নিরাময় কেন্দ্রের নামে টর্চার সেল!

প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২১ । ১০:০৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

আতাউর রহমান

পারিবারিক ঝামেলার কারণে মানসিকভাবে বিষণ্ণ ছিলেন ঢাকায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা। তার মা তাকে চিকিৎসার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষার জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন রাজধানীর মালিবাগে অবস্থিত 'হলি লাইফ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে'। এরপরই তাকে টানা তিন দিন ওই কেন্দ্রে শয্যার সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। টানা ১৮ মাস সেখানে তাকে 'চিকিৎসার জন্য বন্দি' করে রাখা হয়। শুধু তাই নয়, 'জিন ছাড়ানোর' নামে চলত নির্মম নির্যাতন।

ওই কর্মকর্তা ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের আগস্ট পর্যন্ত সেখানে চিকিৎসার নামে 'টর্চার সেলে' কার্যত বন্দি ছিলেন। তিনি জানান, ওই বন্দিশালা থেকে জীবন নিয়ে ফিরতে পারলেও সেখানে নির্যাতনের ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন।

গত মঙ্গলবার ওই নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ইয়াসিন ওয়াহিদ নামের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর সেখানে চিকিৎসার নামে নির্যাতনের ভয়াবহতার তথ্য বেরিয়ে আসে। 'চিকিৎসা' নিয়ে ফিরেছেন এমন কয়েকজনের স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি 'ধর্মীয় কায়দায়' চিকিৎসা দেওয়ার কথা বলে অভিভাবকদের আকৃষ্ট করে। এরপর মাসের পর মাস সেখানে মূলত লোকজনকে বন্দি রেখে টাকা আদায় করা হতো। তারা সন্তানদের জন্য ভালো খাবার পৌঁছে দিলেও তা দেওয়া হতো না। পুরো সময়টাতে স্বজনের সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করতে দেওয়া হতো না। চিকিৎসা নিয়ে ফিরেছেন এমন একজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, মাস শেষে টাকা দেওয়ার সময়ে স্বজনরা কেবল অফিসকক্ষ পর্যন্ত যেতে পারেন।

গতকাল মালিবাগ রেলগেটের পাশে ওই নিরাময় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সাততলা একটি ভবনের তৃতীয় থেকে সপ্তম তলা পর্যন্ত নিরাময় কেন্দ্র। তবে চতুর্থ থেকে সপ্তম তলা পর্যন্তই মাদকাসক্ত ও মানসিক অসুস্থদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবশ্য তৃতীয় তলার অফিস পর্যন্ত যাওয়া গেলেও উপরে ওয়ার্ডগুলোতে যাওয়ার অনুমোদন নেই কারও। সিঁড়ির চারপাশ লোহার রড দিয়ে বেড়া দেওয়া এবং পুরো সময় সেখানে তালাবদ্ধ থাকে। প্রতিষ্ঠানটির অফিসকক্ষের কিছু কাগজপত্র ঘেঁটে জানা গেল, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে ৪৫ শয্যার অনুমোদন রয়েছে। কিন্তু গতকালই সেখানে ৬০ জন ভর্তি ছিলেন। আটজন চিকিৎসক আর মনোরোগ বিশেষজ্ঞের নামের তালিকা টানানো থাকলেও জানা গেছে, তাদের অনেকেই সেখানে চিকিৎসা দেন না। উপরের তলাগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থা দেখতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির সেক্রেটারি মেজবাহ উদ্দিন জানালেন, উপরে যাওয়ার কোনো অনুমতি নেই। সেখানে চিকিৎসাধীন কারও সঙ্গে দেখা করা সম্ভব ছিল না বলে জানিয়েছেন নিহত ইয়াসিনের বাবা মাসুম মিয়াও।

মঙ্গলবার শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় ওই নিরাময় কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আয়াজ উদ্দিনসহ চারজনকে আটক করেছে পুলিশ। অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক রিয়াজ উদ্দিন বলেন, এসব অভিযোগ ঠিক নয়। তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসক রয়েছেন। ৮৫ শয্যার জন্য তিনি আবেদন করেছেন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক মু. নুরুজ্জামান শরীফ বলেন, নানা অভিযোগের কারণে সেখানে অতিরিক্ত শয্যার অনুমোদন দেওয়া হয়নি। মঙ্গলবারের ঘটনার বিষয়ে বলেন, পুরো বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com