নিঃস্ব হয়েই লালদিয়ার চর ছাড়ল হাজারো মানুষ

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২১

চট্টগ্রাম ব্যুরো

সোমবার লালদিয়ার চরে উচ্ছেদ অভিযানের সময় এভাবে ঘর ছাড়েন সেখানকার বাসিন্দারা-সমকাল

কুলসুমা বেগমের বয়স ৪২। লালদিয়ার চরেই জন্ম তার। বিয়ে এখানেই। এই চরে জন্ম হয়েছে তার তিন সন্তানের। কিন্তু সব মায়া ভুলে গতকাল সোমবার তিন সন্তানসহ জন্মভিটা ছাড়তে হয়েছে তাকে। পঞ্চাশোর্ধ্ব গুলজার বেগমেরও দুঃখের কাহিনি একই রকম। তিন সন্তানসহ তাকেও ছাড়তে হয়েছে জন্মভিটা।

শুধু কুলসুমা কিংবা গুলজার বেগম নন, লালদিয়ার চরের ৫২ একর জমি থেকে সোমবার একইভাবে উচ্ছেদ হয়েছে দুই হাজার ৩০০ পরিবারের ১৪ হাজার মানুষ। ছয়জন ম্যাজিস্ট্রেট ছয়টি জোনে ভাগ হয়ে একযোগে চালান এ উচ্ছেদ অভিযান। অর্ধশতাব্দী ধরে বন্দর কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন জায়গায় বসবাস করে আসছিলেন তারা। কর্ণফুলী নদী রক্ষায় উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকায় সোমবার তাদের উচ্ছেদ করে সীমানাপ্রাচীরে কাঁটাতার দিয়ে দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিদর্শনে গিয়ে বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান বলেন, 'কর্ণফুলী তীর দখলমুক্ত করতে আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ৯ মার্চের মধ্যে এ ব্যাপারে আমাদের প্রতিবেদনও জমা দিতে হবে আদালতে। এটি লালদিয়াবাসীকে আমরা বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। অনেকে তাই স্বেচ্ছায় ছেড়ে গেছেন বন্দরের জায়গা।'

লালদিয়ার চর পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, '২০ দিন ধরে প্রশাসনকে আমরা নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। অসহায় মানুষের আর্তনাদ শোনেনি কেউ। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের আকুল আবেদন, অসহায় মানুষদের পুনর্বাসন করুন। নিজ দেশে তাদের গৃহহীন করবেন না।'

প্রতিরোধ করার ঘোষণা দিয়েও সরে আসার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিভিন্ন দিক থেকে যেভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছিল, তাতে আমাদের উচ্ছেদ মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, উচ্ছেদ অভিযান শুরুর আগেই লালদিয়ার বাসিন্দারা কাঁচা, সেমিপাকা, পাকা বসতবাড়ি, ভাড়াঘর, দোকানপাট ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে। সাত দিন ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় অনেকেই স্বেচ্ছায় ছেড়ে গেছেন ভিটেমাটি। আবার বাড়িঘর ভেঙে নামমাত্র মূল্যে লোহালক্কড়, টিন, ইট, বাঁশ ইত্যাদি ঘটনাস্থলেই বিক্রি করে দিতে দেখা যায় অনেককে। এ সময় নারী-শিশুদের কান্না, আহাজারিতে সৃষ্টি হয় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের। গৃহপালিত গরু-ছাগল নিয়ে অনেকে ভিটেমাটি ছেড়েছেন অশ্রুসজল চোখে।

লালদিয়ার চরের বাসিন্দারা বলছেন, তাদের নিস্কণ্টক জায়গার পরিবর্তে ৪০০ পরিবারকে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে লালদিয়ার চরে জায়গা দেওয়া হয়েছিল ১৯৭২ সালে। নদী রক্ষার কথা বলে ৪৯ বছর পর তাদের উচ্ছেদ করা হলো। আবেগতাড়িত কণ্ঠে লালদিয়ার চর মসজিদ কমিটির সভাপতি আবদুল কাদের বলেন, 'আমাদের আজ মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। রান্না করার মতো খাবার নেই। অথচ এখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়, তিনটি মসজিদ, দুটি কিন্ডারগার্টেনসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ১৯৭২ সালে এ জায়গা পেয়েছি। ডিসি অফিসে খাজনা দিয়েছি দুই বছর। প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি, আমাদের পুনর্বাসন করা হোক।

স্মরণকালের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে সোমবার উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। সাত শতাধিক পুলিশ, দুই শতাধিক র‌্যাব ও আনসার নিয়ে উচ্ছেদ শুরু করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আগেই চিঠি দিয়েছিল তারা। ছয়জন ম্যাজিস্ট্রেট একযোগে শুরু করেন অভিযান। আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদেরও গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

বন্দরের ডেপুটি এস্টেট ম্যানেজার জিল্লুর রহমান বলেন, 'আমরা আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেছি। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে শনিবার অনুষ্ঠিত বৈঠকেও বিষয়টি এভাবে তুলে ধরেছেন বন্দর চেয়ারম্যান। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় ফোর্স চাওয়া হয়েছে। সবার সহযোগিতায় আমরা আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ভূমি পুনরুদ্ধার করেছি।'

নগরীর পতেঙ্গায় বিমানবন্দর ঘাঁটি সম্প্রসারণের জন্য ১৯৭২ সালে কয়েক হাজার স্থানীয় বাসিন্দাকে সরিয়ে লালদিয়ার চরে পুনর্বাসন করে তৎকালীন সরকার। ১৯৭৫ সালের পর বিভিন্ন আইনি জটিলতায় লালদিয়ার চরের ওই ভূমি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুকূলে বিএস জরিপে অন্তর্ভুক্ত হয়। দীর্ঘদিন এ ভূমি বেদখল অবস্থায় ছিল। আদালতের নির্দেশে সোমবার তা পুনরুদ্ধার করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com