একা হয়ে যাচ্ছেন কাদের মির্জা

২৬ ফেব্রুয়ারি ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২১ । ০১:৩৬

জাহিদুর রহমান, নোয়াখালী থেকে ফিরে

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা অবশেষে কিছুটা শান্ত হয়েছেন। একের পর এক বিস্ম্ফোরক বক্তব্য দিয়ে নোয়াখালীর সীমানা ছাড়িয়ে সারাদেশে আলোচনায় আসা এই নেতা নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নিয়েছেন রাজনীতির মাঠ থেকে।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, একা হয়ে পড়ছেন; তাই প্রায় দুই মাস পর গত মঙ্গলবার থেকে আর কোনো কর্মসূচি দিচ্ছেন না সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই আবদুল কাদের। অনেকটা বন্ধুহীন হয়ে, দলে কোণঠাসা হয়ে থামতে হলো তাকে, ছাড়তে হলো রাজপথ। কর্মসূচি না থাকায় উপজেলার পরিস্থিতিও এখন স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।

গত ৩১ ডিসেম্বর নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাট পৌরভবন চত্বরে পৌর নির্বাচনে নিজের ইশতেহার ঘোষণার সময় হঠাৎ বিস্ম্ফোরক বক্তব্য দেন আবদুল কাদের মির্জা। 'সুষ্ঠু নির্বাচন হলে নোয়াখালীর এমপিরা পালানোর দরজা খুঁজে পাবেন না'- এমন বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি। তার পর থেকে অনর্গল বিভিন্ন বক্তব্য দেন তিনি দু'মাস ধরে। কখনও বৃহত্তর নোয়াখালীর, আবার কখনও কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে আলোড়ন তোলেন তিনি। তার কথার হুল থেকে বাদ যাননি বড় ভাই ওবায়দুল কাদেরও। তার 'অতিকথনে' ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে পড়েন কেন্দ্রীয় নেতারাও।

এ সময় থানা ঘেরাও, মানববন্ধন, হরতাল, সংবাদ সম্মেলনসহ নানা কর্মসূচিতে স্থবির হয়ে পড়ে বসুরহাট। এক পর্যায়ে তার 'সত্যকথন' রূপ নেয় সংঘাতে। গত শুক্রবার কোম্পানীগঞ্জে কাদের মির্জার অনুসারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলের অনুসারীদের। গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মোজাক্কির। সংঘর্ষের পর থানায় চারটি মামলা হয়। তার পর থেকে শুরু হয় আবদুল কাদের মির্জার পিছু হটা।

গত শনিবার সকালে থানা ঘেরাও করতে গেলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে তাড়িয়ে দেয় কাদের মির্জা ও তার অনুসারীদের। ওই দিন বাদল ও কাদের মির্জা পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানেও কাদের মির্জাকে অনেকটা নিঃসঙ্গ দেখা যায়। এক সপ্তাহ আগেও তার সঙ্গে মাঠে থাকা অন্তত ৫০ শীর্ষ নেতাকর্মী সংহতি জানান মিজানুর রহমান বাদলের সঙ্গে। অনেকটা একা হয়ে পড়েন তিনি।

শুধু নেতাকর্মী নন- কাদের মির্জার ভাগ্নে মাহবুবুর রশিদ মঞ্জু, ফখরুল ইসলাম রাহাত এবং সালেকিন রিমনও তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এই তিন ভাগ্নের সঙ্গে কথা হয় সমকালের। অভিন্ন সুরে তারা সমকালকে বলেন, তাদের মামার গত দুই মাসের আচরণে সবাই বিব্রত। তিনি একদিকে অপরাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বলছেন, অন্যদিকে কোম্পানীগঞ্জে হরতালসহ নানা কর্মসূচি দিয়ে অচলাবস্থা তৈরি করেছেন। নোয়াখালীর গর্ব ওবায়দুল কাদেরকে নিয়েও নানা আপত্তিকর কথা বলছেন তিনি। তাই আমরা আত্মীয় হয়েও তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি।

কোম্পানীগঞ্জের এক আওয়ামী লীগ নেতা সমকালকে বলেন, আবদুল কাদের মির্জাকে থামাতে মিজানুর রহমান বাদলকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও নোয়াখালী-৪ আসনের সাংসদ একরামুল করিম চৌধুরী।

তবে এ বিষয়ে মিজানুর রহমান বাদল জানান, তিনি কারও দ্বারা প্ররোচিত হয়ে মির্জা কাদেরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি। তারা এতদিন ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই হিসেবে তাকে সম্মান করেছেন। কিন্তু কাদের মির্জা এখন কোম্পানীগঞ্জে একক আধিপত্য কায়েম করতে চাইছেন। তিনি যখন তাদের নেতা ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেছেন, তখন তারা আর চুপ থাকতে পারেননি। নেতার সম্মান রক্ষায় তারা মাঠে নেমেছেন।

এ বিষয়ে একরামুল করিম চৌধুরী বলেন, আবদুল কাদের মির্জার বিষয়ে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি তার বিষয়ে কোনো কথা বলতে চান না।

শুধু দলীয় নেতাকর্মী নন, সম্প্রতি মুফতি ইউনুছ নামে এক নেতাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে কাদের মির্জার বিরুদ্ধে মাঠে নামে নোয়াখালী জেলা হেফাজতে ইসলাম। এ ছাড়া মির্জার আচরণে কোম্পানীগঞ্জ থানায় কর্মরত ১০ পুলিশ কর্মকর্তা ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে একযোগে বদলির আবেদন করেছেন বলেও নিশ্চিত করেন কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মীর জাহেদুল হক রনি।

এমন পরিস্থিতিতে সবকিছু কঠোর হাতে সামাল দিতে কয়েকদিন আগে স্থানীয় পুলিশের কাছে হাইকমান্ডের নির্দেশনা আসে বলে জানা গেছে। এরপরই ১৪৪ ধারা জারিসহ সভাসমাবেশ দমনে তৎপর হয়ে ওঠে প্রশাসন। দুই মাস আগে বসুরহাটের রূপালী চত্বরে নির্মিত কাদের মির্জার মঞ্চ গত মঙ্গলবার খুলে নিয়ে যায় পুলিশ। এ ছাড়া কোম্পানীগঞ্জে দলীয় সব কার্যক্রম স্থগিত করে জেলা আওয়ামী লীগ। আবদুল কাদের মির্জা গত মঙ্গলবারের পর দলীয় কোনো কার্যক্রম চালাননি। তবে মাঝেমধ্যে তিনি করোনার টিকা দেওয়ার বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন। এই কার্যক্রমেও আগের মতো আর লোকজন দেখা যাচ্ছে না। গুটি কয়েক কর্মী-সমর্থককে নিয়ে তিনি মাঝেমধ্যে বের হচ্ছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, শুরুর দিকে কাদের মির্জার বক্তব্য মানুষ ভালোভাবে নিলেও পরে অতিকথনের কারণে সবাই ত্যক্তবিরক্ত হয়ে পড়েন। এদিকে কাছের লোকদেরও মির্জা বিশ্বাস করতে পারছেন না। একেক সময় একেকজনকে লাঞ্ছিত করছেন। দলীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, প্রশাসন ও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের আনুকূল্য না পাওয়ায় ধীরে ধীরে তার কাছের লোকজনও দূরে সরে যাচ্ছেন। তবে আরও আগে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ ও প্রশাসন এ বিষয়ে কঠোর হলে পরিস্থিতি এতটা উত্তপ্ত হয়ে উঠত না বলে মনে করেন এই নেতা।

এসব বিষয়ে জানতে আবদুল কাদের মির্জাকে ফোন করলে তিনি বলেন, 'আগামী দুদিন আমি আর এসব বিষয়ে কথা বলতে চাই না। দুদিন পর ফোন দিলে আমি আপনার সঙ্গে কথা বলব।'

নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এএইচএম খায়রুল আনম চৌধুরী সেলিম বলেন, আমরা কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রম স্থগিত করেছি। এখন পরিস্থিতি বেশ শান্ত। আশা করি দ্রুত দলে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।





© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com