আমি কি ভুলিতে পারি...

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ২৬ মার্চ ২১ । ০২:৪৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

পঙ্কজ সাহা

১৯৭১ সালে যখন পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো, তখন আমি আকাশবাণীতে। খবর পেলাম, পূর্ব বাংলার যেসব সংগীতশিল্পী এপারে চলে এসেছেন, তারা ১৪৪ নম্বর লেনিন সরণিতে রিহার্সাল করছেন। ছুটলাম তাদের গান রেকর্ড করতে। দেশভাগের পর সেই প্রথম পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পীদের গান এখানকার বেতারে প্রচারিত হলো। ওই শিল্পীরা রবীন্দ্র সদনে একটি ঐতিহাসিক অনুষ্ঠান করেছিলেন। ওপার বাংলার শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের নেতৃত্বে ওই অনুষ্ঠানের জন্য সারারাত সেট তৈরির কাজে আমিও হাত লাগালাম। স্বাধীনতার পরে যখন একবার বাংলাদেশ গেলাম, তখন মুস্তাফা মনোয়ার বাংলাদেশ টেলিভিশনের ডিরেক্টর জেনারেল।

সত্তরের দশকে 'ইনস্টিটিউট অব অডিওভিজুয়াল কালচার' নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়েছিলাম। সেখানে রোজ সন্ধ্যায় ওপার বাংলার শিল্পী সন্‌জীদা খাতুন, ওয়াহিদুল হক, শাহীন সামাদ, বেণু, ডালিয়া নওশীন, আজাদ হাফিজ, বিপুল ভট্টাচার্য, তারেক আলীসহ অনেকে আসতেন। আকাশবাণী কলকাতার স্টেশন ডিরেক্টর দিলীপ সেনগুপ্তকে জানালাম শিল্পীদের আর্থিক কষ্টের কথা। তার নির্দেশে এক দিন সব শিল্পীকে নিয়ে গেলাম আকাশবাণীতে।

তিনি তাদের আকাশবাণীর অতিথি শিল্পী করে নিয়ে, তাদের গান সম্প্র্রচার এবং আয়ের একটা পথ খুলে দিলেন। দিলীপ বাবু এক দিন আমাকে জরুরি তলব করে একান্তে বললেন, এবার ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হবে। সে অনুযায়ী অনুষ্ঠান তৈরি করতে লেগে যাও। ঝাঁপিয়ে পড়লাম একের পর এক অনুষ্ঠান তৈরি করতে।

বনগাঁ সীমান্তে গেলে চোখে পড়ত, দু'দিক দিয়ে চলেছে সারিবদ্ধ মানুষ। বাঁ দিকে মানুষের মিছিল চলেছে ওপারের মানুষের হাতে সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য, যার যা সাধ্য। কেউ গরুর গাড়িতে কিছু চাল-ডাল নিয়ে চলেছেন; কেউ রিকশা করে বালতি-মগ, কেউ বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন পোশাক, কম্বল। যেন এক মানবিকতার মিছিল। আর ডান দিকে দলে দলে লোক মাথায়, কাঁধে বাক্স-পেটরা নিয়ে ছুটতে ছুটতে প্রবেশ করছেন ভারতে। সীমান্ত তখন উন্মুক্ত। ভারতে ঢুকে পড়েও তাদের ভয় কাটেনি। তখনও তারা ছুটছেন। এক দিন দেখেছিলাম, সেই ছুটন্ত শরণার্থীদের সারিতে একটি পরিবার, সব সদস্যের মাথায়-কাঁধে বাক্স, পুঁটুলি। আর সব শেষে পিছিয়ে পড়েছে একটি ন্যাংটো শিশু। সে তো কোনো মাল বয়ে আনতে পারেনি; কেবল গভীর মমতায় একটি শ্নেট আর একটি বই বুকে জড়িয়ে ছুটে ছুটে আসছে। আমার কল্পনা করতে ভালো লাগে, সেই শিশুটি এখন বড় হয়ে হয়তো কোথাও শিক্ষকতা করছে।

যা কিছু খবর, সাক্ষাৎকার ইত্যাদি সীমান্তের এপার থেকেই সংগ্রহ করার নির্দেশ ছিল। কিন্তু তারুণ্যের উৎসাহ ও উত্তেজনায় আকাশবাণীর পরিচয়পত্র সামরিক বাহিনীর কাছে গচ্ছিত রেখে, সীমান্ত পেরিয়ে যুদ্ধরত পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকে পড়েছি। এক দিন সীমান্ত পেরিয়ে টেপরেকর্ডার কাঁধে কিছু দূর এগোনোর পর আওয়ামী লীগের কয়েক সদস্যের সঙ্গে আলাপ হলো। তারা আমাকে একটি গাড়ি দিলেন। আমার সঙ্গে থাকলেন একজন। যশোর রোড ধরে এগোতে এগোতে তাদের কাছে জানতে চাইছি মুক্তিযুদ্ধের নানা খবর। লক্ষ্য করলাম, গাড়ির তরুণ চালকটি কোনো কথা বলছেন না। পরে জানলাম, তিনি এক ধনী হিন্দু পরিবারের ছেলে। তার পরিবারের সব সদস্যকে খান সেনারা হত্যা করেছে। তরুণটি ধানের গোলার আড়ালে লুকিয়ে পড়ে সব দেখেছেন। এখন তিনি বাক্যহারা। মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজনে সারাদিন তার গাড়িটা নিঃশব্দে চালিয়ে যাচ্ছেন।

পৌঁছলাম ঝিকরগাছা হাটে। সেখানে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল্‌?সের দু'জন সদস্য গরুর গাড়ির ওপর দাঁড়িয়ে সবাইকে সতর্ক করছেন :'ভাইরা, তোমরা সবাই বাসায় চলে যাও। খান সেনারা যে কোনো মুহূর্তে এসে পড়বে।' হাটের মানুষ আমার পরিচয় জানতে পেরে খান সেনাদের অত্যাচারের কথা বলতে লাগলেন। তাদের কথা রেকর্ড করতে লাগলাম। তারা তাদের হাতে তৈরি বাংলাদেশের পতাকা আমাকে উপহার দিলেন, আর আমাকে ঘিরে গাইতে লাগলেন- 'আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো...'। সেদিন প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করেছিলাম, ভাষা আন্দোলনই মুক্তিযুদ্ধের মূল প্রেরণা।

গেলাম যশোরের বিখ্যাত নাভারন হাসপাতালে। খান সেনারা এগোতে এগোতে রাস্তার দু'পাশে খেলাচ্ছলে সাধারণ মানুষকে গুলি করেছে। তাদের নিয়ে আসা হচ্ছে এই হাসপাতালে। কারও হাত উড়ে গেছে, কারও পায়ে গুলি লেগেছে। হাসপাতালে ঢুকে দেখা হয়ে গেল আমার বন্ধু শিবাজী বসুর সঙ্গে। সে তখন কলকাতা মেডিকেল কলেজের এক ছাত্রনেতা (এখন তো সে কলকাতার বিখ্যাত ইউরোলজিস্ট)। বিস্ময়ে বললাম, তুই এখানে! শিবাজী বলল, 'আমরা কলকাতা মেডিকেল কলেজের মাস্টারমশাই আর ছাত্ররাই তো এই হাসপাতাল চালাচ্ছি। এখানকার ডাক্তাররা তো নেই। কিন্তু এটা একেবারে গোপন রাখতে হবে, যেন ব্রডকাস্ট হয়ে না যায়।' আমি ওর কথা রেখেছিলাম। বাইরে এসে দেখি, এক পুরুষ-নার্স পাকিস্তানের পতাকা পোড়াচ্ছেন। তাকে ঘিরে মানুষ গাইছেন- 'আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো...'।

গাড়ি এগোচ্ছে পূর্ব বাংলার আরও ভেতরে। দেখি, ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে রাইফেল কাঁধে দু'জন ছুটতে ছুটতে চিৎকার করে আমাদের থামতে বলছেন। তাদের গাড়িতে তুলে নিলাম। মুক্তিযোদ্ধা তারা। সেদিন ওই অঞ্চলে খান সেনারা বিপুল সংখ্যায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে দেখে কৌশল হিসেবে রিট্রিট করছেন। তারা বলতে লাগলেন, দেখুন, আমরা তো এক। আপনার-আমার খুন, মানে রক্ত তো একই। আপনারা ছিলেন, দুর্গাপূজা হতো। ছেলেবেলায় আমরাও গেছি সেই উৎসবে। তারপর সব কেমন গোলমাল হয়ে গেল! কিছুক্ষণ নীরবতার পর কানে এলো; এক মুক্তিযোদ্ধা গুনগুন করে গাইছেন সেই গান- '...আমি কি ভুলিতে পারি।'

লেখক: মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননাপ্রাপ্ত, আকাশবাণী কলকাতার সাবেক কর্মী।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com