অমর একুশে গ্রন্থমেলা

বইমেলার ভিনদেশিরা

প্রকাশ: ২৪ মার্চ ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ২৪ মার্চ ২১ । ০২:২৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

তন্ময় মোদক

বিকেলে টিএসসির গেটের দিকের একটি স্টলে পাওয়া গেল মিস মার্টিনকে। যুক্তরাষ্ট্রের প্যানসেলভেনিয়া অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা তিনি। থাকছেন মিরপুর ২ নম্বর সড়কে একটি বাড়ি ভাড়া করে। এ দেশে এসেছিলেন মূলত 'স্পোকেন ইংলিশ' কোর্স করাতে। তবে আসার পর বাংলাদেশকে ভালোবেসে বাংলা ভাষাটাও রপ্ত করার চেষ্টা করছেন। প্রথমবারের মতো বইমেলায় ঘুরতেও এসেছেন। বইও কিনেছেন একটি। তবে ইংরেজি নয়, কিনেছেন বাংলায় 'আরব্য রজনীর গল্প' বইটি। কিছুক্ষণ কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়ার পর বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহের বিষয়টি বোঝা গেল। জিজ্ঞেস করলাম, বাংলা জানেন? আকর্ণ বিস্তৃত হাসি দিয়ে বললেন, 'হালকা হালকা'। জানালেন নিজের আগ্রহ থেকেই বাংলা শিখছেন, বাংলায় কয়েকটি লাইনও বলতে শিখে গেছেন। ভাঙা ভাঙা বাংলায় বললেন, 'এদেশে এসে আমার খুব ভালো লাগছে। আমি বাংলা আরও ভালো শিখতে চাই।' ভিনদেশির মুখে বাংলা শুনতে ভালোই লাগে, শিশুরা প্রথম কথা বলা শেখার পর যেমন করে কথা বলে, অনেকটা সে রকম অনুভূতি। মার্টিন অবশ্য একা মেলায় আসেননি। সঙ্গে আরও জন ছয়েক সহকর্মীকেও নিয়ে এসেছিলেন। সবাই মিলে অনেকক্ষণ মেলায় ঘুরলেন, কিছু বইও কিনলেন।

শেষ বিকেলে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের গেটের দিকে কথা হলো যুক্তরাষ্ট্রের ডেলওয়ারের স্থানীয় জনাথনকে। নিজের দেশে তিনি একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কাজ করতেন। এ দেশে একটি এনজিওর হয়ে কাজ করতে গিয়ে বাংলা ভাষার প্রেমে পড়েছেন। এখন রীতিমতো বাসায় শিক্ষক রেখে বাংলা শিখছেন। তিনিও প্রথমবার বইমেলায় ঘুরতে এসেছেন। কী বই কিনলেন জিজ্ঞেস করতেই বললেন, 'বাংলা এবিসিডি'। মানে বাংলা বর্ণমালার বই। খুলে রঙিন কাগজে ছাপানো বইটি দেখালেন। প্রায় আধঘণ্টা কথা বলতে বলতে স্টল থেকে স্টলে বইও দেখে বেড়িয়েছেন। যাওয়ার বেলায় জানালেন, এখানে আছেন আরও মাস দুয়েক। আবার দেখা করার জন্য নিমন্ত্রণ দিয়ে বেরিয়ে গেলেন মেলা থেকে। মেলায় আসা অনেকেই আলাদা করে মনোযোগ দিচ্ছিলেন ভিনদেশিদের। তাদের সঙ্গে ছবিও তুলেছেন।

গতকাল মঙ্গলবার ভিড় খুব বেশি না হলেও করোনার সংক্রমণ নিয়ে চিন্তিত অনেকেই। গতকাল করোনা সংক্রমণ শনাক্তের সংখ্যাটি গত আট মাসে সর্বোচ্চ। বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়ে গেছে। এই সময়ে মাস্ক পরার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই। বাংলা একাডেমি সেটি মেনে চলার চেষ্টাও করছে। বইমেলায় ঢোকার সময়ে সবাইকেই মাস্ক পরে ও হাত স্যানিটাইজ করে ঢুকতে হয়। ভেতরে ঢুকে অবশ্য চিত্র কিছুটা বদলে যায়। অনেকেই মাস্ক পরতে অস্বস্তি বোধ করায় বইমেলায় ঢোকার পরপরই সেটি পকেটে বা ব্যাগে চলে যায়।

বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে তথ্যকেন্দ্রের মাইকে বারবার মাস্ক পরার কথা বলা হলেও তাতে খুব বেশি গা করছেন না মেলায় আসাদের একাংশ। বিকেলে মেলায় ঢুকে অনেক প্যাভেলিয়ন ও স্টলের বিক্রয়কর্মীদের মুখে মাস্ক দেখা যায়নি। বেশিরভাগেরই উত্তর ছিল 'গরমের কারণে খুলে রেখেছি। আবার পরে নেব।' পরিচয় দিয়ে মাস্ক কেন নেই জিজ্ঞেস করলে অনেকে আবার তড়িঘড়ি মাস্ক খুঁজে পরার চেষ্টা করেছেন। তবে বেশিরভাগ দর্শনার্থীই মেলায় ঘুরেছেন মাস্ক পরে। গতকাল বিকেল পর্যন্ত বইয়ের স্টলগুলোতে তেমন ভিড় ছিল না। যারাই এসেছেন, ঘুরেফিরে ছবি তুলে বা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে সময় কাটিয়েছেন। সন্ধ্যার পর আনাগোনা কিছুটা বাড়লে প্যাভিলিয়ন ও টিএসসির গেটের দিকের স্টলগুলোতে অল্প ভিড় হয়েছে। তবে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের গেটের দিকের স্টলগুলোতে পাঠকরা গেছেন তুলনামূলক কম। স্টলের বিক্রয়কর্মীরা জানিয়েছেন, বিক্রি কিছুটা কম হয়েছে। তবে আরও কয়েকদিন পার না হলে বিক্রির ধারা নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক নয় বলেও জানালেন।

নন্দিতা প্রকাশের স্টলের সামনে কথা হয় জনপ্রিয় কার্টুনিস্ট, রম্যলেখক ও উন্মাদ সম্পাদক আহসান হাবীবের সঙ্গে। এবারের মেলায় অনুপম থেকে লেখকের 'আরো রম্য আরো বিজ্ঞান' বইটি বেরিয়েছে। বিক্রিও হচ্ছে ভালো। তবে কিছুদিন ধরে করোনা বাড়তে থাকায় সংক্রমণ নিয়ে তিনি চিন্তিত। বললেন, 'বইমেলা তো সবসময়ই ভালো লাগে। আমাদেরও (উন্মাদ) একটা স্টল থাকে। এ কারণেই আসা। তবে করোনার সংক্রমণ নিয়ে সবাই ভীতসন্ত্রস্ত। করোনার কারণে এবারের স্টলগুলো বেশ ফাঁকা রেখেই ডিজাইন করা হয়েছে, বিষয়টি ভালো। আমরা যদি ঠিকমতো মাস্ক পরতাম, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতাম, তাহলে তো কথাগুলো বলা লাগত না।' এ সময় মেলায় আসা সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য পরামর্শও দেন তিনি।

নতুন বই :বাংলা একাডেমির তথ্যমতে সোমবার মেলায় নতুন বই এসেছে ১১৮টি। এর মধ্যে গল্পগ্রন্থ্থ ৯টি, উপন্যাস ১৮টি, প্রবন্ধ ১০টি, কবিতা ৩৮টি, জীবনী ৬টি, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ২টি, ইতিহাসবিষয়ক ৯টি, বঙ্গবন্ধুবিষয়ক ৫টি এবং অন্যান্য বই ১৩টি। এছাড়াও একটি করে এসেছে বিজ্ঞানবিষয়ক বই, ধর্মীয় বই, স্বাস্থ্যবিষয়ক, ভ্রমণ, শিশুসাহিত্য, অনুবাদ, ছড়ার বই ও গবেষণাবিষয়ক বই। মেলার ছয় দিনে মোট বই এসেছে ৪৯৭টি। এর মধ্যে শোভা প্রকাশ এনেছে 'বড়ো বিস্ময় লাগে হেরি তোমারে :সন্‌জীদা খাতুন সম্মাননা-স্মারক', আগামী এনেছে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর 'শেখ কামাল আজ যদি বেঁচে থাকতেন', অন্যপ্রকাশ এনেছে হারুন হাবীবের 'কলকাতা ১৯৭১', অনন্যা এনেছে ফরিদুর রেজা সাগরের 'প্রিয়জনের প্রিয়স্মৃতি', কথাপ্রকাশ এনেছে শাকুর মজিদের 'ছাত্রকাল ট্রিলজি', বাংলা একাডেমি থেকে এসেছে মিলন কান্তি দে'র 'বাংলাদেশের যাত্রাশিল্প ও অমলেন্দু বিশ্বাস', চৈতন্য এনেছে জফির সেতুর কবিতা সংগ্রহ; অনিন্দ্য এনেছে আহমদ রফিকের 'রবীন্দ্রনাথ সাহিত্য-সংস্কৃতি', নন্দিতা এনেছে আবুল কাইয়ূমের 'বাংলা বানানের প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ ও বানানপঞ্জি', শোভা প্রকাশ এনেছে শামসুজ্জামান খানের 'বঙ্গবন্ধু-ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ (তৃতীয় খণ্ড)', অনন্যা এনেছে হাবীবুল্লাহ সিরাজীর 'পরাজয়', বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমের 'ঘরের বাইরে ৩০৮ দিন', ড. নূরুন নবীর 'জাপানিদের চোখে বাঙালি বীর', আগামী এনেছে হায়দার মো. জিতুর 'বঙ্গবন্ধু থেকে দেশরত্ন', তাম্রলিপি এনেছে অনিমেষ আইচের 'যামিনী', ঐতিহ্য এনেছে পিয়াস মজিদের 'আমার সিনেমাঘর', সালেহ ফুয়াদের অনুবাদে মওলানা ওয়াহিদুজ্জামান খানের 'সালমান রুশদি ও মিছিলের রাজনীতি', অন্যপ্রকাশ এনেছে মারুফুল ইসলামের 'পশ্চিমের প্রপঞ্চ', ভিন্নচোখ এনেছে অমিত দাশ গুপ্তের 'বাংলাদেশের সংবিধান :বাঙালির আত্মপরিচয়ের অভিজ্ঞান', ঢাকা প্রকাশনী এনেছে আসাদুজ্জামান আসাদের 'বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ইতিহাস' ইত্যাদি।

মূলমঞ্চের অনুষ্ঠান :গতকাল অমর একুশে বইমেলার ষষ্ঠ দিনে বিকেল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় 'স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী :মুক্তিযুদ্ধ ও নারী' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মনিরুজ্জামান শাহীন। আলোচনায় অংশ নেন মোহাম্মদ জাকীর হোসেন এবং একেএম জসীমউদ্দীন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সেলিনা হোসেন।

সভাপতির বক্তব্যে সেলিনা হোসেন বলেন, নারী-পুরুষের যৌথ শক্তিতেই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ সফলতা লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি নারীরা যে অসীম সাহস ও বীরত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন তা আমাদের স্মরণ রাখতে হবে। প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশগ্রহণ ছাড়াও নারীরা সমাজের নেপথ্য-শক্তি হিসেবে সমাজ-কাঠামো ধরে রেখেছিল বলেই স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশ পুনর্গঠন সম্ভব হয়েছিল।

এছাড়াও গতকাল লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন মোহিত কামাল, জাহেদ সারওয়ার এবং অনন্ত উজ্জ্বল।

আজকের অনুষ্ঠানসূচি :আজ বুধবার বইমেলার ৭ম দিনে মেলা চলবে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে 'স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী :মুক্তিযুদ্ধে সংবাদ সাময়িকপত্র' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন জাফর ওয়াজেদ। আলোচনায় অংশ নেবেন মোহাম্মদ সেলিম, মো. এমরান জাহান এবং কুতুব আজাদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ।











© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com