রাইখালী কৃষি গবেষণা কেন্দ্র

পাহাড়ি কৃষির আঁতুড়ঘর

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১

জাহিদুর রহমান, রাঙামাটি থেকে ফিরে

রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের রাইখালীতে পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র সমকাল

চারদিকে সবুজ পাহাড়। তার কোল ঘেঁষে বইছে কর্ণফুলী নদী। শান্ত সেই নদীর মোহনায় দাঁড়িয়ে আছে রাইখালীর পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র। রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের রাইখালীতে পাহাড়ি কৃষির উন্নয়নে ১৯৭৬ সালে ৯৬ একর জমিতে গড়ে তোলা হয় এ কেন্দ্র। গত ৪৪ বছরে ১৯টি উদ্যানতাত্ত্বিক বিভিন্ন ফল ও সবজির উন্নত জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এ অঞ্চলের কৃষকের বাতিঘর হিসেবে কাজ করছে।

খাগড়াছড়িতে আরও দুটি গবেষণা কেন্দ্র থাকলেও রাইখালীই বিভিন্ন ফল ও সবজির সবচেয়ে বেশি জাত আবিস্কারে ভূমিকা রেখেছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটে ভুগছে কৃষি বিজ্ঞানীদের গবেষণার এ আঁতুড়ঘর। গবেষণাগার ও সীমানাপ্রাচীর না থাকা, নদীভাঙন, জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকট এসবের মধ্যে অন্যতম।

সম্প্রতি সরেজমিন জানা গেছে, পাহাড়ে চাষ উপযোগী ফসলের জাত এবং অন্যান্য কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করাই পাহাড়ি কৃষি গবেষণার মূল কাজ। এ পর্যন্ত ১৯টি জাত আবিস্কার করে আলোড়ন তুলেছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) আওতাধীন রাইখালী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রটি। এর মধ্যে ৯টি ফল ও সবজির জাত পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে।

গবেষণা কেন্দ্রে গত তিন বছরে নতুন তিনটি ফলের উন্নত জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ বছর উদ্ভাবিত আরও দুটি নতুন জাত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। শুধু জাত উদ্ভাবন নয়, মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয় এখানে। ময়মনসিংহ বিশ্ববিদ্যালয় জাম পল্গাজন সেন্টারের পর প্রজাতি সংগ্রহের দিক দিয়ে রাইখালী দেশের দ্বিতীয় কৃষি প্রতিষ্ঠান বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

রাইখালী পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কৃষিবিদ ড. মো. আলতাফ হোসেন সমকালকে বলেন, বর্তমানে ৬৫ প্রকারের ফলগাছ আছে এই কেন্দ্রে। এগুলোর মধ্যে ২৫টি জাত নিয়ে গবেষণা চলছে। সবজির মধ্যে ১০টি জাত নিয়ে চলছে গবেষণা। ৩৭ প্রকারের শুধু বেল গাছের সংগ্রহ রয়েছে কেন্দ্রটিতে। এখানে এমন সব ফলদ ও বনজ গাছ রয়েছে, যা দেশের অন্যান্য গবেষণা কেন্দ্রেও নেই।

গত বছরও এখানে বারি জাম-১ নামে একটি জাত উদ্ভাবন হয়েছে। বারি কতবেল-২ নামে একটি জাতের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে অনুমোদনের জন্য। বর্তমানে কাজ চলছে বারি বেল-২ নিয়ে। যার কষ নেই, অথচ খেতে ক্রিমের মতো। বারি মহাপরিচালকের কাছে অচিরেই এ বিষয়ে প্রস্তাবনা যাবে। বছরে ২০ হাজারের মতো বিভিন্ন ফসলের চারা বিতরণ করা হচ্ছে কেন্দ্র থেকে।

তবে কাজ করতে গিয়ে এই গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা পদে পদে সমস্যায় পড়ছেন। কারণ রাইখালীর গবেষণা কেন্দ্রের চারপাশের অধিকাংশ স্থানে এখনও সীমানাপ্রাচীর ওঠেনি। ফলে অনেকটা অরক্ষিত থাকছে বিশাল এই এলাকা। প্রায়ই গরু-ছাগল ঢুকে নষ্ট করছে গবেষণার গাছপালা ও ফল। চুরির ঘটনাও ঘটে মাঝেমধ্যে।

গবেষণা কেন্দ্রটির ওপর দিয়ে বয়ে গেছে একটি খাল। সেটিতে ইদানীং ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে গবেষণারত ফলদ ও বনজ জমির বেশকিছু অংশ খালে তলিয়েও গেছে। এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আগামী বর্ষায় ভাঙন তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পাহাড়ি কৃষিতে অনন্য ভূমিকা রাখলেও কেন্দ্রটিতে নেই কোনো গবেষণাগার বা ল্যাব। ফলে পরীক্ষার-নিরীক্ষার জন্য গাছ কিংবা ফল পাঠাতে হয় গাজীপুরে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে। এতে একদিকে সময় বেশি লাগছে, আবার অনেক সময় সঠিক ফল পাওয়া যাচ্ছে না। নষ্ট হচ্ছে গুণাগুণ, ব্যয় হচ্ছে বেশি অর্থ। ব্যাহত হচ্ছে গবেষণাকাজ।

গবেষণা কেন্দ্রটিতে ৩৭টি পদ থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে এখানে জনবল আছে মাত্র ১৮ জন। বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার নয়টি পদ থাকলেও আছেন মাত্র দু'জন। বৈজ্ঞানিক সহকারীর পদ রয়েছে ছয়টি, আছেন দু'জন। ২০ জন মালীর পদ থাকলেও দু'জন দিয়ে চালাতে হচ্ছে বিশাল এ কেন্দ্রের কাজকর্ম। ১৮ জন নিরাপত্তা প্রহরী থাকার কথা থাকলেও মাত্র দু'জন দিয়ে চলছে পাহারার কাজ। এখানে নেই কোনো গাড়িচালক। প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার গাড়ি চালাচ্ছেন একজন ট্রাক্টর ড্রাইভার। নেই কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মীও। উচ্চমান সহকারীর পদ থাকলেও বাস্তবে কেউ নেই। অন্য পদগুলোতেও নেই পর্যাপ্ত জনবল।

কাপ্তাই ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী চন্দ্রঘোনা ফেরিঘাট এলাকার কর্ণফুলী নদীতে একটি ব্রিজের অভাবে রাইখালী গবেষণা কেন্দ্রটি পাহাড়ি কয়েকটি জনপদ থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এ নদী পার হতে হয় ফেরি দিয়ে। ফেরির অন্য পাড়ের কৃষকরা সহজে রাইখালীতে আসতে পারেন না।

রাইখালী পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কৃষিবিদ ড. মো. আলতাফ হোসেন সমকালকে বলেন, এত সংকটের মধ্যেও আমরা গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। কর্তৃপক্ষকে সমস্যার বিষয়গুলো জানানো হয়েছে। এগুলো দূর হলে কেন্দ্রটি কৃষি গবেষণায় আরও আলো ছড়াবে।







© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)