স্বাধীনতা সংগ্রাম

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ

প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ১৯ মার্চ ২১ । ০২:৫৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

আ ক ম মোজাম্মেল হক

আজ ঐতিহাসিক ১৯ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বর্তমান গাজীপুর বা তৎকালীন জয়দেবপুরের বীর জনতা গর্জে উঠেছিল এবং সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। মনে পড়ে, পহেলা মার্চ দুপুরে হঠাৎ এক বেতার ভাষণে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেন। এ কথা শোনামাত্র সারাদেশের মানুষ স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে প্রতিবাদমুখর হয়ে এ ঘোষণার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসে। দেশের সর্বত্র স্লোগান ওঠে- 'বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো/ বাংলাদেশ স্বাধীন করো'; 'পিন্ডি না ঢাকা/ ঢাকা-ঢাকা'; 'পাঞ্জাব না বাংলা/ বাংলা-বাংলা'; 'তোমার আমার ঠিকানা/ পদ্মা-মেঘনা- যমুনা'; 'তুমি কে আমি কে/ বাঙালি-বাঙালি'।

বঙ্গবন্ধু ঢাকায় পূর্বাণী হোটেলে এক সভায় ইয়াহিয়ার ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং ঢাকায় ২ মার্চ ও সারাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ৩ মার্চ হরতাল আহ্বান করেন এবং ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা আহ্বান করেন।

জয়দেবপুরে আমার পরামর্শে ২ মার্চ রাতে তৎকালীন থানা পশু পালন কর্মকর্তা আহম্মেদ ফজলুর রহমানের সরকারি বাসায় তৎকালীন মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. হাবিব উল্ল্যাহ এক সর্বদলীয় সভা আহ্বান করেন। সভায় আমাকে আহ্বায়ক করে এবং মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির শ্রমিক নেতা নজরুল ইসলাম খানকে কোষাধ্যক্ষ করে ১১ সদস্যের সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। সদস্য হন সর্বজনাব আয়েশ উদ্দিন, মো. নুরুল ইসলাম (ভাওয়ালরত্ন), মো. আ. ছাত্তার মিয়া (চৌরাস্তা), থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হজরত আলী মাস্টার (চৌরাস্তা) (মরহুম), মো. শহীদ উল্ল্যাহ বাচ্চু (মরহুম), হারুন-অর-রশিদ ভূঁইয়া (মরহুম), শহিদুল ইসলাম পাঠান জিন্নাহ (মরহুম), শেখ আবুল হোসেন (শ্রমিক লীগ), থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি ডা. সাঈদ বকস্‌ ভূঁইয়া (মরহুম)। কমিটির হাইকমান্ড (উপদেষ্টা) হন মো. হাবিব উল্ল্যাহ (মরহুম), শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা এমএ মুত্তালিব এবং ন্যাপ নেতা মনীন্দ্রনাথ গোস্বামী (মরহুম)।

আমি ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে 'স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস'-এ সম্পৃক্ত হই। নিউক্লিয়াসের উদ্দেশ্য ছিল সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করা, যা মূলত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ১৯৬২ সালেই ছাত্রলীগের মধ্যে গঠিত হয়েছিল। নিউক্লিয়াসের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণেই বুঝতে পেরেছিলাম, সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার এটাই মাহেন্দ্রক্ষণ। জয়দেবপুরে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ৩ মার্চ, ১৯৭১ গাজীপুর স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশে বটতলায় এক সমাবেশ করে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পতাকা ধরেছিলেন হারুন ভূঁইয়া এবং অগ্নিসংযোগ করেছিলেন শহীদউল্ল্যাহ বাচ্চু। আর স্লোগান-মাস্টার আ. ছাত্তার মিয়া পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে স্লোগান দিত।

৭ মার্চ জয়দেবপুর থেকে হাজার হাজার বীর জনতার সঙ্গে ট্রেন, ট্রাক ও বাসে মাথায় লাল ফিতা বেঁধে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় যোগ দিলাম। ৭ মার্চে উজ্জীবিত হয়ে আমরা সম্ভবত ১১ মার্চ গাজীপুর সমরাস্ত্র কারখানা (অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি) আক্রমণ করি। গেটে বাধা দিলে আমি হাজার হাজার মানুষের সামনে টেবিলে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করি মাইকে। পাকিস্তানিদের বুঝতে পারার জন্য ইংরেজিতে বলি- 'আই ডু হেয়ারবাই ডিসমিস ব্রিগেডিয়ার করিমুল্লাহ ফ্রম দ্য ডিরেক্টরশিপ অব পাকিস্তান অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি অ্যান্ড ডু হেয়ারবাই অ্যাপয়েন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার আব্দুল কাদের অ্যাজ দ্য ডিরেক্টর অব দ্য অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি।' জনতার গর্জনে কাজ হয়েছিল। পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার বক্তৃতা চলাকালেই পেছনের গেট দিয়ে সালনা হয়ে পালিয়ে ঢাকা চলে আসেন। ১৫ এপ্রিলের আগে গাজীপুরে যাননি। পাকিস্তান সমরাস্ত্র কারখানা ২৭ মার্চ পর্যন্ত আমাদের দখলেই ছিল। সম্ভবত ১৩ মার্চ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি সাহেবজাদা ইয়াকুব আলী জয়দেবপুর রাজবাড়ি মাঠে হেলিকপ্টারে অবতরণ করার চেষ্টা করেন। শত শত জনতা হেলিকপ্টারের প্রতি ইট-পাটকেল ও জুতা ছুড়তে শুরু করলে হেলিকপ্টার ফেরত চলে যায়।

১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতে ৩২ নম্বরে লাখ লাখ জনতার ঢল নেমেছিল। তৎকালীন আমাদের নির্বাচনী এলাকার এমএনএ সামসুল হক (পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য), হাবিব উল্ল্যাহসহ আমি গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুকে জয়দেবপুরে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করার সংবাদ দিতে। সন্ধ্যায় আমরা পেছনে দাঁড়িয়ে আছি দেখতে পেয়ে কিছু বলতে চাই কিনা বঙ্গবন্ধু জানতে চান। কুর্মিটোলা (ঢাকা) ক্যান্টনমেন্টে অস্ত্রের মজুদ কমে গেছে অজুহাতে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে রক্ষিত অস্ত্র আনার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংবাদ জানাই। সামসুল হকের ইশারায় আমি তরুণ হিসেবে এ অবস্থায় আমাদের করণীয় জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু ব্যাঘ্রের মতো গর্জে উঠে বললেন- 'তুই একটা আহাম্মক। কী শিখেছিস যে আমাকে বলে দিতে হবে!' একটু পায়চারি করে বললেন, 'বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করতে দেওয়া যাবে না। রেজিস্ট অ্যাট দ্য কস্ট অব এনিথিং'। নেতার হুকুম পেয়ে গেলাম।

১৯ মার্চ শুক্রবার আকস্মিকভাবে পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার জাহান জেবের নেতৃত্বে পাকিস্তানি রেজিমেন্ট জয়দেবপুরের দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করার জন্য পৌঁছে যায়। একজন নায়েব সুবেদার জয়দেবপুর হাই স্কুলের মুসলিম হোস্টেলের পুকুরে (জকি স্মৃতির প্রাইমারি স্কুলের সামনে) গোসল করার সময় জানান যে, ঢাকা থেকে ব্রিগেডিয়ার জাহান জেব চলে এসেছে। খবর পেয়ে দ্রুত আমাদের তখনকার আবাসস্থল মুসলিম হোস্টেলে ফিরে গিয়ে উপস্থিত হাবিবউল্ল্যা ও শহিদুল্ল্যাহ বাচ্চুকে এ সংবাদ জানাই। শহীদউল্ল্যাহ বাচ্চু তখনই রিকশায় চড়ে শিমুলতলীতে, মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি, ডিজেল প্লান্ট ও সমরাস্ত্র কারখানায় শ্রমিকদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে জয়দেবপুরে চলে আসার খবর দেওয়া হলে এক ঘণ্টার মধ্যে মাঠেই হাজার শ্রমিক-জনতা চারদিক থেকে লাঠিসোটা, দা, কাতরা, ছেন, দোনালা বন্দুকসহ জয়দেবপুরে উপস্থিত হয়। সেদিন জয়দেবপুর হাটের দিন ছিল। জয়দেবপুর রেলগেটে মালগাড়ির বগি, রেলের অকেজো রেললাইন, স্লিপারসহ বড় বড় গাছের গুঁড়ি, কাঠ, বাঁশ, ইট ইত্যাদি যে যেভাবে পেরেছে, তা দিয়ে এক বিশাল ব্যারিকেড দেওয়া হয়। জয়দেবপুর থেকে চৌরাস্তা পর্যন্ত আরও পাঁচটি ব্যারিকেড দেওয়া হয়, যাতে পাকিস্তানি বাহিনী অস্ত্র নিয়ে ফেরত যেতে না পারে। আমরা যখন ব্যারিকেড দিচ্ছিলাম, তখন টাঙ্গাইল থেকে রেশন নিয়ে একটি কনভয় জয়দেবপুর আসছিল। কনভয় জনতা আটকে দেয় এবং সেখানে থাকা পাঁচ সৈন্যের চায়নিজ রাইফেল কেড়ে নেয়।

এদিকে, রেলগেটের ব্যারিকেড সরানোর জন্য দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে ব্রিগেডিয়ার জাহান জেব আদেশ দেয়। কৌশল হিসেবে বাঙালি সৈন্যদের সামনে দিয়ে পেছনে পাঞ্জাবি সৈন্যরা অবস্থান নেয়। বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা জনতার ওপর গুলি না করে আকাশের দিকে গুলি ছুড়ে সামনে আসতে থাকে। আমরা বর্তমান গাজীপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ওপর অবস্থান নিয়ে বন্দুক ও চায়নিজ রাইফেল দিয়ে গুলিবর্ষণ শুরু করি।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে জয়দেবপুরে শহীদ হন নেয়ামত ও মনু খলিফা। আহত হন চতরের সন্তোষ, ডা. ইউসুফসহ শত শত বীর জনতা। পাকিস্তানি বাহিনী কারফিউ জারি করে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করলে আমাদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। দীর্ঘ সময় চেষ্টা করে ব্যারিকেড পরিস্কার করে ব্রিগেডিয়ার জাহান জেব চান্দনা চৌরাস্তায় এসে আবার প্রবল বাধার সম্মুখীন হয়। নামকরা ফুটবল খেলোয়াড় হুরমত এক পাঞ্জাবি সৈন্যেকে পেছন দিয়ে আক্রমণ করে। আমরা সৈন্যের রাইফেল কেড়ে নিই। কিন্তু পেছনে আরেক পাঞ্জাবি সৈন্য হুরমতের মাথায় গুলি করে। হুরমত সেখানেই শাহাদাতবরণ করে। বর্তমানে সেই স্থানে চৌরাস্তার মোড়ে 'জাগ্রত চৌরঙ্গী' নামে ভাস্কর্য স্থাপতি হয়েছে।

১৯ মার্চের পর সারাদেশে স্লোগান ওঠে- 'জয়দেবপুরের পথ ধরো/ বাংলাদেশ স্বাধীন করো'; 'জয়দেবপুরের পথ ধরো/ সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করো'। ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গাজীপুরবাসীর উদ্দেশে এক পত্রে জয়দেবপুর সশস্ত্র প্রতিরোধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। জয়দেবপুরবাসীকে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য তিনি অভিনন্দন জানান।

মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর মাহেন্দ্রক্ষণে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনের শহীদসহ সব অংশগ্রহণকারীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। এই প্রতিরোধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক মাইলফলক। জয়দেবপুরের এই গৌরবগাথা 'প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ দিবস' হিসেবে জাতীয়ভাবে উদযাপনের আবেদন জানিয়ে আসছে গাজীপুরের সর্বস্তরের জনতা। মুক্তিযুদ্ধের সূচনার ইতিহাস যথাযথভাবে সংরক্ষণের স্বার্থে দিবসটি জাতীয়ভাবে পালন করা প্রয়োজন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা; মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী, বাংলাদেশ সরকার

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com