ভ্রমণ

বুখারার চার মিনার

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২১ | প্রিন্ট সংস্করণ

সঞ্জয় দে

উজবেকিস্তানের বুখারার চার মিনার

বুখারায় সেদিন ছিল মেঘলা আকাশ। মাত্র দু'দিন আগেই সমরকন্দ শহরে খরতাপে দগ্ধ হয়েছি। ভেবেছি এভাবেই বুঝি বাকি দিনগুলো কাটবে। ভুলে গিয়েছিলাম, এ অঞ্চল মরুভূমিসম। রুক্ষ। আর তাই এখানে আবহাওয়া রূপ বদলায় ক্ষণে ক্ষণে। বৃষ্টি, তেজোদীপ্ত সূর্য কিংবা বৃষ্টির বাষ্প বয়ে আনা মেঘ- কিছুই এখানে পঞ্জিকার পাতার হিসাব অনুসারে হাজির হয় না। তারা হাজির হয় নিজেদের খেয়ালখুশি মতো। আবহাওয়ার সেই খামখেয়ালিপনার কাছে জব্দ হয়ে আমাকে আজ গায়ে চাপাতে হয়েছে পুরু জ্যাকেট আর মাথায় উলের টুপি।

গত দুই দিনে বুখারা শহরের প্রায় পুরোটাই চষে বেড়ানো শেষ। আজ মাঝ রাতের ট্রেনে তাসখন্দে ফিরে যাবার কথা। তাই দিনের পুরোটাই অলস ঘোরাঘুরির জন্য বরাদ্দ। তবে এমন হিমমি ত দিনে খুব যে ঘুরে বেড়াতে মন চাইছে, তেমনও নয়। তাই ভাবছি, হোটেলের খুব কাছেই অবস্থিত চার মিনার আর বুখারার আমিরের এক গ্রীষ্ফ্মকালীন প্রাসাদ- এ দুটিই হয়তো এ বেলা দেখে নিয়ে হোটেলে ফিরে চৌবাচ্চার গরম জলে ডুবে বসে থাকব।

ম্যানেজারের কাছে এ দুটি স্থাপনার হদিস জানতে গিয়ে বুঝলাম, চার মিনার এখান থেকে হাঁটাপথে হলেও অন্যটি নয়। ওটি শহরের উপান্তে। ট্যাক্সিতে করে যেতে হবে। বিশাল বপুর অধিকারী এই ম্যানেজার লোকটি ইংরেজি জানেন না। স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে এই হোটেল চালান। তারাই হয়তো মালিক। একটা নিউজপ্রিন্টের খাতায় লাল কলম দিয়ে আঁকিবুঁকি করতে করতে ইশারায় আমাকে বোঝালেন- চার মিনার দেখে হোটেলে ফিরে এসো। আমি তোমাকে প্রাসাদে যাবার একটা রাউন্ডট্রিপ ট্যাক্সি ঠিক করে দেবোনি। বড় অমায়িক লোক এরা। আজ যেহেতু রাত থাকতেই আমি হোটেল ছেড়ে দেবো, তাই আজকের দিনটির জন্য এরা আমার কাছ থেকে অর্ধেক ভাড়া নিচ্ছেন। অথচ চাইলেই কিন্তু পুরো দিনের ভাড়া দাবি করতে পারতেন।

হোটেলটি ঠিক মূল সড়কের পাশে নয়। একটু ভেতরে। ওয়-বিনক মসজিদের পাশের গলি ধরে সোজা এগিয়ে গেলে দু-একটা মুদি দোকানের পরেই এর অবস্থান। একটু ভেতরে হওয়ায় ভাড়া কম; তবে সুযোগ-সুবিধার কমতি নেই। সেই গলিটি পেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠতে গিয়ে খেয়াল করি, গত রাতের বৃষ্টিতে এখানে-ওখানে জমেছে ঘোলা জল। হঠাৎ কোনো গাড়ি এলে জল ছিটে আসার ভয়ে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াতে হচ্ছে।

বুখারা কোনো ধনী নগর নয়। পথঘাট ইদানীং কিছুটা সংস্কার করা হচ্ছে। তবে পাড়ার ভেতরকার গলি-উপগলির অবস্থা নাজুক। অ্যাসফল্ট উঠে গিয়ে সেগুলোর নানা স্থানে তৈরি হয়েছে নদীর ঢেউয়ের মতো তরঙ্গ। পাড়াগুলো বেশ সুনসান। মেটেরঙা বেলেপাথরে গড়া বাড়িগুলোর অন্দরমহলে হয়তো কোলাহল আছে, কিন্তু সেই কোলাহল পাথুরে দেয়ালের বাধা ডিঙিয়ে এপারে এসে পৌঁছায় না। দেয়ালে সেঁটে থাকা নীল রঙের সদর দরজাগুলো ভেতরের রহস্যকে আড়াল করে রাখে যেন। হাঁটতে গিয়ে একটি গলিতে কিছু যান্ত্রিক শব্দের অস্তিত্ব ধরতে পারি। কাছে গেলে বুঝি একটা ট্রাক। পুরোনো মডেলের রুশ কামাজ ট্রাক। ভারবাহী গাধার মতো ওজনের চাপে নুয়ে পড়েছে। ভিন্ন কোথাও যাবার সময়ে ভুল গলিতে ঢুকে পড়ে এখন আর বেরোতে পারছে না। বনেটে লুকিয়ে থাকা বার্ধক্যপীড়িত ইঞ্জিন গোঙাচ্ছে। আর চাকাগুলো ঘুরে যাবার জন্য নানা কায়দা-কসরত করছে। পেট্রোলের ঝাঁজালো পোড়াগন্ধ হটিয়ে দিয়েছে গলির ভেতরকার আর্দ্র হাওয়াকে। সাইড মিররে আমাকে দেখে ট্রাক ড্রাইভার তার কসরত থামিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাবার ইঙ্গিত দেয়।

এভাবে বেশ কিছু গলি পেরোবার পর হঠাৎ করেই যেন উজ্জ্বল নীল রঙের কিছু একটা এই মেঘলা দিনের বিবর্ণ পটে ঝলকে ওঠে। খানিকটা দূর থেকে নীল মনে হলেও কাছে গেলে বোঝা যায় ওটা ফিরোজা রঙ। ডোমের অগ্রভাগে লেগে থাকা ফিরোজা রঙের প্রলেপ যেন দেয়াশলাইয়ের কাঠির বারুদের মতো ঢেকে রেখেছে চারটি স্তম্ভকে। এই তাহলে চার মিনার, স্থানীয় ভাষায় যাকে বলে 'চোর মিনর'?

এই স্থাপনাটি তৈরি হয়েছিল অষ্টাদশ শতকের কোনো এক সময়ে। বুখারার এক ধনী বণিক ছিলেন এর পৃষ্ঠপোষক। শুরুতে মাদ্রাসা হিসেবে ব্যবহূত হলেও দীর্ঘকাল এটি ছিল পরিত্যক্ত। পরে কিছুটা সংস্কার করা হলেও ঠিক তেমনভাবে ব্যবহারোপযোগী আর কখনোই হয়নি।

ভেতরে ঢুকবার আগে চারটে ডোমের একেবারে অগ্রভাগের দিকটায় ভালো করে খেয়াল করি। মজার ব্যাপার হলো, সিরামিকের টাইলস দিয়ে যে নকশা আঁকা হয়েছে, সেগুলো একেকটি ডোমে একেক রকম। যেন মনে হয়, একেক স্থাপত্য শিল্পীর হাতে একেক সময়ে একেকটি ডোমের পত্তন হয়েছে। লোকে বলে, এই চার ধরনের নকশা নাকি মধ্য এশিয়ায় একদা বিস্তৃত চারটি ধর্ম- জরয়াস্ত্রায়িয়ান, ইহুদি, ইসলাম আর খ্রিস্টধর্মের প্রতীক। তবে আমি নিজে খুঁটিয়ে দেখার সময়ে এই নকশার পেছনে লুকিয়ে থাকা ধর্ম-সংক্রান্ত কোনো ইঙ্গিতের পাঠোদ্ধার করতে পারলাম না। শুধু দেখলাম, পেছনের দিকের ডানের ডোমটির মাথায় একটি পাখির বাসা। সেখান থেকে মাথা উঁচিয়ে আছে দুটি সারস পাখি। কয়েক মুহূর্ত চেয়ে থাকার পরও দেখি তাদের নড়ন-চড়নের নাম নেই। তখন বুঝি ডোমের মাথায় খড়ের বসত গেড়ে সন্তানসহ আকাশের দিকে মুখ করে চেয়ে থাকা এই সারস পাখি কৃত্রিম বৈ অন্য কিছু নয়। এর পেছনে হয়তো কারণও আছে। উজবেকরা বিশ্বাস করে, যতদিন আকাশে মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ে যাওয়া সারসের পাল দেখা যাবে, ততদিনই দেশে থাকবে শান্তি আর সমৃদ্ধি।

নিচু দরজা দিয়ে ভেতরের গুমোট জায়গাটায় ঢুকবার মুখে দু'পাশে মাটির কয়েকটি হাঁড়ি স্বাগত জানায়। ভেতরের আঁধারে চোখ কিছুটা সয়ে এলে দেখি, এক কোণে চেয়ার নিয়ে বসে আছেন এক রমণী। তার চারধারের দেয়ালে যেন উপচে পড়ছে নানা হস্তশিল্পের সামগ্রী। তিনি এসবের বিক্রেতা। আরও একটা উদ্দেশ্য আছে তাঁর। এই চারটি ডোমের একটিতে সিঁড়ি বেয়ে ওঠা যায়। তবে তার জন্য টিকিট কাটতে হয়। আর সেই টিকিটটি পাওয়া যায় তাঁর কাছে। আমি মাত্র কয়েক সোম দিয়ে সে টিকিট কিনে ওপরে উঠে বেগুনিবর্ণা এই শহরটার একটা চিত্র দেখে এলাম। চার মিনার দেখে হোটেলে ফিরতেই গেটের কাছে দেখি- পিটার দম্পতি তল্পিতল্পা নিয়ে চলে যাচ্ছে। গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে ওদের নিতে আসা ট্যাক্সি। আজ দুপুরের ট্রেনে ওদের ফিরে যাবার কথা। এই দম্পতির সঙ্গে আজ সকালে খাবার ঘরে আলাপ হয়েছিল। খাবার ঘরটি ভূগর্ভে। বিজলী বাতির হলদেটে আলোয় আলোকিত ঘরটা। আমি যখন ও ঘরে যাই, আমি আর এই দম্পতি ছাড়া আর কেউ ছিল না ওখানে। তাই দু-এক কথায় আলাপ জমে উঠতে দেরি হয়নি। এরা এসেছেন ইসরাইলের হাইফা নগর থেকে। রিটায়ার্ড লাইফে বুড়োবুড়ি মিলে নানান দেশে ঘুরে বেড়ান। এখানে এবারে এসেছেন, কারণ- মুসলিমপ্রধান যে দেশগুলোতে ইসরায়েলিরা নিশ্চিন্তে যেতে পারে, তার মাঝে উজবেকিস্তান অন্যতম। তো এদের সঙ্গে আলাপে আবিস্কার করি, পিটাররা মূলত আমেরিকান। জন্ম ভার্জিনিয়ায়। শেষ বয়সে এসে ইচ্ছা হয়েছে, ইসরায়েলে থিতু হবেন। আমি বাংলাদেশি শুনে পিটার বলল, 'আই নো অ্যাবাউট ইউর কান্ট্রি। একাত্তর সালে যখন তোমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলছে, আমি তখন লন্ডনে। স্কুল অব ইকোনমিক্সে পড়ছি। একদিন হাইড পার্কে বিশাল জনসভা হলো তোমাদের স্বাধীনতার পক্ষে। আমিও গিয়েছিলাম। এমনকি কয়েকজনের কাছ থেকে চাঁদা তুলেও মুক্তিযুদ্ধ তহবিলে দিয়েছি। একবার ইচ্ছা আছে তোমাদের দেশে ঘুরতে যাবার।' কিন্তু ইসরায়েলের পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশে গমন খুব সম্ভবত সম্ভব নয়, সেটি ওকে জানালে পিটার ওয়াফলে চামচ বসানো বন্ধ করে কী যেন ভেবে নিয়ে বলে- 'আমার অবশ্য আরও কয়েকটা দেশের পাসপোর্ট আছে, কিন্তু সমস্যা হলো ভিসার জন্য আমাকে তো বর্তমান ঠিকানা দিতে হবে। আর সেই ঠিকানা তো হাইফার ঠিকানা। কাজেই ভিসা মনে হয় দেবে না।'

পিটার নামের এই ভদ্রলোকের তহবিলে কী করে বেশ কয়েকটি দেশের পাসপোর্ট থাকে, তা নিয়ে আমার খানিকটা কৌতূহল থাকলেও সেটি প্রকাশ করা সমীচীন হবে না ভেবে প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকি। প্রাতরাশ সেরে টেবিল থেকে উঠে যাবার সময় পিটারপত্নী স্বামীকে বলেন, 'ওকে আমাদের হাইফার ঠিকানাটা দিয়ে দাও না। ইসরায়েলে এলে কখনও না হয় আমাদের ওখানে ঘুরে যাবেন।' কিন্তু সাবধানী পিটার আমাকে কেবল নিজের ইমেইল অ্যাড্রেস লিখে দিয়ে বলেন- 'আমাকে ইমেইল কোরো। পরে আমরা না হয় বিস্তারিত যোগাযোগ করে নেব।'

হোটেলে ঢুকতেই ম্যানেজার বুঝে গেলেন, আমি ট্যাক্সির খোঁজে এসেছি। কেবল একটু মাথা নেড়ে শশব্যস্ত হয়ে তিনি ল্যান্ডফোনের ডায়াল হাতে নিলেন। এর মিনিট পাঁচেকের ভেতরই আমার ট্যাক্সিও হাজির। ট্যাক্সি আমাকে নিয়ে চলেছে শহরের উত্তর প্রান্তেু বুখারার শেষ আমির নাসরুল্লাহ খানের গ্রীষ্ফ্মকালীন প্রাসাদে। প্রাসাদের সামনের দিকটায় খোলা মাঠে পার্ক করে রাখা বেশ কয়েকটি বাস। বোঝা যায়, এরা দূরদূরান্ত থেকে লোক বয়ে এনেছে। আমার ট্যাক্সিওয়ালা সেই বাসগুলোর ফাঁক গলে একটা জলকাদাপূর্ণ জায়গা বেছে নিয়ে আমাকে ইঙ্গিতে বললেন, ফিরে এসে আমাকে এখানে খোঁজ করলেই পাবেন। মনে মনে ভাবি, ফিরে যাবার সময় ব্যাক গিয়ারে এই কাদার সমুদ্র পেরোতে পারলে হয়!

গেটের কাছে টুল নিয়ে বসে আছেন একজন। প্রবেশ টিকিট কাটতে হবে তার কাছ থেকেই। তাঁর আশপাশেই একটা জটলা তৈরি হয়েছে। কারণ, ভেতরে ঢোকামাত্র সেই বাসপার্টির ছেলে-ছোকরারা নিজেদের সেলফি স্টিক দিয়ে ছবি তোলায় মত্ত হয়ে পড়েছে। এদের পাশ কাটিয়ে শ্যাওলায় ঢাকা ভেতরবাগে ঢুকতেই দেখি, পাশের ঘাসের জমিনে বেশ আমিরি চালে হেঁটে চলেছে একটি ময়ূর। এখনও পেখম মেলেনি। গুটিয়ে রেখেছে। সেটি কিছুটা আনত হয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে উজ্জ্বল সবুজ ঘাসের ডগা। আর মাঝে মাঝে ওদের কেকা রবে বিদীর্ণ হচ্ছে চারপাশের নিস্তব্ধতা।

দুপাশে ম্যালবেরি গাছ। মাঝ দিয়ে পাথর আর সুরকির মিশ্রণে তৈরি হাঁটা পথ। পথটা বাগিচা থেকে কিছুটা উঁচুতে। এ পথ বেয়ে হেঁটে গেলে ইংরেজি ইউ শেপের মতো একটি বিরাট কাষ্ঠনির্মিত দালান চোখে পড়ে। দালানটি আকাশ-নীল রঙা। ভূমি থেকেও প্রায় আধমানুষ সমান উঁচুতে ভিত নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপত্যের বহিরাঙ্গে দারুশিল্পীদের নিপুণতার স্বাক্ষর।

প্রাসাদের হর্তাকর্তা আমির আলিম খান সম্পর্কে কিছু গল্প বলা যাক। এই আমিরের ছিল চার স্ত্রী আর চারশ হারেম সুন্দরী। তন্মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় পাত্রী ছিলেন সিতারা বানু। আমির ছিলেন তার রূপে মশগুল। সন্তান প্রসবের সময়ে এই রানী দেহ রাখলে আমির স্থির করেন স্ত্রীর স্মৃতির প্রতি সম্মান রেখে সিতারার নামে এই প্রাসাদ নির্মাণ করবেন। কিন্তু প্রাসাদটি নির্মিত হবে কোথায়? রাজ-মাওলানাদের মাঝে একজন বিধান দিলেন- একটা ভেড়া কেটে চার পা ঝুলিয়ে রাখতে হবে বুখারা শহরের চার কোণে। যেদিকে ঝোলানো পা সজীব থাকবে বেশিদিন, সেদিকেই নির্মিত হবে প্রাসাদ। সেভাবেই বুখারা শহরের উত্তর দিকের এক নিরালা অঞ্চল প্রাসাদ নির্মাণের জন্য বেছে নেওয়া হলো। বুখারা বলতে গেলে একেবারেই এশিয়ার মধ্যাঞ্চল। তাই এখানে এসে যেমন উপস্থিত হয়েছে ইউরোপিয়ান কলা, তেমনি আছে পারস্য অঞ্চলের চিত্রকলা-স্থাপত্যের প্রভাব। ওদিকে বহুকাল জারের প্রভাব বলয়ে থাকার কারণে রুশ স্থাপত্যকলাও সন্তর্পণে জায়গা করে নিয়েছে। এর ফলে আমিরের জন্য যে প্রাসাদটি নির্মিত হলো, সেখানে যেন সব অঞ্চলের স্থাপত্যকলাই একে একে জায়গা করে নিল। এই যেমন- পুকুরের পাশে স্থাপিত দ্বিতল মঞ্চটির কথা ধরা যাক। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, এর চূঁড়ার ডোমটি যেন রুশ ষষ্ঠভুজাকৃতি ধারার ডোম। একে কোনোভাবেই মধ্য এশিয়ার পারস্য ধারার ডোম হিসেবে ধরা যায় না। ও হ্যাঁ, ভালো কথা- এই যে মঞ্চ, এটি নির্মিত হয়েছিল আমিরের একটি বিশেষ খায়েশ পূরণের জন্য। কথিত আছে, সামনের পুকুরে আমিরের হারেম সুন্দরীরা স্নানের জন্য আসতেন, আর আমির ওখানে বসে নির্বাচন করতেন কোন সুন্দরীর সঙ্গে তিনি রাতটি কাটাবেন। যাকে পছন্দ হতো, তার দিকে ছুড়ে দিতেন একটি আপেল। আপেলপ্রাপ্ত সেই সুন্দরীকে ভেড়ার দুধে আবারও স্নান করিয়ে পাঠানো হতো আমিরের শয্যায়। বুখারার আমিররা এই প্রাসাদটি নির্মাণের পর খুব বেশি দিন ভোগ করতে পারেননি। অক্টোবর বিপ্লবের তিন বছরের মাথাতেই আমিরের সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। হুড়মুড় করে ঢোকে বলশেভিকরা। বিয়েবাড়ির বিশাল হাঁড়ির মত ভুঁড়িখানা বাগিয়ে আমির পালিয়ে যান আফগানিস্তানে। তবে পালিয়ে যাবার সময় আর কিছু সাথে নিতে না পারলেও হারেম সুন্দরীদের পথসঙ্গী করতে ভোলেননি। সোভিয়েত সময়ে আলিম খানের প্রাসাদটিকে কিছুটা সংস্কার করে একটা স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়। উজবেকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর একে আবারও কিছুটা সংস্কার করে রূপ দেওয়া হয় জাদুঘরে।

প্রাসাদের অভ্যন্তরে ঢুকতেই লম্বাটে একটা হল ঘর চোখে পড়ে। এটা আমিরের দরবার ঘর। মেঝেতে পারস্য থেকে আনা পুরু গালিচা। মাথার ওপর ঝুলছে পোল্যান্ড থেকে আনা ঝাড়বাতি। চারদিকের দেয়ালে ভেনিসিয়ান কাচ। ঘরের দুদিকে সার বেঁধে রাখা নরম গদির চেয়ার। এগুলো নাকি আনা হয়েছে রুশ দেশ থেকে। এই সভাস্থল থেকে কয়েক ঘর পেরিয়ে আমিরের শোবার ঘর। সেখানে কাচের বাক্সে বন্দি তার বিশাল হুঁকো। সেই ঘরটিতে প্রায় ভূমি অবধি নেমে এসেছে ঝাড়বাতির ক্রিস্টাল শাখা। চারধারের দেয়ালে স্টেলেকটাইট গুহার মতো ছন্দিত নকশা। গাঢ়, তীব্র বর্ণের। নকশার প্রাচুর্যে পুরো ঘরটাকেই যেন মনে হয় এক গোলকধাঁধাঁ। আলিম খানের প্রাসাদের এই নানান নকশার পেছনে নাকি তার আরেক অদ্ভুত শখ জড়িত ছিল। আমির আগে থেকেই স্থপতিকে বলে রেখেছিলেন, এই নকশার আড়ালে কিছু সূক্ষ্ণ ফোকর রাখতে হবে, যেগুলো খুব করে খেয়াল না করলে বোঝা যাবে না। আমিরের ইচ্ছা ছিল, তিনি এ-ঘর ও-ঘর থেকে ফোকরের মাঝ দিয়ে উঁকি দিয়ে রানীদের ক্রিয়াকলাপ দেখবেন। তবে সেসব ফোকর কি আজও আছে, না বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে কোনো পরিস্কার বার্তা এখানে নেই।

ইংরেজি ইউ অক্ষরের মতো বিন্যস্ত এই ক্ষুদ্রায়তনের প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে সেই পুকুরের পাশে যাই। সেখানে বেশ কিছু নারী পাথুরে উঠানে ময়লা চাদর পেতে সঙ্গে আনা পসরা নিয়ে বসেছেন বিক্রির উদ্দেশ্যে। অধিকাংশই হলদেটে সাদা কাপড়ে তোলা নিপুণ সুচিকর্ম। অনেকটা যেন আমাদের নকশিকাঁথার মতো। বিক্রেতাদের টার্গেট মূলত বিদেশিরা। দেখলাম- দুই জার্মান বুড়ো বেশ আগ্রহ নিয়ে কাপড়গুলো দেখছে। এদের থেকে খানিক দূরেই দেয়ালের গা ঘেঁষে অলংকারের সম্ভার নিয়ে বসেছেন ভিন্ন দুই বিক্রেতা। তাদের সম্মুখে আবার স্থানীয় নারীর ভিড়। বিদেশিরা ওখানে নেই। মাথায় জরির উজ্জ্বল কাজ করা টুপি মাথায় দিয়ে সুখী সুখী চেহারার বেশ কিছু গৃহিণী দেখলাম গলার হার আর কানের দুলের দামাদামিতে মত্ত। আমি যখন দূর থেকে এই বেচাকেনা পর্বটি দেখছি, তখন এক কিশোরী আমার দিকে এগিয়ে আসে। ওকে কিছুক্ষণ আগে প্রাসাদের ভেতরে দেখেছি। বান্ধবীর সঙ্গে। এ মুহূর্তে সেই বান্ধবীটিকে দেখছি না। হয়তো আশপাশেই কোথাও আছে। মেয়েটির মাথায় ধূসর বর্ণের ব্যান্ডানা। একধরনের নিষ্পাপ অপাপবিদ্ধ অভিব্যক্তি গোটা মুখটায় ছড়ানো। নিকটবর্তী হলে খানিকটা সংকোচমাখা কণ্ঠে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করে, 'ইউ লিভ হয়্যার?' এই যোগাযোগের প্রাচুর্যে ভরা পৃথিবীতে আজকাল কেউ আর বিদেশিদের প্রতি সকৌতূহলী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে না। এসবই যেন জলভাত। সেজন্যই এদেশে যতবার এ ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি, পুলকবোধে আচ্ছন্ন হয়েছে মন। ওকে ক্যালিফোর্নিয়ার কথা বলাতে অস্ম্ফুটস্বরে বলে ওঠে- 'ও ক্যালিফোর্নিয়া? হলিউড?' আমি স্মিত হেসে মাথা নাড়ি। বোঝা যাচ্ছে, আরও কিছু কথা জিজ্ঞেস করার থাকলেও নিজের ভান্ডারে সঞ্চিত সীমিত শব্দ সংখ্যার কারণে মেয়েটি আর এগোতে পারছে না। আমাকে তাই 'বাই' বলে নিজের বান্ধবীর সন্ধানে আবারও প্রাসাদের দিকে হেঁটে যায়।

সময়ের একটা হদিস পাবার জন্য আমি আকাশের দিকে তাকাই। কিন্তু এই মেঘলা আকাশ কোনো রকম বার্তা দিতে ব্যর্থ হয়। অগত্যা আমাকে জ্যাকেটের হাতা উঠিয়ে হাতঘড়ির ডায়ালের দিকে তাকাতে হয়। সেখান থেকে বুঝি এবারে প্রস্থানের পালা। খুব বেশি দেরি করলে বেচারা ট্যাক্সি ড্রাইভার বিরক্ত হয়ে পালিয়ে যায় কিনা কে জানে! সেক্ষেত্রে তো বিপদে পড়তে হবে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com