সহিংসতা বেড়েছে বদলেছে ধরন

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ০৮ মার্চ ২১ । ০২:৫৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল প্রতিবেদক

প্রতীকী ছবি

দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে। কঠোর আইন, প্রচার ও উচ্চ আদালতের নানা ধরনের নির্দেশনার পরও তা কমানো যাচ্ছে না। করোনা মহামারির বছরে ঘরবন্দি পরিস্থিতিতেও দেশে নারী ও শিশু সহিংসতা থেকে রেহাই পায়নি। ২০১৯ সালের তুলনায় গত বছরে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ে ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা ও বাল্যবিয়ে। শুধু সংখ্যা বৃদ্ধিই নয়, সহিংসতার ধরনও বদলেছে।

পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ২০ হাজার ৭১৩ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৬ হাজার ৯০০ জন নারী। আর ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ মাসে ধর্ষণের শিকার হন ৬ হাজার ৭০০ জন। নির্যাতনের শিকার হন ২১ হাজার ৭৬৯ জন নারী ও শিশু।

২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর কনস্টেবল পদে নীলফামারী পুলিশ লাইনে যোগ দেন এক নারী। তার অভিযোগে জানা গেছে, যোগদানের পর থেকে নীলফামারী রিজার্ভ অফিস ইন্সপেক্টর আবু নাসের রায়হান প্রায়ই তাকে উত্ত্যক্ত করতেন। ভিকটিম অধস্তন কর্মচারী হওয়ায় মুখ বুজে সহ্য করছিলেন। ২০১৬ সাল থেকে বিয়ের কথা বলে নারী পুলিশটির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন রায়হান। পরে কৌশল করে ভিকটিমকে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম পুলিশ লাইনে এবং নিজে বরিশাল ডিআইজি অফিসে পরিদর্শক (তদন্ত) হিসেবে বদলি হন। এদিকে, উপায় না পেয়ে ওই নারী প্রথমে বরিশাল ডিআইজি বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। পরে নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে গত ২৮ সেপ্টেম্বর ধর্ষণ মামলা করেন। তবে মামলার প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রলোভনে পড়ে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ ছাড়াই চলতি বছর মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন। আদালত পুনরায় মামলাটির তদন্তের জন্য প্রতিবেদন দাখিল করেন। ওই নারী কনস্টেবল এ প্রতিবেদককে বলেন, যত বাধা আসুক, ন্যায়বিচারের আশায় লড়াই করছি।

নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় কেবল একটি সংখ্যা হয়ে যায়। পরিবারের কাছে হয়ে যায় 'ব্যক্তিগত সমস্যা'। রাষ্ট্র, গণমাধ্যমসহ কোনো সংগঠনই ঘটনাগুলোর ধারাবাহিক ফলোআপে মনোযোগী হয় না বলেই একের পর এক সহিংসতার ঘটনা ঘটে চলেছে।

মানবাধিকার কর্মীদের মতে, বাংলাদেশে ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার বিভীষিকা চলছে। যৌন নিপীড়ন থেকেই সূত্রপাত হয় এসব সহিংসতার। রাষ্ট্র ও সমাজের কার্যকরী পদক্ষেপের অভাবেই এসব ঘটনার লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না।

করোনাকালে বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) কয়েক দফা জরিপ করে জানায়, প্র্রত্যেক দফায় এমন অনেক নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যারা আগে কখনও নির্যাতনের শিকার হয়নি। তাদের প্রথম জরিপ করা হয় গত বছরের এপ্রিল মাসে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ১৭ হাজার ২০৩ জন নারী ও শিশুর ওপর এই জরিপ পরিচালনা করা হয়। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, নির্যাতনের হার বেড়েছে। এক মাসে স্বামীর হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৮৪৮ নারী, মানসিক নির্যাতনের শিকার দুই হাজার আটজন, যৌন নির্যাতনের শিকার ৮৫ জন এবং অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এক হাজার ৩০৮ জন নারী। এর বাইরে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন চারজন নারী, হত্যা করা হয়েছে একজনকে এবং যৌন হয়রানি করা হয়েছে ২০ নারীকে। মে মাসে দেশের ৫৩ জেলায় ১৩ হাজার ৪৯৪ নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ১১ হাজার ২৫ জন, অর্থাৎ ৯৭ দশমিক ৪ শতাংশ নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি নির্যাতন ঘটেছে স্বামীর হাতে। ৫৩ হাজার ৩৪০ জন নারী ও শিশুর সঙ্গে ফোনে কথা বলে এ তথ্য সংগ্রহ করে সংস্থাটি।

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, দেশব্যাপী নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলনও বেড়েছে। সেই সঙ্গে আছে নাগরিক সমাজ, সরকার ও তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের বিভিন্ন কার্যক্রম। যেসব সংস্থা নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে কাজ করছে, যেমন- স্বাস্থ্যসেবা, পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থাকে স্বচ্ছতার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করার আহ্বান জানান তিনি।

নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে মহিলা পরিষদের কেন্দ্র্রীয় কমিটির সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম সমকালকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে নারী নির্যাতন, বিশেষ করে ধর্ষণ মূল সমস্যা। ধর্ষণের শিকার নারীর বিচার প্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এ জন্য ধর্ষণ আইন পরিবর্তন করতে হবে। কত বড় সাজা হলো, তা নয়। অপরাধী সাজা কতটা পাচ্ছে, কত দিনে পাচ্ছে, নির্যাতিতার কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা- এসব বিষয়ে কাজ করতে হবে। প্রকৃত অর্থে নির্যাতিত নারীর জন্য ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com