আবিরন হত্যার রায়

ন্যায়বিচার পাক নির্যাতিত অভিবাসীরা

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ড. তাসনিম সিদ্দিকী

সৌদি আরবে বাংলাদেশি গৃহকর্মী আবিরন বেগম হত্যা মামলার রায় দিয়েছেন রিয়াদের একটি আদালত। রায়ে গৃহকর্ত্রীর মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি গৃহকর্তার তিন বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এই রায় অভিবাসনের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ। আমরা জানি, অভিবাসনের দেশগুলোতে বিশেষ করে সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতে আইন খুবই শক্তিশালী। বাংলাদেশ থেকে অভিবাসন করতে গিয়ে ওই দেশগুলোতে অনেকেই অত্যাচার, নির্যাতন এমনকি হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন। এসব ঘটনা যদি সেখানে আইনি প্রক্রিয়ায় নিয়ে যাওয়া এবং ভুক্তভোগীকে সেখানে রেখে মামলা শেষ পর্যন্ত চালিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে ইতিবাচক ফল আসবে- আবিরন বেগম হত্যা মামলার রায় তা-ই প্রমাণ করে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, এসব ঘটনায় কোনো মামলা হয় না; অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ভুক্তভোগীকে সেখানে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব হয় না অথবা ভুক্তভোগী নিজেও সেখানে থাকতে চান না। এমন পরিস্থিতিতে আর বিচার পাওয়া যায় না। তবে আবিরনের ঘটনাটি একটি ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যদি মামলা লড়া যায়, তাহলে অনেক নির্যাতিত অভিবাসী ন্যায় বিচার পেতে পারেন।

আবিরনের ঘটনা আমাদের বেশকিছু দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করেছে। নারীকর্মী অভিবাসনের ক্ষেত্রে সরকারি ব্যবস্থাপনা এমন হতে হবে, যেখানে কোনো সহিংসতার অভিযোগ উঠলে সে বিষয়ে আইনি লড়াই করতে দূতাবাসে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রাখতে হবে। আবিরনের মামলার আইনি লড়াইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি দূতাবাস যে ভূমিকা পালন করেছে, একই ভূমিকা রাখতে হবে এমন অন্য ঘটনার ক্ষেত্রেও। তা নিয়মে পরিণত করতে হবে। একই সঙ্গে এ ধরনের যত ঘটনা ঘটবে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব রাখতে হবে দূতাবাসকে; যেমনটি শ্রীলঙ্কা করে থাকে। মনে রাখতে হবে, অভিবাসী নারী শ্রমিকরা দেশের সম্মানিত নাগরিক। তারা পরিবার ও দেশের মঙ্গলের জন্য অভিবাসন করে থাকেন। সুতরাং তাদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত এসব ঘটনা নারীর অভিবাসন বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে অনেককে সোচ্চার করে তোলে। আমরা কোনো অবস্থাতেই বিদেশে নারী নির্যাতন বা মৃত্যু যেমন চাই না, তেমনি এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে নারী অভিবাসনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপের যে চেষ্টা চলে, সেটাকেও সমর্থন করি না। আমরা চাই, অভিবাসনের দেশগুলোতে আইনি প্রক্রিয়া ব্যবহার করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হোক।

গবেষণায় দেখা যায়, নারী শ্রমিকদের অভিবাসন খরচ খুবই কম। অনেক ক্ষেত্রে শূন্য খরচে তাদের অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু দেড় বছর আগে আমাদের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, একজন নারীর অভিবাসনের ক্ষেত্রে কম-বেশি ৯০ হাজার টাকা ব্যয় হয়, যেখানে একজন পুরুষের ক্ষেত্রে ব্যয় হয় পাঁচ হাজার ডলারের সমমান টাকা। একজন পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় একজন নারী শ্রমিক অত্যন্ত কম খরচে বিদেশে যেতে পারছেন। বিদেশে যেতে একজন নারী শ্রমিকের যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়, অভিবাসনের পর কম-বেশি পাঁচ মাসের মধ্যে তিনি তা তুলে আনতে পারেন। কিন্তু পুরুষ শ্রমিকের খরচের এ টাকা তুলে আনতে সময় লাগে দুই থেকে তিন বছর। এ পরিস্থিতিতে তারা হতাশায় ভোগেন এবং তাদের অনেকেই অধিক অর্থ উপার্জনের লক্ষ্যে কর্ম বদলে অনিয়মিত অভিবাসনের পর্যায়ে চলে যান। সেদিক থেকে নারী অভিবাসন বেশ গোছালো ও খরচ কম। এখন প্রয়োজন নারী অভিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যাতে আবিরনের মতো আর কেউ এমন নির্মমতার শিকার না হন।

নারী অভিবাসীদের মধ্যে ৮০ শতাংশই কাজ করেন তিনটি পেশায়। এক. কেয়ারগিভার, দুই. ক্লিনার, তিন. গৃহকর্মী। আর পুরুষ শ্রমিকরা ১৭-১৮ পেশায় কাজ করার সুযোগ পান। আবার নারী শ্রমিকরা যেসব পেশায় যান সেগুলোতে বেতন বৃদ্ধির সম্ভাবনা কম। তারা হয়তো গড়ে ১৭ হাজার টাকার মতো বেতনে বিদেশে যান। সেই বেতন বেড়ে সর্বোচ্চ ২০-২২ হাজার পর্যন্ত হয়ে থাকে। অল্প কিছু ক্ষেত্রে ২৫-৩০ হাজার হয়। অথচ পুরুষ শ্রমিকরা গড়ে ২০ হাজার টাকা বেতনে সেখানে যান এবং পরে তাদের বেতন বেড়ে ৩৫-৪০ হাজার পর্যন্ত হয়। সেই সঙ্গে পুরুষ শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ থাকে। এ ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়ানোর তেমন সুযোগ থাকে না। কারণ, তারা চাকরি শুরু করেন গৃহে, শেষও করেন গৃহে। আবিরনের ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। নারী শ্রমিকদের অন্য কাজেও বিদেশে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। এটা করতে হলে অভিবাসনের আগেই তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। আমরা যদি স্থির করি, অভিবাসনের দেশে কেয়ারগিভার পাঠাব, তাহলে শুধু সনদবিহীন কেয়ারগিভার না পাঠিয়ে এসএসসি পাস নারীদের ছয় মাস থেকে এক বছরের প্রশিক্ষণ দিয়ে ক্ষমতায়িত করতে পারি; তাহলে তারা বিদেশে বিশেষ পেশায় যেতে পারবেন। তারা গৃহে নির্যাতনের ঘটনার শিকার হবেন না।

আবিরনের ঘটনায় সরকার সৌদি আরবের বিচার বিভাগকে সাধুবাদ জানিয়েছে। আমরাও তাদের সাধুবাদ জানাই। এ ধরনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অভিবাসনের দেশগুলোতে শেল্টার হোমের ব্যবস্থা রাখার কথা আমরা বরাবরই বলে এসেছি; যেখানে নিগ্রহের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের থাকার ব্যবস্থা করা হবে এবং সেখানে রেখেই তাদের ন্যায় বিচার পেতে সার্বিক সহায়তা করতে হবে। আমরা জানি, একজন নারী শ্রমিক ওইসব দেশে তিনবার পর্যন্ত গৃহকর্তা বদলাতে পারেন, যদি প্রমাণ করা যায়- ওই গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রী তার ওপর কোনো অন্যায় বা নির্যাতন করেছেন। এ ধরনের ব্যবস্থাপনার অভাবে নির্যাতনের শিকার অনেকেই শূন্য হাতে দেশে ফিরে আসেন। যদি এ ধরনের ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে তারা গৃহকর্তা বদলাতে পারবেন। সুতরাং আমাদের পুরো ব্যবস্থাপনাই ঢেলে সাজানো দরকার। ভুক্তভোগীদের দেশে ফেরত না পাঠিয়ে বিচারমুখী করতে হবে।

প্রতি বছর অনেক নারী লাশ হয়ে ফিরে আসেন। এই নারীদের ময়নাতদন্ত যেন যথাযথভাবে করা হয়। অভিবাসনের দেশগুলো তাদের যে মৃত্যুসনদ পাঠায়, আমরা যেন শুধু এর ওপর নির্ভর না করি। কারণ, অধিকাংশ মৃত্যুকে তারা স্বাভাবিক বলে দাবি করে থাকে। হয়তো অনেকের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। কিন্তু মৃত্যুর আগে তাদের ওপর কোনো নির্যাতন করা হয়েছে কিনা, তাদের শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন আছে কিনা- এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। ময়নাতদন্তে যদি তাদের পাঠানো প্রতিবেদনের কোনো ভুল পরিলক্ষিত হয়, তাহলে সেই প্রতিবেদনও ওই দেশগুলোতে পাঠাতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, সরকারি বয়সসীমার চেয়ে কম বয়সের নারীদের ওইসব দেশে পাঠানো হয়েছে। কিছুদিন আগেও ১৩ বছরের এক মেয়ের লাশ ফেরত এসেছে। এসব ক্ষেত্রে দেখতে হবে কোন এজেন্সি এই বয়সের নারীদের সেখানে পাঠায় এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে কারা তাদের ছাড়পত্র দেয়। এসব বিষয়ে গুরুত্ব বাড়ালে নারী অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা অনেকাংশেই কমে আসবে।

অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; চেয়ারম্যান, রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)

tsiddiqui59@gmail.com

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)