জ্ঞানচর্চায় গ্রন্থাগার

প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২১

ড. কাজী ছাইদুল হালিম

ফাইল ছবি

সম্প্রতি পার হয়ে গেল জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস। চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি একটি সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত খবরে বলা হয়, সরকারি-বেসরকারি সব মিলিয়ে বাংলাদেশে গ্রন্থাগারের সংখ্যা প্রায় এক হাজার ৩০০; যার মধ্যে মাত্র ৭১টি সরকারি, ৮০০টির মতো নিবন্ধিত এবং বাকিগুলো অনিবন্ধিত। সাড়ে ১৬ কোটি জনসংখ্যার একটি দেশে সর্বসাকল্যে গ্রন্থাগারের সংখ্যা এক হাজার ৩০০। অর্থাৎ প্রতি এক লাখ ২৭ হাজার মানুষের জন্য মাত্র একটি গ্রন্থাগার, যা নিতান্তই অপ্রতুল!

একটি দেশের মানবসম্পদের উন্নয়নে, জ্ঞানচর্চায়, নতুন জ্ঞানের সৃষ্টিতে এবং মননশীল জাতি গঠনে পাঠাগারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। পাঠাগার বলতে আমরা সাধারণত বই-পুস্তক ও পত্র-পত্রিকার পাঠ্যস্থল বোঝাই। পাঠাগার নিয়ে এই যে প্রথাগত ধারণা শুধু বই-পুস্তক ও পত্র-পত্রিকার পাঠ্যস্থল, তা কিন্তু ক্রমে বদলে যাচ্ছে। বর্তমান কালের পাঠাগার বই-পুস্তক ও পত্র-পত্রিকার পাঠ্যস্থল ছাড়াও আরও অনেক প্রকার সেবা প্রদান করে থাকে; যেমন- বই ধার দেওয়া, জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, গান শোনার ব্যবস্থা, ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের মিলন স্থান, মিটিংরুম প্রদান ইত্যাদি। এতদসত্ত্বেও বই-পুস্তক ও পত্র-পত্রিকার পাঠ্যস্থল হিসেবে পাঠাগারের গুরুত্ব এখনও রয়ে গেছে একেবারে শীর্ষে। আগামীতেও থাকবে, এটা নিশ্চিত।

বই পড়ার উপকারের কথা বলে শেষ করা যাবে না। তাই বই পড়ার প্রতিটি উপকারের কথা এই লেখায় বলতেও চাই না। তবে বই পড়ার উপকারের নিজ অভিজ্ঞতার দু-একটি কথা না বললেই নয়। আমার মা নিয়মিত বই পড়তেন। সেই সূত্র ধরে একসময় বই পড়া আমারও অভ্যাসে পরিণত হয়। স্কুল শুরুর কয়েক বছর পরেই স্থানীয় জনৈক ব্যক্তির বইয়ের দোকানে নিয়মিত যাতায়াত শুরু হয়। শুরু হয় বই কেনা ও বই পড়া। আমি স্কুলের বা ক্লাসের বইয়ের কথা বলছি না, বলছি বিভিন্ন শিক্ষণীয় বইয়ের কথা। এসএসসি পাস করে যখন ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজে ভর্তি হই, তখন সুযোগ পেলেই নীলক্ষেত ও নিউমার্কেটের বইয়ের দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়ানো একটা অভ্যাস হয়ে দাঁড়াল; হাতখরচের পয়সার বেশিরভাগই বই কেনার পেছনে ব্যয় হতো। তারপর কলেজ শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নীলক্ষেত আর নিউমার্কেটের বইয়ের দোকানে দোকানে ঘোরার অভ্যাসটা আরও বাড়ল বৈ কমলো না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আরও যা যোগ হলো তা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরি ও পাবলিক লাইব্রেরিতে বই পড়তে যাওয়া। বই পড়া এখনও আমার অভ্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম। আমি বলব, আপনি নিয়মিত বই পড়ুন, নিজের জ্ঞান সমৃদ্ধ করুন, সমাজকে জ্ঞান সমৃদ্ধ করতে সহায়তা করুন। জ্ঞানের চর্চা এবং নতুন জ্ঞানের সৃজন সমাজ উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।

বই পড়ার ক্ষেত্রে যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে তা হলো গ্রন্থাগারের নিকটতা এবং বই কেনার অভ্যাস। আর ছোটদের বই পড়ার অভ্যাসটা কিন্তু আসে বড়দের কাছ থেকে। তাই একজন অভিভাবক হিসেবে আপনি নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস করুন; স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার সন্তান সেই অভ্যাস রপ্ত করে নেবে। মনে রাখবেন, আপনার সন্তান কিন্তু আপনারই প্রতিচ্ছবি। বই কিনে কিন্তু কেউ কখনও দেউলিয়া হয় না। পক্ষান্তরে, বই কিনে জ্ঞানের দিক দিয়ে অনেক ধনী হওয়া যায়। বাড়িতে বই কিনুন, অন্যকে বই উপহার দিন এবং বই পড়ার জন্য নিয়মিত গ্রন্থাগারে যান। আর এ জন্য যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে বাংলাদেশে লাইব্রেরির সংখ্যা বাড়ানো।

সরকারি-বেসরকারি স্কুল এবং স্থানীয় সরকার পর্যায়ে এটা ভাবার এখন উপযুক্ত সময় যে, কীভাবে বাংলাদেশে গ্রন্থাগারের সংখ্যা বাড়ানো যায়। গ্রন্থাগারের সংখ্যা বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে থাকতে পারে- এক. প্রতিটি জেলা সদরে সরকারি উদ্যোগে একটা করে বহু কার্যসম্পাদনকারী গ্রন্থাগার স্থাপন করা; দুই. সরকারি উদ্যোগে প্রতিটি উপজেলা সদরে একটি করে মডেল পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করা; তিন. প্রতিটি পৌরসভার উদ্যোগে পৌরসভা পর্যায়ে একটি করে পাঠাগার স্থাপন করা; চার. প্রতিটি পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড পর্যায়ে ছোট ছোট পাঠাগার স্থাপন করা সংশ্নিষ্ট ওয়ার্ডের মেম্বার বা কাউন্সিলরদের উদ্যোগে এবং পাঁচ. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শর্ত অনুযায়ী প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকবে নিজস্ব পাঠাগার। এভাবে গ্রন্থাগারের সংখ্যা বাড়লে মানুষ বই পড়ার প্রতি ঝুঁকবে; জ্ঞানচর্চা হবে, নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি হবে। জাতি হবে মননশীল। কিশোর-যুবকদের অপরাধ প্রবণতা কমবে। কিশোর গ্যাংয়ের সৃষ্টিও অনেকটা বন্ধ হয়ে যাবে। যুবকরা মাদক ছেড়ে বই পড়ায় মনোনিবেশ করবে।

একটি জাতির জ্ঞানচর্চায় লাইব্রেরি যে বিশেষ অবদান রাখতে পারে, তা আমরা খুব সহজেই দেখতে পাই প্রাচীন এথেন্সের হার্ডিয়ান্স লাইব্রেরি সম্পর্কে অবগত হলে, যার প্রতিষ্ঠাকাল ১৩২-১৩৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। বর্তমানে হার্ডিয়ান্স লাইব্রেরির ধ্বংসাবশেষ ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই। হার্ডিয়ান্স লাইব্রেরি বই সংরক্ষণাগার, পঠন, বক্তৃতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার একটা কেন্দ্রবিন্দু ছিল প্রাচীন এথেন্সে। এভাবে হার্ডিয়ান্সসহ আরও অনেক গ্রন্থাগার প্রাচীন এথেন্সকে পরিণত করেছিল জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার একটা প্রাণকেন্দ্ররূপে।

আমার বর্তমান কর্মস্থল ফিনল্যান্ড যদিও একটা উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন দেশ, তবুও এখানে লাইব্রেরির সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে বৈ কমছে না। আর এভাবে ফিনল্যান্ড ক্রমে পরিণত হচ্ছে একটা 'জ্ঞান সমাজ'-এ। ফিনল্যান্ডের প্রতিটি শহরে একটি করে বড় গ্রন্থাগার আছে। ফিনল্যান্ডের বিভিন্ন শহরের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিগুলোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, এগুলো স্থাপত্য নকশার দৃষ্টিকোণ থেকে বেশ চোখ-ধাঁধানো। আর এ জন্যই এগুলো বিদেশি পর্যটকের কাছে অন্যতম দর্শনীয় স্থান। দর্শনীয় গ্রন্থাগারের দিক দিয়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে যে দুটো গ্রন্থাগার, তা হচ্ছে তাম্পেরের মেতসো এবং হেলসিঙ্কির ওডি। মাত্র ৫৫ লাখ মানুষের দেশ ফিনল্যান্ডে প্রধান এবং শাখা গ্রন্থাগার মিলে সর্বমোট ৭৩৮টি গ্রন্থাগার রয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায় যে, প্রতি সাত হাজার ৪৫২ জন মানুষের জন্য একটি গ্রন্থাগার রয়েছে ফিনল্যান্ডে। ফিনিশরা খুব কম কথা বলে, তবে তারা প্রচুর পড়াশোনা করে। ২০১১ সালের ইউরোস্ট্যাটের গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, বিশ্বের যে জাতিগুলো সবচেয়ে বেশি বই পড়ে, সে তালিকায় ফিনল্যান্ডের অবস্থান ৪ নম্বরে। ফিনল্যান্ডের সঙ্গে আমাদের তুলনা করা খুব একটা যৌক্তিক হবে না, কারণ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এতদসত্ত্বেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জ্ঞান আহরণের কথা চিন্তা করে সীমাবদ্ধ সম্পদের সদ্ব্যবহার করে নতুন নতুন গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। 

গ্রন্থাগার ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে একটি জ্ঞান সমাজে রূপান্তর করতে পারে। এভাবে গ্রন্থাগার থেকে অর্জিত জ্ঞান হতে পারে আমাদের সমৃদ্ধির চাবিকাঠি।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com