ভবন-সেতুতে ধস

নিম্নমানের কাজ, উচ্চ খেসারত

প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ০৩ মার্চ ২১ । ১২:০৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

গত মাসে ঢাকার কেরানীগঞ্জে একটি তিনতলা ভবন ধসে পড়ার পর সেখানে আরও কিছু ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল ভবনের যে চিত্র মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত হয়েছে, তাতে আমরা উদ্বিগ্ন না হয়ে পারি না। নির্মাণবিধি না মেনে জলাশয় ভরাট করে নির্মিত ওই ভবনগুলোতে প্রশাসন 'ঝুঁকিপূর্ণ' নোটিশ সাঁটিয়ে দিলেও ভবন মালিক কিংবা বাসিন্দা কারোরই টনক নড়ছে না। যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনায় সৃষ্টি হতে পারে মর্মন্তুদ পরিস্থিতির। একই দিন সমকালে ভিন্ন একটি সচিত্র প্রতিবেদনে সুনামগঞ্জের পাগলা-জগন্নাথপুর-আউশকান্দি সড়কে নির্মাণাধীন কুন্দানালা সেতুর পাঁচটি 'গার্ডার' ভেঙে পড়ার খবরটিও বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। একই ঘটনা ঘটেছে বগুড়ার শেরপুরে। শেরপুরের বোয়ালকান্দি বেইলি সেতুটি একটি বালুবোঝাই ট্রাকের ভার সইতে না পেরে ধসে পড়ে। উল্লেখিত ঘটনাগুলোর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অভিন্ন। নিয়মনীতি না মানা ও নির্মাণকারীদের লোভ-লালসার কারণেই ঘটনাগুলো ঘটছে। নির্মাণাধীন কিংবা নির্মাণকাজ শেষ হতে না হতেই সেতু-কালভার্ট ভেঙে পড়ার নজির আমাদের সামনে অনেক রয়েছে। আর ভবন বা দালান-বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড অমান্যের অশুভ তৎপরতার খেসারত ইতোমধ্যে খোদ রাজধানীতেই অনেকের জীবনাশের মধ্য দিয়ে দিতে হয়েছে। অবৈধভাবে জায়গা দখল করে দালান বা ভবন নির্মাণ, অধিক লাভের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়ই এর ঊর্ধ্বকরণ ইত্যাদি জীবন-ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে এ পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে গুরুত্ব আরোপ করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও কম উচ্চারিত হয়নি। কিন্তু সবই উপেক্ষা আর হীন স্বার্থের জাঁতাকলে পিষ্ট। জাতীয় নির্মাণবিধি যেন শুধুই কাগুজে। আমরা জানি, অনুপযুক্ত স্থানে দালান বা বহুতল ভবন নির্মাণের পেছনে মূলত দখলদারির অশুভ প্রবণতাই কাজ করে। গত পাঁচ বছরে কেরানীগঞ্জে ভবন হেলে পড়ার ঘটনা ঘটেছে অনেক। কেরানীগঞ্জে এসব ক্ষেত্রে রাজউকের যে কোনোই তদারকি নেই, তা-ই স্পষ্ট। নকশা ছাড়াই চলছে এসব নির্মাণকাজ। আগে সেখানে উপজেলা কর্তৃপক্ষের এ বিষয়গুলো দেখভালের দায়দায়িত্ব থাকলেও ২০১২ সাল থেকে তা চলে যায় রাজউকের অধীনে। ফলে কেরানীগঞ্জে অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে বসবাসের জন্য বাড়ি নির্মাণের অপরিণামদর্শী প্রতিযোগিতার দায় রাজউক এড়াতে পারে না। সড়ক বা জনপথে সেতু-কালভার্ট নির্মাণের তদারকির দায় এলজিইডি কিংবা সড়ক ও জনপথ বিভাগের। কিন্তু এসব কাজে যথাযথ তদারকির অভাব, নিম্নমানের সামগ্রীর ব্যবহার, কাজ না করেই বিল উত্তোলনের মতো অভিযোগ নতুন নয়। আর এর ফলেই ঘটে চলেছে ধসে বা ভেঙে পড়ার ঘটনা। উন্নয়ন কাজের অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি দলের স্থানীয় প্রভাবশালীদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও পুরোনো। মনোজ বসুর 'নিশিকুটুম্ব' উপন্যাসে চুরি-চাতুরীর ও 'নিশ্চিকুটুম্বের' যথেষ্ট 'মিহি কাজের' যে ভূমিকা জানা যায়, তা আমাদের সমাজে ঘটে চলা এসব ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায়। সুনামগঞ্জ ও বগুড়ায় সেতু ধসে পড়ার পেছনে ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে যেসব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, সেসব খতিয়ে দেখে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণই কেবল এই অসমাঞ্জস্যতা দূর করায় ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা আশা করি, এমন ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেজন্য সব ক্ষেত্রেই কর্তৃপক্ষের সার্বক্ষণিক ররি ও তাদরকি দরকার। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের লোভের আগুনে এভাবে তো সর্বনাশের ক্ষেত্র বিস্তৃত হতে পারে না। অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ, হীন স্বার্থ চরিতার্থকরণের লক্ষ্যে সেতু বা যে কোনো অবকাঠামো নির্মাণের এই অশুভ প্রতিযোগিতা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের অপকর্মের খেসারত যেমন সাধারণ মানুষ দিতে পারে না, তেমনি এমন তুঘলকিকাণ্ড সভ্য সমাজে দিরে পর দিন চলতেও পারে না।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com