গণতন্ত্র

আমাদের সংসদও হোক দ্বিকক্ষবিশিষ্ট

১৬ মার্চ ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ১৬ মার্চ ২১ । ০২:২৮

রুমিন ফারহানা

গণতন্ত্রকে কীভাবে মানুষের জন্য আরও বেশি কল্যাণকর করে তোলা যায়, সেটা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার চেষ্টা হয়েছে। মূল লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্রের মূল চেতনা অর্থাৎ 'অব দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল' সরকার নিশ্চিত করা যায়। মধ্যযুগীয় সম্রাট শাসিত রাজ্যগুলোর সঙ্গে আধুনিক, কার্যকর রাষ্ট্রের মধ্যে একেবারে মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে- একটা আধুনিক কার্যকর রাষ্ট্রে 'সেপারেশন অব পাওয়ার' থাকে। একটা আধুনিক রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ এবং বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করে। প্রতিটি বিভাগের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় তার অধীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।

আজ থেকে ৮০০ বছর আগে ম্যাগনাকার্টা 'সেপারেশন অব পাওয়ার'-এর প্রথম মাইলফলকটি তৈরি করেছিল। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় এটা খুব স্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছিল সেই রাষ্ট্রটিই সবচেয়ে ভালোভাবে টিকে থাকে এবং তার নাগরিকদের স্বার্থের পক্ষে কাজ করতে পারে যার প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করে। একটা রাষ্ট্র যার প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করে, সেখানে জনগণের স্বার্থের জন্য এমনকি শাসকের স্বার্থও লঙ্ঘিত হতে পারে। তাই কোনো শাসক যদি যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকতে চায়, ক্ষমতায় থাকার জন্য জনগণের স্বার্থ নষ্ট করতে তার কোনো দ্বিধা না থাকে, তাহলে তার প্রধান কৌশল হবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে ফেলা। এতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনের সর্বোচ্চ ব্যক্তির একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা আর কোনো সমস্যা হবে না। একটা রাষ্ট্রের সব অঙ্গ এবং প্রতিষ্ঠানগুলো যদি তার কাজ স্বাধীনভাবে করতে পারে, তাতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যে চেক অ্যান্ড ব্যালান্স প্রতিষ্ঠিত হয়, সেটা ঠেকিয়ে দিতে পারে এমনকি ট্রাম্পের মতো একজন ভয়ংকর মানুষকেও। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে আইন বিভাগ। নামে আইন বিভাগ হলেও প্রধান কাজ আইন প্রণয়ন ছাড়াও এই বিভাগ রাষ্ট্রীয় সব গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণ এবং কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে। তাই কীভাবে এই বিভাগটিকে আরও ক্ষমতাবান করে রাষ্ট্রের একচ্ছত্র ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া ঠেকানো যায়, সেই আলোচনা গণতন্ত্রের শুরুর দিক থেকেই ছিল।

আইন বিভাগ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গেছে, এক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভার চাইতে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা চেক অ্যান্ড ব্যালান্স নিশ্চিতে অনেক বেশি কার্যকর। এক কক্ষবিশিষ্ট সংসদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কখনও কোনো দল কোনো নির্বাচনে সংসদে অনেক বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সেটা অনেক ক্ষেত্রেই সেই দল এবং তার প্রধানকে স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পর্যাপ্ত বাধা দিতে পারে না। সেই কারণেই দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের ধারণা এসেছে; শাসন বিভাগের পক্ষে একই সঙ্গে সংসদের দুটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ খুব সহজ নয়।

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপযোগিতা আছে। সংসদের দুটি কক্ষ থাকলে সেটি যে কোনো আইন কিংবা রাষ্ট্রীয় নীতি পর্যালোচনার জন্য অনেক বেশি সময় পায়। সংসদের উচ্চকক্ষ নিম্নকক্ষের কর্মপরিধি ঠিক করে নেওয়ার মাধ্যমে এক ধরনের 'ডিভিশন অব লেবার' নিশ্চিত করে, যার মাধ্যমে যাবতীয় কাজ সুচারুভাবে করা সম্ভব হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উচ্চকক্ষের সদস্য হওয়ার জন্য নূ্যনতম বেশি বয়স এবং অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়, তাই সেটা এই হাউসের কাজকে অনেক ম্যাচিউরড করে। সংসদের নিম্নকক্ষের নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করে পরিবর্তন পরিবর্তন এমনকি বাতিল করা সম্ভব হতে পারে উচ্চকক্ষে।

সংসদের উচ্চকক্ষ সৃষ্টির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক হচ্ছে সেই সদস্যরা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন, নাকি পরোক্ষভাবে জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা নির্বাচিত হবেন, নাকি তারা বিভিন্ন পদ্ধতিতে সিলেক্টেড হবেন। আমেরিকার সিনেটে একসময় সরাসরি নির্বাচন না হলেও এখন জনগণের সরাসরি ভোটে সিনেটর নির্বাচিত হন। ফ্রান্সের মতো দেশে বিভিন্ন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ভোট দিয়ে উচ্চকক্ষের জন্য নির্বাচন করেন। বিএনপি তার ভিশন ২০৩০-এ বলেছিল, সংবিধানের এককেন্দ্রিক চরিত্র অক্ষুণ্ণ রেখে বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থা সংস্কারের অংশ হিসেবে জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা করার বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে।

উচ্চ কক্ষের সদস্যরা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ার শর্ত না থাকার পেছনে ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি। সংসদ সদস্যরা যখন জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন, তখন চাইলেও তাদের পক্ষে অনেক সময় 'পপুলিস্ট' না হয়ে উপায় থাকে না। কিন্তু রাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণের জন্য জরুরি অনেক পদক্ষেপ সব সময় স্বল্পমেয়াদে জনগণকে সুখী করে না; বরং করে তোলে বিক্ষুব্ধ। তাই তাদের পক্ষে অনেক সময় এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে ওঠে। এ বিষয়টি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ার নিয়ম না থাকলে উচ্চকক্ষের সদস্যদের পক্ষে অনেক ক্ষেত্রেই খুব দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে। শুধু তাই নয়, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় নির্বাচিত হওয়ার জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি নিতে হয়, যেসব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একজন মানুষকে যেতে হয়, সেটা সমাজের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষের ক্ষেত্রে সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। তাই উচ্চকক্ষের জন্য সদস্য যদি নির্ধারণ করা হয় তাহলে সেখানে সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

পুরোপুরি প্রাসঙ্গিক না হলেও এ প্রসঙ্গে আমি আরেকটি বিষয় যুক্ত করতে চাই। আমাদের সংসদ এখনও যতটুকু আছে, সেটিও তার কাঙ্ক্ষিত কাজ করতে পারছে না সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের প্রভাবে। কারণ অতি তুচ্ছ কোনো বিলেও সংসদ সদস্যরা তাদের দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সদস্যপদ খারিজ হয়ে যাবে। ৭০ অনুচ্ছেদ এ সংসদকে অকার্যকর করে ফেলেছে। সরকারি দল যা চাইবে তার বাইরে কিছু করার সাধ্য থাকবে না কারও। অনেকেই ৭০ অনুচ্ছেদ পুরোপুরি তুলে দেওয়ার কথা বললেও এর পক্ষে নই আমি। অনাস্থা ভোটের ক্ষেত্রে দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়া গেলে কী হতে পারে, সেটা আমরা এমনকি আমাদের পাশের দেশ ভারতেও দেখেছি। তাই 'হর্স ট্রেডিং' বন্ধ করার জন্য ৭০ অনুচ্ছেদ থাকা উচিত। তবে, তাতে বিপক্ষে ভোট দিলে সংসদ সদস্যপদ হারানোর ক্ষেত্রে শুধু অনাস্থা ভোট এবং সেই সঙ্গে ট্রেজারি বিল থাকতে পারে। এ ছাড়া আর সব ক্ষেত্রে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ হারাতে হবে না, এ বিধান থাকতে হবে।

সংসদ সদস্য; আইনজীবী ও কলাম লেখক

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com