিষ্টজন এসব কথা বলেন। 'বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিক মর্যাদা অর্জনে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার অবদান এবং আমাদের করণীয়' শীর্ষক এই ওয়েবিনার আয়োজন করে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। সংগঠনের সভাপতি শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফা জব্বার।

সভায় বক্তব্য দেন মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলনের সভাপতি বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের সাম্মানিক সভাপতি নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন, ১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্টের সভাপতি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, ভাষাসংগ্রামী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পৌত্রী আরোমা দত্ত এমপি, সাহিত্যিক অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল, টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফোরাম ফর হিউম্যানিজম তুরস্কের সাধারণ সম্পাদক শাকিল রেজা ইফতি ও নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল।

সভাপতির বক্তৃতায় শাহরিয়ার কবির বলেন, বঙ্গবন্ধু ১৯৫২ সালে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব শান্তি সম্মেলন থেকে আরম্ভ করে ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রথমবারের মতো বাংলায় ভাষণ দিয়ে এ ভাষাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যেভাবে তুলে ধরেছেন তার দ্বিতীয় কোনো নজির নেই। ১৯১৩ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার অর্জন করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উৎকর্ষ বিশ্বসভায় প্রতিষ্ঠিত করেন। তার যোগ্য উত্তরসূরি ছিলেন বাংলা ভাষাভিত্তিক স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৯ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাষাশহীদ দিবস ২১শে ফেব্রুয়ারিকে জাতিসংঘের মাধ্যমে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে বিশ্বব্যাপী পালনের স্বীকৃতি অর্জন করেছেন।

তিনি বলেন, এখন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষায় পরিচিত করতে বহুমাত্রিক উদ্যোগ নিতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার সেরা সাহিত্য সম্ভার এবং বিজ্ঞান ও গবেষণামূলক গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদের পাশাপাশি এই ভাষার সেরা নিদর্শনগুলো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় অনুবাদে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে বাংলা একাডেমিকে।

প্রধান অতিথি মোস্তাফা জব্বার বলেন, ভাষা আন্দোলন এখনও চলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্র বাংলার ব্যবহার প্রতিদিনই বাড়ছে। তবে এখনও আমরা বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করতে পারিনি। পারিনি উচ্চশিক্ষা বা উচ্চ আদালতের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। রোমান হরফে বাংলা লেখা বা রোমান হরফকে বাংলায় রূপান্তর করার প্রবণতা তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত করছে। আশার কথা, সরকার ২০১৭ সাল থেকে ভাষার জন্য ১৬টি টুলস ব্যবহারের লক্ষ্যে ১৫৯ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, 'বাংলার রায় লেখা হচ্ছে- যা আমাদের আনন্দিত করেছে। সমস্যা হচ্ছে মৌলিক আইনগুলো ইংরেজি ভাষায় লেখা। সেগুলো বাংলায় ভাষান্তর করা আবশ্যক হয়ে পড়েছে। সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সমন্বয় করে আইনগুলো বাংলায় ভাষান্তর করতে হবে। বাংলায় রায় হলে বিচারপ্রার্থী নিজেরাই রায় বুঝতে পারবেন। সব দেশেই আদালতের ভাষা তাদের নিজস্ব ভাষা।'

সেলিনা হোসেন বলেন, 'বাংলা সাহিত্য বহির্বিশ্বে তুলে ধরার উদ্যোগ খুবই কম। মানসম্মত অনুবাদের মাধ্যমে এই সাহিত্য বহির্বিশ্বে তুলে ধরতে পারলে তা সাহিত্যের সমৃদ্ধি ঘটাবে।'

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, 'উন্নয়নের ইতিহাসের সঙ্গে ভাষার ইতিহাস জড়িত। জাপানের উন্নয়নের মূল কারণ মাতৃভাষাকে গুরুত্ব আরোপ। বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম। আমাদের নিজস্ব ভাষানীতি নেই। ভাষা ইনস্টিটিউটের কাজ দৃশ্যমান নয়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়িতে ইনস্টিটিউট করে ভাষার জন্য অগ্রসর হতে পারি কিনা দেখতে হবে।'

আরোমা দত্ত এমপি বলেন, 'বাংলা ভাষা চর্চার জন্য রাজনৈতিক নীতি ঠিক করতে হবে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার ও মান বজায় রাখার জন্য বড় বরাদ্দও দরকার।'

অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, 'পৃথিবীর ভাষাসংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশেও ভাষার সংখ্যা কমছে। মাতৃভাষায় জ্ঞানচর্চার উদ্যোগ খুবই কম। বাংলায় বিশাল তথ্যভান্ডার তৈরি করে তা ভাষার প্রসারের জন্য সর্বক্ষেত্রে ব্যবহার করতে হবে।'

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)